behind the news
Rehab ad on bangla tribune
 
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

অবহেলার শিকার ৭১’র ভয়াল রণক্ষেত্র বুকাবুনিয়া

তরিকুল রিয়াজ, বরগুনা১৮:১৬, মার্চ ৩০, ২০১৬

অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের অধীনস্থ বরগুনার বামনা উপজেলায় সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টার বুকাবুনিয়া ও এর স্মৃতিস্তম্ভ। এখানে নেই স্বাধীনতাপরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাস জানার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংগ্রহশালা। মাটিতে বিলীন হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্রাগার ও জিনিসপত্র।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে উপকূলীয় এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের নবম সেক্টরের অধীনে সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। উপকূলীয় এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনকেন্দ্র এই নবম সেক্টরের সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টার করা হয় বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়াকে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে ২০১৩ সালে ১৯ নভেম্বর বুকাবুনিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। কিন্তু ৪৫ বছর পরেও সেখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়নি। সংগ্রহ করা হয়নি তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বুকাবুনিয়া অরক্ষিত পড়ে আছে। 

বুকাবুনিয়ার স্মৃতিসৌধ

১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বাধীনতা যুদ্ধের নবম সেক্টর পটুয়াখালীর সাব সেক্টর বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া বাজারে সাব-সেক্টর অধিনায়ক ক্যাপ্টেন মেহেদী আহসান আলী ঈমাম উদ্বোধন করেন। মে মাসের শেষ সপ্তাহে সাময়িক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মো. মতিন আল হোসাইন সেলিম সরদার সাব সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। বামনা, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা, বরগুনা, বেতাগী, আমতলী, তালতলী, কাঁঠালিয়া উপজেলাসহ দেশে বিভিন্ন এলাকার প্রায় পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বুকাবুনিয়া সাব সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

বুকাবুনিয়া সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাথরঘাটা উপজেলার লেমুয়াতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শান্তি কমিটির সভাপতি এএসএম গোলাম মাওলার নেতৃত্বে বামনা বাজার ও ছলিম খন্দকারের বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় হানাদার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের কাজে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত উপজেলার পশ্চিম সফিপুর গ্রামের মো. লাল মিয়া ও মৃত  আ. কুদ্দুসের নৌকা বিষখালী নদীতে পাকিস্তানি হানাদাররা ডুবিয়ে দেয়। ডৌয়াতলা ইউনিয়নের নেসার আহমেদ মৃধার বাড়ি, আবুল হাসেম জমাদ্দার বাড়ি ও ইব্রাহীম সিকদারের বাড়িও পাকিস্তানি হানাদাররা পুড়িয়ে দিয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর  সকাল ৯টায় বুকাবুনিয়া থেকে পূর্বদিকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড গোলাগুলির  শব্দ শুনতে পান। বামনা অঞ্চলের উপ-অধিনায়ক টো-আইস ভি আলমগীর হোসেন সতর্ক হুইসেল বাজানোর পর একজন মুক্তিযোদ্ধা একটি বড় গাছের উপর উঠে দেখতে পায় পাকিস্তানি হানাদাররা আল-আকরাম লঞ্চযোগে বামনার বিষখালী নদীর ওপারে বদনীখালী বাজারে এসে দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন উপ-অধিনায়ক বামনা বাজারে আক্রমণ হতে পারে ভেবে ৫২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে বুকাবুনিয়া থেকে বামনা রওয়ানা হন।

তখনও গোলাগুলির শব্দ চলছিল। বামনা বাজরে ছোটাছুটি করছেন ভীতসন্ত্রস্ত মানুষেরা। মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিল বামনা আমুয়ার খাল রাস্তার পশ্চিম ঢালে ও আমজাদ খান সাহেবের বাড়ির পিছনের বাগানে। সেখান থেকে বামনা থানার দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

বামনা থানার অভ্যন্তরে ১৩৫ জন পুলিশ ও রাজাকার অবস্থান করছিল। ১০জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল বামনা বাজারের দক্ষিণ খাল পার হয়ে অবস্থান নেন। এদিকে বিষখালী নদী তীরবর্তী বদনীখালী বাজার জ্বালিয়ে সৈন্য বহনকারী  লঞ্চ ‘আল আকরাম’ বামনা বন্দরের দিকে আসতে শুরু করল। বামনা লঞ্চঘাট সংলগ্ন পুরাতন বামনা বাজারের কাছাকাছি আসতেই লঞ্চের গতি কমিয়ে দিল। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা নদীর তীরে অবস্থান নিয়ে ফায়ার শুরু করেন। পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকেও পাল্টা গোলাগুলি শুরু হয়।

এভাবে প্রায় ঘন্টা দুই বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ চলতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের দুইটি মেশিনগান বিকল হয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতিয়ার ও গোলাবারুদের পরিমাণ মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। মুক্তিযোদ্ধা এম আজিজ মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে একটি ছোট রকেট লাঞ্চার দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থার মধ্যে হানাদার বাহিনী  টিকতে না পারায় লঞ্চ ঘুরিয়ে বেতাগীর দিকে পিছু হটে।

ওই দিন বিকেলে বামনা থানা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা হতে পারে ভেবে তারা বাজার থেকে সরে গিয়ে কাটাখালীর পশ্চিম দিকে খালের পাড়ে এবং মো. লাল মিয়া ও আব্দুল কুদ্দুসের নৌকায় অবস্থান নেন। সেদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধারাও সেখানেই অবস্থান করেন।  

পরদিন ২৪ নভেম্বর ভোর রাতে মুক্তিকামী যোদ্ধারা পাকিস্তানিদের হাত থেকে বামনা কে মুক্ত করার জন্য থানা আক্রমন করেন। থানার অভ্যন্তরে থেকে পুলিশ ও রাজাকার বাহিনী প্রচণ্ডভাবে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। কিন্তু অদম্য মুক্তিযোদ্ধারা থানার উত্তর দিকে আ. রব আকনের বাড়ির বাগান ও দক্ষিণ দিকে সারওয়ারজান হাইস্কুলসহ পশ্চিমে মো. লাল মিয়ার বাড়ির আশপাশে  একটি বেষ্টনী বলয় গড়ে থানাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকেন।

বুকাবুনিয়া স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নায়েক আমীর হোসেন থানা ভবনে দিকে কয়েকটি গ্রেনেড ছুড়ে মারলে  পুলিশ ও রাজাকার বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পরই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য শক্তির কাছে পিছু হটে বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পন করে। এসময় কয়েকজন রাজাকার সহ পাকিস্তানি সেনা এ যুদ্ধে নিহত হয়। ওই দিনই বামনা থানায় মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা উত্তোলন করে বিজয় উল্লাস করে বামনা শক্র মুক্ত করে সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা।

পরে সাবসেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা আশপাশের বেশ কিছু এলাকা মুক্ত করে। ৩ ডিসেম্বর বুকাবুনিয়া সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা আ. সত্তারের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা বরগুনাকে হানাদার মুক্ত করার জন্য ভোররাতে বরগুনায় আসেন। ফজরের আজানের পরপরই বরগুনাকে মুক্ত করার জন্য কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে গুলিবর্ষণ করতে শুরু করেন তারা। হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুনে হানাদার বাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে । তারা পাল্টা গুলি চালালেও বেশি সময় টিকতে পারেনি। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তারা। বুকাবুনিয়া সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে বরগুনা মুক্ত হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের মধ্যে এই নবম সেক্টরের সাব সেক্টর বুকাবুনিয়ায় অধিনায়ক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন ক্যাপটেন মেহেদী আহসান আলী ইমাম ও উপ-অধিনায়ক আলমগীর হোসেন। তাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

বামনায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সেক্টর হেডকোয়াটার বুকাবুনিয়ায় স্বাধীনতার ৪২ বছরপর ২০১৩ সালে ১৯ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু ৪৫ বছর পরও সেখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বুকাবুনিয়া সাব সেক্টর হেড কোয়াটারের নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটিও অরক্ষিত, নেই কোনও রক্ষকারী উঁচু দেয়াল ।

মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত বুকাবুনিয়া আদর্শ মাধ্যামিক বিদ্যালয় সংস্কারের অভাবে ভেঙে পড়ছে। সংরক্ষন করা হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। সাব-সেক্টরের অস্ত্রাগার ধ্বংসের মুখে। 

মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া বাজারের যে ব্রিজের ওপর পাকিস্তানি  সৈন্যদের হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা নদীতে ফেলে দিতেন সেই ঐতিহ্যবাহী ব্রিজটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে হাজারো মানুষ।

বুকাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সবুজ বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে  নবম সেক্টরের সাব সেক্টর হেড কোয়ার্টার বুকাবুনিয়াতে একটি তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানানোর লক্ষ্যে একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা জরুরি।

যুদ্ধকালীন কমান্ডার এবং বরগুনা মহাকুমায় বিএলএফ এর একমাত্র সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন মজনু খান বলেন, আমরা আশাকরি মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিবিজড়িত বুকাবুনিয়ায় বর্তমান সরকার একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করে বরগুনা জেলাবাসীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যারা এখনও গেজেটভুক্ত হতে পারেননি, তাদেরকে দ্রুত গ্রেজেটভুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ করছি।

বামনা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. জয়নাল আবেদীন খান বলেন, হাজারও স্মৃতিবিজড়িত সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টার বুকাবুনিয়ায় স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে অনেক দর্শনার্থী আসেন। জরাজীর্ণ বুকাবুনিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবন সংস্কার করে এটিকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তরুন প্রজন্ম তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাগারটি দেখতে পেতো।

তিনি আরো বলেন, দর্শনার্থীদের থাকার জায়গা তৈরির জন্যে উদ্যোগ নিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।  

/এইচকে/ 

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ