ঈদের ছবির সমালোচনাঅহংকার: দক্ষিণী ছবির অগোছালো চিত্রনাট্য

Send
মোস্তাফিজুর রহমান মানিক
প্রকাশিত : ২২:০৯, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৭, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭

এই ঈদে ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান যে দুটো ছবি নিয়ে হাজির হয়েছেন, এর মধ্যে ‘অহংকার’ একটি। এটি পরিচালনা করেছেন অসংখ্য ছবির নির্মাতা শাহাদাৎ হোসেন লিটন। তিনি একজন পরীক্ষিত পরিচালক। শাকিবকে নিয়ে তিনি এর আগেও অনেক ছবি নির্মাণ করেছেন। বেশ কিছুদিন পর আবার তার পরিচালনায় দেখা গেলো শাকিবকে। এবার শাকিবের সঙ্গী বুবলী। কাকতালীয় আর ইচ্ছাকৃতভাবে হোক, এর আগের ঈদুল আজহায়ও শাকিবের দুটো ছবির (বসগিরি, শুটার) নায়িকা ছিলেন বুবলী।

‘অহংকার’ ছবির গল্পটি আবর্তিত হয়েছে নিষ্ঠুর সুদ ব্যবসায়ী তরুণী মায়ার অহংকার ও তার আত্মউপলব্ধিকে ঘিরে। সে হিসেবে গল্পের সঙ্গে ‘অহংকার’ নামটি যথার্থ। কিন্তু গল্পটি বলতে গিয়ে কাহিনিকার আব্দুল মাবুদ কাউছার ও পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন লিটন ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া দক্ষিণ ভারতের কান্নাড়া ছবি ‘অটোশংকর’-এর আশ্রয় নিয়েছেন। মূল ছবিটি পরবর্তীতে রিমেক হয়েছে তামিল (আনাভাকরি), হিন্দি (শিল্পা দ্য বিগ ডন) এবং মালয়ালাম (সারাপ্পা সুন্দরী) ভাষায়। কিন্তু ‘অহংকার’ ছবিতে এ গল্প ব্যবহার হয়েছে কোনও অনুমতি ছাড়াই, এটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু।

‘অহংকার’ ছবির দৃশ্যে শাকিব খান ও বুবলীবেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, শাকিব খানের ছবিগুলোর গল্প পুরোপুরি তাকে ঘিরে সাজানো হয়ে থাকে। পুরো গল্পকে একাই কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যান তিনি। ‘অহংকার’ এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। গল্পটিতে প্রাধান্য পেয়েছে মায়া অর্থাৎ বুবলির চরিত্রটি। সুদের টাকা ওঠাতে গিয়ে মায়ার নিষ্ঠুরতা ও তার আত্মউপলব্ধি মূল বিষয়বস্তু। ছবির মূল টুইস্টও মায়াকে কেন্দ্র করেই।

এ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি বুবলী কতটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। আমি বলবো, তিনি মোটামুটি ভালোই করেছেন। তার বাচনভঙ্গি সুন্দর। মেকাপ-গেটাপ চরিত্র অনুযায়ী বিশ্বাসযোগ্য ছিল। কোথাও কোথাও ভালো অভিব্যক্তি দেখিয়েছেন। আবার কোথাও কোথাও ব্যর্থ হয়েছেন।

ছবির গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর কথা বলা যায়। যেমন মায়া যখন জানতে পারে আম্মাজান তার প্রকৃত মা নন, সম্পত্তির জন্য তিনি নিজের মতো হিংস্র মানসিকতায় বড় করেছেন মায়াকে, ঠিক তখনকার আবেগ ফুটিয়ে তুলতে বুবলী কিছুটা ব্যর্থ হয়েছেন। এরকম আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া যাবে।

সত্যি বলতে মায়া চরিত্রটি অত্যন্ত পরিণত। এটি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য অবশ্যই একজন পরিণত অভিনেত্রীর প্রয়োজন ছিল। শাকিব খান এই ছবিতে অনুঘটকের ভূমিকায় হাজির হয়েছেন। তার সহায়তায় বুবলীর মধ্যে উপলব্ধি আসে যে, অহংকার পতনের মূল।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শাকিব খান তার চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। তমা মির্জার চরিত্রটি অসম্পূর্ণ এজন্য তাকে দেখে যথেষ্ট ভালো লাগলেও কথা থেকে যায়। তিনি সুঅভিনয়ের চেষ্টা করলেও চরিত্রটি দুর্বল হওয়ায় তা বিফলে গেছে। ‘তুই যে আমার সুপার হিরো’ গানে তমা দর্শকদের যথেষ্ট বিনোদন দিয়েছেন।

প্রায় প্রতিটি ছবির মতো এ ছবিতেও নূতন ম্যাডাম যথেষ্ট লাউড ছিলেন। মেকাপ, গেটাপ, সংলাপ প্রক্ষেপণ— সবদিক থেকে। এগুলো কখনও কখনও বিরক্তিও এনে দিয়েছে। সাদেক বাচ্চু, আফজাল শরিফ, জ্যাকি আলমগীরসহ অন্যরা ছিলেন চলনসই।

চিত্রনাট্য যথেষ্ট অগোছালো। এজন্য একটু পরপর ছবিটি খেই হারিয়েছে। চিত্রনাট্যের দুর্বলতার কারণে তমা মির্জার তানিয়া চরিত্রটি কখন আসছে আর কেন আসছে বোঝা যাচ্ছিল না। শাওন আশরাফ ও অন্যদের করা কমেডি দৃশ্যগুলো আরোপিত মনে হয়েছে। এমনকি যথাযথভাবে উপস্থাপন না করায় ফ্ল্যাশব্যাকও বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ছবির জন্য।

গানের ক্ষেত্রে বলতে হয় ‘তুই যে আমার সুপার হিরো’ বিনোদন দিয়েছে। টাইটেল গানটি চলনসই। তবে অন্যগুলো ছবির ব্যাপ্তিই বাড়িয়েছে শুধু। গল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো মোটেই ভূমিকা রাখতে পারেনি। অ্যাকশন, নৃত্য পরিচালনা, আবহ সংগীত, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা মোটামুটি মানের।

তবে একটি বিষয়ে প্রশংসা না করলেই নয়— ‘অহংকার’ পরিচ্ছন্ন একটি পারিবারিক ছবি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিঃসংকোচে উপভোগ করা যায় এটি। যদিও শেষ পর্যন্ত সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে ছবিটিকে নিয়ে তেমন অহংকার করা যাবে না বলেই মনে হয়।

‘অহংকার’ ছবির গানে শাকিব খান ও বুবলীঅহংকার
রেটিং: ৫/১০
পরিচালক: শাহাদাৎ হোসেন লিটন
প্রযোজনা: তুষার কথাচিত্র
কাহিনিকার: আব্দুল মাবুদ কাউছার
সংলাপ রচয়িতা: দেলোয়ার হোসেন দিল
চিত্রনাট্যকার: শাহাদাৎ হোসেন লিটন
অভিনয়ে: শাকিব খান, বুবলী, তমা মির্জা, নূতন, মিজু আহমেদ, সাদেক বাচ্চু
সংগীত পরিচালনা: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আলী আকরাম শুভ, শওকত আলী ইমন
চিত্রগ্রাহক: আসাদুজ্জামান মজনু
সম্পাদনা: তৌহিদ হোসেন চৌধুরী
নৃত্য পরিচালনা: মাসুম বাবুল
মুক্তি: ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

 

লেখক: চলচ্চিত্র পরিচালক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের দায় নেবে না।

/জেএইচ/

লাইভ

টপ