নবাব: দর্শকের সঙ্গে প্রতারণা!

Send
শেরিফ আল সায়ার
প্রকাশিত : ০০:০৫, জুলাই ০৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৭, জুলাই ০৫, ২০১৭

নবাব

রেটিং: ১/৫

শিল্পী: শাকিব খান, শুভশ্রী, রজতাভ দত্ত, সব্যসাচী চক্রবর্তী, মেঘলা, কমল পাটেকার, অপরাজিতা আঢ্য প্রমুখ।

প্রযোজনা: জাজ মাল্টিমিডিয়া (বাংলাদেশ) এবং এসকে মুভিজ (ভারত)
পরিচালক: আবদুল আজিজ (বাংলাদেশ) এবং জয়দীপ মুখার্জি (ভারত)
গল্পকার: পেলে ভট্টাচার্য

একটি গানের দৃশ্যে শুভশ্রী ও শাকিবযৌথ প্রযোজনা নাকি ‘যৌথ প্রতারণা’? এমন প্রশ্নের মধ্যে পুরো রমজান মাস কাটিয়েছে বাংলা ছবির দর্শকরা। ঈদে তারা কোন ছবির টিকিট কাটবেন সেটা না ভেবে উল্টো প্রশ্ন করেছেন- ছবি মুক্তি পাবে তো? দর্শকরা দেখেছেন শিল্পী-কলাকুশলীরা হয়েছেন দু’ভাগ। কেউ যৌথ প্রযোজনার পক্ষে কেউ বিপক্ষে।

বলাই বাহুল্য, দর্শক যৌথ প্রযোজনার পক্ষেই ছিল। কারণ দর্শক চায় ভালো ছবি, সেটা যৌথ হোক কিংবা একক হোক। ভালো ছবি হলে তারা প্রেক্ষাগৃহে যাবেন, পরিবার নিয়ে সময়টা বিনোদনের মধ্যে দিয়েই কাটাবেন। তো সব জল্পনা-কল্পনা-বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে এবারের ঈদে যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘নবাব’ মুক্তি পেলো।

পেলে ভট্টাচার্যের গল্পে ওপার বাংলার জয়দীপ মুখার্জি ও বাংলাদেশের আবদুল আজিজ হলেন ‘নবাব’ পরিচালক। এবার দেখা যাক নবাবে কী গল্প বলতে চেয়েছেন পরিচালকদ্বয়।

কলকাতায় সন্ত্রাসকর্ম বেড়েই চলেছে। প্রচুর অস্ত্র ঢুকছে, সন্ত্রাসবাদ চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে নিতে কিংবা নির্মূল করতে মুখ্যমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় একটি বিশেষ টিম। সেই টিমেরই একজন সদস্য হলেন নবাব। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দক্ষ অফিসার রাজীব চৌধুরী ওরফে নবাব পুরো টিমকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। সঙ্গে নায়িকা হিসেবে যুক্ত হন শুভশ্রী গাঙ্গুলি। তার চরিত্রের নাম দিয়া, পেশায় সাংবাদিক। বিনোদন সাংবাদিক থেকে সদ্য ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। তার পত্রিকার সম্পাদক চরিত্রে ছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। আর পুলিশ কমিশনার হিসেবে রজতাভ দত্ত এবং তার মেয়ে ছিলেন বাংলাদেশি মেঘলা। সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে বিভিন্ন টুইস্টের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে ছবিটির গল্প।

যে কারণে ‘নবাব’ তার নবাবি দেখাচ্ছে:

১. এই ছবিটিতে শাকিব খান আছেন। এর আগে তার যৌথ প্রযোজনার ‘শিকারী’ মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। বিশেষ করে নিজের গেটআপ, অভিনয় দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ‘শিকারী’ দিয়েই ‘শিকার’ করেছিলেন ‘কিং খান’। সেই আগ্রহ থেকেই যৌথ প্রযোজনা মানেই এক অন্যরকম শাকিব খানকে দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বাংলা সিনেমাপ্রেমীরা। এ জায়গায় কেউ হতাশ হয়নি। পুরো ছবিতে শাকিব আসলেই কিং খান। তার কস্টিউম, গেটআপ এবারও অসাধারণ। অভিনয়ে দুর্দান্ত ছিলেন।

২. তিনটি হিন্দি ছবির ছায়া থেকে নির্মিত ছবি- নবাব। কিন্তু ছবির গাঁথুনিতে সেই প্রলেপ পড়েনি। বরং নিখুত গাঁথুনি দিয়েছেন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালাকদ্বয়। সুতরাং এই কাট অ্যান্ড পেস্ট সফলতার জন্য তাদের প্রশংসা করতে হবেই!

৩. যারা এই তিনটি হিন্দি ছবি দেখেননি, তাদের কাছে কিছুটা টুইস্ট তৈরি করতে পেরেছে ‘নবাব’। তবে ‘বাজি’ এবং ‘সারফারোশে’র চেয়ে ‘বাদশাহ’ দেখেনি এমন দর্শক বাংলাদেশে মেলা ভার। যদিও চকচকে স্ক্রিনে স্মার্ট শাকিব খান ও মিষ্টি মেয়ে শুভশ্রীকে দেখে সেই কপি-পেস্টে খুব আগ্রহ দেখা যায়নি অনেক দর্শকের। কারণ তাদের কাছে আসল হলো ‘ঝকঝকে বিনোদন’।

৪. ছবির গানগুলো সুন্দর। পিকচারাইজেশন, ক্যামেরার কাজ, লোকেশন, অ্যাকশন নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। এসব বিষয়ে ভালোভাবেই উৎরে গেছে ‘নবাব’।

৫. ছবির প্রতি আগ্রহেরও কমতি নেই। ঈদের দিন থেকে হাউজফুল যাচ্ছে ‘নবাব’। টিকিট পেতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে দর্শকদের। সুতরাং বাংলা ছবির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছবি যত ভালো চলবে আমাদের হলগুলোও প্রাণ ফিরে পাবে।

নবাব-এর একটি দৃশ্যে শাকিব খানযে কারণে ছবিটি দর্শকের সঙ্গে ‘প্রতারণা’র শামিল:

১. ‘নবাব’ মূলত এগিয়েছে তিনটি ছবির ছায়াকে অবলম্বন করে। আমির খান অভিনীত দুই ছবি ‘বাজি’ (১৯৯৫) ও ‘সারফারোশ’ (১৯৯৯) এবং শাহরুখ খান অভিনীত ‘বাদশাহ’ (১৯৯৯)। এই তিন ছবিকে মিশিয়ে তৈরি হয়েছে ‘নবাব’। প্রতারণা করা হয়েছে সেই সকল দর্শকের সঙ্গে যারা এই তিনটি ছবিই দেখেছেন। হলে বসে বলে দিতে পেরেছেন কোন দৃশ্যের পর কী হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ দর্শকের কাছে ছবিতে কোনও টুইস্টই ছিল না। কারণ গল্প তাদের জানা।

কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যেমন- বাস যাত্রার বিরতি। ওই জায়গা দিয়ে যাচ্ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সে সময় মুখ্যমন্ত্রীর ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়। তখন সেই বাস যাত্রার বিরতিতে উপস্থিত নায়ক শাকিব খান তাকে বাঁচান। সেই দিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন গল্প। ওদিকে নায়িকাকে বলা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে যে ছেলেটি বাঁচিয়েছে তাকে খুঁজে বের করতে। নায়িকা হলেন একটি চ্যানেলের সাংবাদিক। নায়িকার গেটআপ, মেকাপ দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি আসলেই রিপোর্টার কিনা! ক্রাইম রিপোর্টার সারাক্ষণ সাজগোজ করে থাকে এমন দৃশ্য বাস্তবে মেলা দায়। হয়তো ছবি বলেই সম্ভব হয়েছে।

‘নবাব’ ছবিতে শাকিব ও শুভশ্রীর কলেজ জীবনের পর্ব দেখানো হয় একটি গজলের মধ্যে দিয়ে। সেই পুরো অংশটুকু নেওয়া হয়েছে ‘সারফারোশ’ ছবি থেকে। আর একদম শেষ পর্যায়ে আছে ‘বাদশাহ’ চলচ্চিত্রের ছায়া। যদিও পরিচালকদ্বয় কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন দৃশ্যগুলোতে। কিন্তু দর্শক তো বুঝে ফেলেছে কী হবে। আর পুরো ছবিটি মূলত বড় অংশ এগিয়েছে আমির খান অভিনীত ‘বাজি’ চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে। তিন ছবির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ মিলিয়ে এই জোড়াতালির ‘নবাব’ দর্শক নিশ্চয়ই দেখতে চায়নি!

২. সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে শাকিব খান এই ছবিটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ছবির নাম ছিল --নবাব। নবাব চরিত্রেই ছিল শাকিব খান। ...যেটা আমি মাননীয় মন্ত্রীমহোদয়কেও বলেছিলাম- স্যার আমার ছবিটি দেখে যদি আপনার মনে হয় যে আমার দেশ এ ছবিটি নিয়ে গর্ব করবে না। আমি আমার দেশের পুলিশ প্রশাসনকে রিপ্রেজেন্ট করলাম না। তাহলে আমার ছবিটি ব্যান করে দেবেন প্লিজ...।’  

প্রশ্নটা হলো, পুরো ছবিজুড়ে ছিল কলকাতার পুলিশের বাহাদুরি। শাকিব খান নিজেও দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন সদস্য ছিলেন। তাহলে কীভাবে বাংলাদেশ পুলিশকে রিপ্রেজেন্ট করা হলো সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। তাছাড়া শাকিব যে বাংলাদেশ পুলিশ থেকে ভারতের একটি মিশনে গিয়েছেন- সেই বিষয়টি পুরো ছবিতে সেঅর্থে স্পষ্ট নয়। এটিও একটি প্রতারণার মতোই।

৩. মুক্তির আগে থেকেই যারা ‘নবাব’ ও অন্য আরেকটি ছবি ‘বস-টু’ ছবি নিয়ে বিতর্ক তুলছিল তাদের মূল বক্তব্য ছিল, এই ছবিতে যৌথ প্রযোজনার শর্ত অনুযায়ী সকল ক্ষেত্রে ৫০-৫০ ভারসাম্য রাখা হয়নি।

এই ছবিতে ভারতকেই ফোকাস করা হয়েছে। কলকাতার সন্ত্রাস, কলকাতার পুলিশ, কলকাতার রাজনীতি। কোনোখানেই নেই বাংলাদেশ। খণ্ড খণ্ড কিছু দৃশ্য বাংলাদেশের মনে হলেও অধিকাংশ শুটিং স্পট ছিল কলকাতায়। সুতরাং ভারসাম্য নেই শর্ত অনুযায়ী। যদিও দর্শকের এসব শর্তে তেমন মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু যদি শর্ত এমন থেকে থাকে তবে বাংলাদেশ অংশের পরিচালক এবং ছবির নায়ক শুরু থেকেই গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, ভারসাম্য রাখা হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে সেই ভারসাম্য চোখে পড়েনি।

নবাব-এর পোস্টার৪. ছবির প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাজ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যথেষ্ট দক্ষ। তাদের প্রচারণায় যেকোনও ছবি বরারবই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। সেখানে জাজের মতো প্রতিষ্ঠান যখন প্রচারণাতেও নকলের আশ্রয় নেন তখন তা মেনে নেওয়া মুশকিলই বটে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসে ‘নবাব’ ফার্স্ট লুক পোস্টার তেলেগু ছবি ‘অস্ত্রাম’র কপি-পেস্ট। তখনও দর্শক প্রতারিত হয়।

৫. এই ছবিতে খুব বেশি গান ছিল না, মাত্র তিনটি গান। যার কারণে তিনটিকেই চমৎকার বলা চলে। ‘ষোলো আনা’ গানটির লেখক প্রসেন এবং কণ্ঠ দিয়েছেন শাদাব হাসমী ও আকৃতি কাক্কর, ‘যাবো নিয়ে’ লিখেছেন প্রসেন, কণ্ঠ দিয়েছেন অঙ্কিত তিওয়ারী ও মধুরা ভট্টাচার্য, ‘ও ডিজে ও ডিজে’ লিখেছেন প্রিয় চট্টোপাধ্যায়, কণ্ঠ দিয়েছেন দিলশাদ নাহার কণ ও আকাশ।

এবং লক্ষ করুন, সিনেমার এই গানের অংশেও শুধু বাংলাদেশের শিল্পী কণার কণ্ঠ ছাড়া পুরোটাই ‘মেড বাই’ কলকাতা। এই হলো যৌথ প্রযোজনার নিয়মিত নিয়ম।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এটাকে ‘প্রতারণা’ বদলাটা উচিত হবে কিনা? যার উত্তরে একবাক্যে বলা যায়, দর্শক দীর্ঘ অপেক্ষা করে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে, ৩ ঘণ্টা গুরত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করে কেন ৩টি হিন্দি ছবি থেকে নির্মিত একটি খিচুড়ি বাংলা ছবি দেখতে যাবেন? এবং যেখানে ভারত-কলকাতার বাইরে বাংলাদেশের কোনও অস্তিত্বই নেই। এই ফয়সালা নির্মাতাদের এবং এই ছবি সংশ্লিষ্ট সকলকেই করতে হবে। তা না হলে দর্শক একদিন মুখ ফিরিয়ে নেবে এই যৌথ প্রযোজনার কাছ থেকেও।

দর্শক চায় এমন গল্প যা সে দেখেনি কখনও। জানা গল্প, চেনা গল্পের ওপর কোটি টাকার বিনিয়োগ আসলে বাংলা ছবিকে কোথায় দাঁড় করাবে সেই প্রশ্ন নির্মাতাদের কাছেই থাকুক।

লেখক: চলচ্চিত্র বিশ্লেষক, গবেষক

/এমএম/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের লেখার বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

লাইভ

টপ