৬ মাস ধরে বন্ধ দিনাজপুর মধ্যপাড়া পাথর খনির উৎপাদন

Send
বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, এপ্রিল ০৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৭, এপ্রিল ০৪, ২০১৬

৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন কার্যক্রম। পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ (মাইনিং ইকুইপমেন্ট) এর অভাবে খনি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন সাত শতাধিক খনি শ্রমিক।

মধ্যপাড়া পাথরখনিতে নেই কোনও কর্মচাঞ্চল্য

ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। যার মধ্যে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি পৌঁছেছে খনির অভ্যন্তরে। তবে এসব যন্ত্রপাতি খনির অভ্যন্তরে স্থাপন শেষে পাথর উত্তোলনের কাজে যেতে আরও ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে ২০০৭ সালে। প্রথম অবস্থায় খনি থেকে দৈনিক ১৫ থেকে ১৮শ’ টন পাথর উত্তোলন করা হলেও পরে তা নেমে আসে মাত্র ৫শ’ টনে। এ অবস্থায় খনির উৎপাদন বাড়াতে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খনির উত্তোলন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বেলারুশের প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামকে (জিটিসি)। চুক্তি হয় ছয় বছরে জিটিসি ১৭১ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ৯ দশমিক ২ মিলিয়ন টন পাথর উত্তোলন করবে। চুক্তি মোতাবেক পাথর উত্তোলনের জন্য সব ধরনের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে খনি কর্তৃপক্ষ।

২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জিটিসি ভূগর্ভ থেকে পাথর উত্তোলন করতে শুরু করে। উত্তোলনের দায়িত্ব নেওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই তিন শিফটে দৈনিক উৎপাদন সাড়ে ৫ হাজার টনে উন্নীত করে জিটিসি। কিন্তু চুক্তি মোতাবেক মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড ‘মাইনিং ইকুইপমেন্ট’ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় যন্ত্রাংশের অভাবে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় জিটিসি।

উৎপাদন বন্ধ, তাই মধ্যপাড়া খনি ইয়ার্ডে নেই কোনও পাথর

খনি সূত্রে জানা যায়, খনির ভূগর্ভস্থ নতুন মুখের উন্নয়নের জন্য উত্তোলনে সহায়ক ভারী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করার জন্য ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে কর্তৃপক্ষকে তাগাদা দিয়ে আসছিল খনি ব্যবস্থাপনা ও উত্তোলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া টেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। কিন্তু সময়মত যেসব যন্ত্রপাতি আমদানী না হওয়ায় এবং খনির ভুগর্ভে উত্তোলনযোগ্য পাথরের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ও যন্ত্রপপাতির অভাবে নতুন পাথর উৎপাদন ইউনিট উন্নয়ন করতে না পারায় গত বছরের আগষ্ট মাস থেকে প্রতিদিন তিন শিফটের স্থানে দু শিফট বন্ধ করে ৪২৫ জন শ্রমিককে ছুটি দেয় জিটিসি। এর প্রায় দেড় মাস পর ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কর্মবিরতিতে পাঠানো হয় আরও প্রায় আড়াইশ’ কর্মচারী ও শ্রমিককে। এতে করে জিটিসির অধীনে খনিতে কর্মরত প্রায় ৭ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে। এছাড়াও ৭০ জন বিদেশি খনি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তা নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। 

এদিকে খনির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় খনি উন্নয়ন ও উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানির জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় খনিকে সচল রাখতে ১০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দের অর্থ প্রাপ্তির পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর মোট ৩৪টি প্রোফর্মায় অর্ন্তভুক্ত একশ’র অধিক প্রকারের ভারী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানী করতে ৯৫ কোটি টাকার এলসি খোলা হয়। এলসি খোলার পর চীন ও রাশিয়ার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাইনিং ইকুইপমেন্ট সরবরাহের অর্ডার দেয় জিটিসি। এর আগে রাশিয়া ও চীন থেকে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার ৩৪টি প্রোফর্মায় একশ’র বেশি ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানি করার ক্লিয়ারেন্স দেয় খনি কর্তৃপক্ষের নিয়োগ দেয়া প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন এজেন্ট সিঙ্গাপুরো জিওকেম কোম্পানি। গত ২ মার্চ চীন থেকে একটি ও ৪ মার্চ রাশিয়া থেকে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে ট্রাকে করে গত ৩১ মার্চ থেকে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশগুলো খনি অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

দিনাজপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনি

মধ্যপাড়া পাথর খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশাদ ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম থেকে খনি থেকে পাথর উত্তোলনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ খনি অভ্যন্তরে আসতে শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে সেগুলো জিটিসিকে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। যন্ত্রপাতি আসায় খনিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তবে কবে নাগাদ উৎপাদন শুরু হবে তা সঠিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

জিটিসি’র জেনারেল ম্যানেজার জাভেদ সিদ্দিক জানান, ইতিমধ্যেই তারা অনেক যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ পেয়েছেন। সেসব স্থাপন করার জন্য ত ২৭ মার্চ থেকে মাইন অপারেশনের কাজ শুরু করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত প্রধান যন্ত্র রেইজ বোরিং মেশিন আসার পরপরই খনি ভুগর্ভে পাথর উত্তোলন ইউনিটের উন্নয়ন কাজ শুরু হবে। এই কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগতে পারে। এরপরই শুরু হবে পাথর উত্তোলন।

/এইচকে/

লাইভ

টপ