‘টেলিভিশনের টক শো আমাদের দরকার নাই’

Send
বিনোদন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৪:২৪, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:১২, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭

‘রিজওয়ান’ নাটকের মঞ্চে নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ (ছবি: সংগৃহীত)অভাবনীয়, অভূতপূর্ব, অসামান্য— টানা ১০ দিন ‘রিজওয়ান’ নিয়ে এসব বিশেষণই শোনা গেছে বেশিরভাগ দর্শকের মুখে। ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নাটকের ১৯টি মঞ্চায়ন হয়। ঢাকার মঞ্চে এর আগে এমনটি ঘটেনি।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার প্রদর্শনী শেষে মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন নাটকটির নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ। ফুলেল শুভেচ্ছা ও দর্শকদের অভিবাদনে সিক্ত হন তিনি।
ঈদে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা বরাবরই বন্ধ ছিল। তবে নাটবাঙলা নাট্যোৎসবের সুবাদে খোলা থাকলো এবারের ঈদুল আজহায়। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেছেন, ‘ঈদ উৎসবকে আমরা একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আনতে চেয়েছি। এজন্য শিল্পকলা একাডেমী ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছি। বিশেষ করে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর দারুণ সহায়তা করেছেন।’
এরপর সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেছেন, ‘আপনারা মঞ্চনাটক দেখবেন। টেলিভিশনের টক শো আমাদের দরকার নাই। আপনারা মঞ্চনাটক দেখে কথা বলবেন। প্রশ্ন করবেন, জানতে চাইবেন, আমরা মঞ্চে আছি।’
দর্শকদের অনেকে মন্তব্য করেছেন, ‘রিজওয়ান বদলে দেবে নাট্যজগতের ভাবনা।’ কেউ বলেছেন, কাশ্মিরের প্রেক্ষাপটে সাজানো ‘রিজওয়ান’ কোনও নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আটকে নেই, এটি গোটা দুনিয়ার নিপীড়িতের গল্প।
বিখ্যাত কবি আগা শহীদ আলির কাব্যগ্রন্থ ‘অ্যা কান্ট্রি উইদাউট অ্যা পোস্ট অফিস’ অবলম্বনে ভারতের অভিষেক মজুমদারের লেখা নাটকটি অনুবাদ করেছেন ঋদ্ধিবেশ আচার্য্য। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিতাস জিয়া। রিজওয়ানের বোন ফাতিমার চরিত্রে আছেন মহসীনা আক্তার। হতাশার কথা হলো, ঢাকার মঞ্চে ‘রিজওয়ান’-এর আর কোনও প্রদর্শনী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

‘রিজওয়ান’ নাটকের মঞ্চে নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ (ছবি: সংগৃহীত)
‘রিজওয়ান’-এর মাধ্যমে বহু বছর পর মূলধারার মঞ্চনাটক নির্দেশনা দিলেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। সবশেষ ১৯৯২ সালে ঢাকা পদাতিকের ‘বিষাদসিন্ধু’ নির্দেশনা দেন তিনি। মাঝে ২০১২ সালে মামুনুর রশীদের ‘টার্গেট প্লাটুন’ নাটকে মঞ্চসজ্জা ও আলোক নির্দেশনার কাজ করেছেন গুণী মানুষটি।
‘রিজওয়ান’ প্রসঙ্গে বিশিষ্টদের কথা
খ.ম. হারুণ, টিভি ব্যক্তিত্ব
সৈয়দ জামিল আহমেদ ও আমি প্রায় কাছাকাছি সময়ে মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত হই। আমরা একই স্কুলে (ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা-এনএসডি) পড়াশোনা করি। জামিল ছিল সেখানকার সেরা ছাত্র। ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের কাছে সে ছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অধ্যাপকরাও তার মতামতকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিতেন। নাটবাঙলার 'রিজওয়ান' নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল না। গত ৬ সেপ্টেম্বর নাটকটি দেখে আসার পর রেশ কাটতেই দু’দিন লেগেছে। সৈয়দ জামিল আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নতুন কিছু থাকবে সেটা সমালোচকরাও জানেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে আমরা ঢাকার নাট্য ইতিহাসের একটি অনন্য সাধারণ এক্সপেরিমেন্ট দেখেছি। হলের প্রতিটি স্পেস, কোণ, সেট, লাইট, কস্টিউম সর্বোপরি প্রত্যেক অভিনয়শিল্পী সব দর্শককে সঙ্গে নিয়ে কিভাবে একটি একক নাটক হয়ে ওঠে তা দেখিয়েছে ‘রিজওয়ান’।
২৪ বছর আগে সৈয়দ জামিল আহমেদের ‘বিষাদসিন্ধু’র মঞ্চায়ন দেখেছি, এবার দেখলাম ‘রিজওয়ান’। দুটিই আমাদের মঞ্চ ইতিহাসে জায়গা করে রাখবে। নাটক করতে হলে শুধু প্রতিভা থাকলে হয় না, পেশাদারিত্ব দরকার। সেই সঙ্গে একটি টিমের সঙ্গে শতভাগ মিশে যেতে হয়। যা দেখা যায় এই নাটকে। সৈয়দ জামিল আহমেদ একজন নাট্যগুরু। তার ছাত্রছাত্রীরা নিশ্চয়ই আমাদের দেশের নাট্যধারায় অবদান রেখে যাবে।

মোহাম্মদ আলী হায়দার, মঞ্চ ব্যক্তিত্ব

গত এক দশকের চিরচেনা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলটি এই প্রথম নিরীক্ষার আবর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এই মিলনায়তনের এত অলিগলি আমরা গত এক দশকের বেশি সময়ে আবিষ্কার করতে পারলাম না। সৈয়দ জামিল আহমেদ বিভিন্ন সময় বলতেন, ‘এক্সপেরিমেন্টাল হলটাকে আপনারা ব্যবহার করতে পারলেন না।’ আমরা অধম বুঝতেই পারতাম না উনি কি বলতে চান। তাই উনি নিজেই পথ বাতলে দিলেন। আমরা মহা ঘোর-বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করলাম তার নয়া পথ নির্মাণ, থিয়েটারের বাংলাদেশের স্পর্ধা দেখালেন আমাদের, ‘রিজওয়ান’ আমাদের কাছে দেখা দিলো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ থিয়েটারের পাশে বাংলাদেশের একমাত্র থিয়েটারের শক্ত অবস্থান।
বাংলাদেশের থিয়েটার অনেক নিরীক্ষা করেছে কিন্তু এই নিরীক্ষার মূল সৈয়দ জামিল আহমেদ। উনি আমাদের রাস্তা দেখান, আমরা সেই রাস্তায় হাঁটি, নষ্ট করি, উনি নতুন রাস্তা দেখান আবার ঘটে আমাদের অনুকরণ ও অন্ধ অনুসরণ, আমরা পথ খুঁজে পাই না। থিয়েটার ব্যর্থ হয়, আমরা হতাশ হই। কিছুই হচ্ছে না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিই। কিন্তু তিনি (জামিল ভাই) আমাদের আবার পথ বলে দেন। কারণ বাংলাদেশে থিয়েটার নিয়ে তার বোঝাপড়াই একমাত্র, আর সব ফিকে।
‘নির্দেশক’ শব্দটা যত হালকা হয়ে গেছে আমাদের দেশের সব শাখায়, অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ আবার আমাদের নতুনভাবে চোখে আঙুল দিয়ে ‘রিজওয়ান’-এ দেখালেন, ‘একেই বলে নির্দেশনা, পারলে কর, নাহলে বাড়ি যা, মুড়ি খা।’
‘রিজওয়ান’-এ আমরা দেখলাম থিয়েটারের সুপার মাস্টার ক্র্যাফটিং, ত্রিমাত্রিক স্পেসের ব্যবহার, আলোর প্রয়োজনীয় কিন্তু ধুন্ধুমার জলন, এলইডি, শারফি বিভিন্ন ডিসটরটেড লাইটের ঠিক ঠিক প্রক্ষালন, স্মোকের নান্দনিক ব্যবহার (সব নাটকেই এখন স্মোক ব্যবহার হয়, কিন্তু পরিপূর্ণ স্মোকের ব্যবহার এই প্রথম মঞ্চে দেখলাম) কনটেন্টের নয়া রাজনৈতিক আখ্যান, নন-লিনিয়ার থিয়েটার গল্পের প্রপার ট্রিটমেন্ট (বারবার মনে হচ্ছিল জামিল ভাই সিনেমা নির্মাণ কেন করেন না), কোরিওগ্রাফির অতিবাস্তব উপস্থাপনা, পোশাকের সাবলীল আহরণ, কুশীলবদের আত্মবিশ্বাসী পদচারণা (রিজওয়ান ও তার বোন বাদে), মিউজিকের সঙ্গে কথা-শরীরের ছন্দবদ্ধতা, প্রত্যেকটি প্রপসের আত্মিক সমাবেশ, কি দেখলাম না! সব দেখা হলো, কিন্তু ঘোর কাটলো না। এই ঘোর কোনোদিন কাটবে না।
ব্যাকস্টেজ বলতে আমরা থিয়েটারে বুঝি লোক বসানো, কিন্তু আসলে তা নয়। ব্যাকস্টেজ মানে অভিনেতাদের সমপরিমাণ একাগ্রতা নিয়ে যারা পেছন থেকে মঞ্চটাকে নির্মাণ করতে থাকেন, যাদের এক ছোট্ট ভুলে ঘটে যাবে মৃত্যুর মতো কারণ। অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ দেখালেন ব্যাকস্টেজের লোকজন কিভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করাতে পারেন। অর্থাৎ সবার শতভাগ একাত্মতা, একাগ্রতা ও মনোসংযোগ। এটাকেই বলে পেশাদার থিয়েটার। অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদের থিয়েটারই পেশাদার, আর সব ফাঁকা বুলি, মিথ্যা আড়ম্বর।
‘রিজওয়ান’ নাটকের মঞ্চে নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ (ছবি: সংগৃহীত)‘রিজওয়ান’-এর মতো বিশ্বমানের বাংলাদেশের থিয়েটার রূপ অনেক অনেক বছর পর একবারই ঘটে যদি অধ্যাপক জামিল আহমেদ হাল ধরেন। আমার আক্ষেপ তিনি যদি আর কিছু না করে শুধু থিয়েটার নির্মাণ করতেন প্রতি বছর একটি করে, তাহলে সারা পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশকে চিনতো থিয়েটার দেখার স্থান হিসেবে, এদেশে মানুষ বেড়াতে আসতো থিয়েটার দেখতে। নাটবাঙলাকে ধন্যবাদ এ অভিনব আয়োজনের জন্য।
সাঈদ ফেরদৌস, শিক্ষক (নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)

‘রিজওয়ান’ জীবনের কথা বলে জানায়, দুনিয়ায় যদি কোনও জান্নাত থেকে থাকে তা এই মাটিতেই। নাটক রিজওয়ানের বদল দেখায়। নানান তলে মঞ্চ বিন্যাস এবং আলো-আঁধারির আবহ তৈরির মধ্য দিয়ে জীবন-মৃত্যুর যে পরাবাস্তব যোগসূত্র নাটকটিতে তৈরি করা হয়েছে, তা মনে গেঁথে থাকবে বহুদিন। নির্দেশকের তারিফ করতে হয় আলাদা করে। নাটবাঙলার সাহসী কর্মীরা যে একাগ্রতার সঙ্গে এই কঠিন কাজটি দিনে দু'বার করে নামিয়েছেন, সেটিও অভিনন্দনযোগ্য। কাশ্মিরী বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি আগা শাহিদ আলীর কাহিনী নিয়ে ‘রিজওয়ান’কে মঞ্চে এনেছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। কাহিনী কাশ্মিরের, কিন্তু আমি তার মধ্য দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশ দেখতে পাই।

/এস/জেএইচ/

লাইভ

টপ