দেবের রেস্তোরাঁয় বসে অপির সঙ্গে আলাপ

Send
মাহমুদ মানজুর, কলকাতা থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ০০:০২, নভেম্বর ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৫, নভেম্বর ২৪, ২০১৮

দেবের রেস্তোরাঁর দেয়ালে ঝুলছে নন্দিত সব বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার-ফ্রেম১৬ নভেম্বর রাত। কলকাতার নেতাজী বিমানবন্দরে পা ফেলতেই খবর উড়ে এলো ঢাকার অভিনেত্রী অপি করিমের। তিনি নাকি ব্যস্ত সময় পার করছেন একই শহরে! তাও আবার টালিগঞ্জের পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর ঋত্বিক চক্রবর্তীর মতো অভিনেতাদের সঙ্গে। নিশ্চিত হওয়া গেলো— সল্ট লেকে রিহার্সেল আর লুক টেস্ট চলছে দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘ডেব্রি অব ডিজায়ার’-এর। শুটিংয়ের মতোই, তবে সেটা মূল শুটিং নয়।

পরদিন ভোরে সোজা হাজির শুটিং স্পটে। বিদেশের মাটিতে দেশের পরিচিতজনকে পেয়ে গেলে যেমনটা হয়, অপি করিমের প্রতিক্রিয়াটাও ছিল তেমনই। অন্যদিকে লোকেশনে গিয়ে অপির মেকআপ-গেটআপ দেখলে, কষ্ট পাবেন যেকোনও স্বদেশি। তবে ব্যথা উপশম হলো এটুকু জেনে, তার চরিত্রটাও একজন কেয়ারটেকারের!

তো কাজ চলছিল কলকাতার অভিজাত এলাকা সল্ট লেকের সড়ক থেকে সড়কে। পরিচালক ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী, অভিনেতা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর প্রযোজক জসীম আহমেদ বেশ সিরিয়াস। ফলে হঠাৎ কলকাতার রাস্তায় ‘ঢাকার ভাই’কে পেয়ে আবেগটা বেশ সামলে নিলেন অপি করিম। টেক-ব্রেকের ফাঁকে শুধু এটুকু জানিয়ে দিলেন, ছ’টায় প্যাকআপ হবে, রাত ৮টায় আমাদের দেখা হোক ‘টলি টেলস’-এ।

পরে জানলাম ওটা নায়ক দেবের রেস্তোরাঁ! কলকাতার নায়কের রেস্তোরাঁয় বসে ঢাকার নায়িকার সঙ্গে গল্প! রসায়নটা কিন্তু মন্দ হবে না।

কেয়ারটেকার গেটআপ মুছে ঠিক ৮টায় পৌঁছে গেলেন ঢাকার পরিপাটি স্নিগ্ধ অপি করিম। নিজ পছন্দের খাবার অর্ডার দিলেন। শুরু হলো ঢাকা থেকে কলকাতায় আসার দীর্ঘ গল্প। যে গল্পের নীরব সাক্ষী নায়ক দেব, বিষয় অভিনেত্রী অপি করিম।

টলি টেলস-এ অপি করিমমাহমুদ মানজুর: কেমন আছেন?

অপি করিম: বেশ। এখন এখানকার আবহাওয়া বেশ চমৎকার। না গরম, না শীত। ঢাকায় তো শীত নেমে গেছে এতদিনে…

মাহমুদ মানজুর: প্রায় নেমেছে। তো ‘ডেব্রি অব ডিজায়ার’ প্রসঙ্গে চলুন। ছবিটার সঙ্গে একটু পরিচিত হতে চাই।

অপি করিম: কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই ছোটগল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’ ও ‘সুবালা’ অবলম্বনে সাজানো হয়েছে ছবিটির চিত্রনাট্য। এটি যৌথ প্রযোজনার ছবি। প্রযোজক হিসেবে আছেন বাংলাদেশের পরিচালক জসীম আহমেদ, নির্মাতার নাম ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী।

ছবিটিতে আমার চরিত্রের নাম সোমা। আর ঋত্বিক আছেন চাঁদুর ভূমিকায়। আমরা নিম্ন-মধ্যবিত্ত দম্পতি। আমাদের সংসারে আছে একমাত্র সন্তান। চাঁদু বেকার। এ কারণে সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর আশায় চাকরি নিই বয়োবৃদ্ধ পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেয়ারটেকারের। এই তো। আসলে পুরো গল্পটার মাত্র দুটি লাইন বললাম এতক্ষণে। দৃশ্যগুলো মূলত হচ্ছে নদীর ঢেউয়ের মতোই। যা দেখতে হবে, বলে শেষ হবে না।

মাহমুদ মানজুর: সে যাই হোক, আপাতত আনন্দের সংবাদ এটাই— আপনি লম্বা বিরতির পর আরও একটা চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। তাও ১৫ বছর পর। এত বছর পর…

অপি করিম: মাঝখানে এমন না যে, সিনেমার অফার পাইনি। মাঝে এত লম্বা সময় কেটে যাওয়ার পেছনে কয়েকটা বিষয় ছিল। যেমন ডিরেক্টর  পছন্দ হয়নি। মানে বুঝতে পারছিলাম না, উনার সঙ্গে কাজ করা ঠিক হবে কী হবে না। দ্বিতীয়ত, অনেস্টলি বলি এমন কোনও গল্প এই সময়টাতে পাইনি, যেটা করার জন্য একবাক্যে আমি রাজি হতে পারতাম।

তৃতীয়ত, আমার নিজের পেশা। এরকম হয়েছে যে, কথা হয়েছে। নিমরাজিও হয়েছি। কিন্তু সিডিউল মেলাতে সমস্যা হচ্ছিল। তাই কাজটা করতে পারিনি। তবে এই ১৫ বছরে মূলত গল্পের অভাবটাই পেয়েছি বেশি।

সল্ট লেকে চলা লুক টেস্ট ও ক্যামেরা রিহার্সেলে ব্যস্ত ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী (ডানে)

মাহমুদ মানজুর: তার মানে ১৫ বছর পর এই গল্পটা পছন্দ হওয়ায় কাজটা করছেন। বিষয়টা এই তো?

অপি করিম: না। ঠিক তাও না। আই অ্যাম নট সেয়িং ১৫ বছর পর এসে একটা গল্প পছন্দ হয়েছে। আমি বলবো, এটা একটা হোল প্রসেসের  বিষয়। অম্লান দা (অম্লান বিশ্বাস, নির্বাহী প্রযোজক, বাংলাদেশ) যখন আমাকে ছবিটার কথা বললেন, জানালেন এটা বানাবেন কলকাতার ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী। সাধারণত আমি প্রথমে এসব অফার পেলে খানিকটা অনাগ্রহ দেখাই। কিন্তু এবার তা আর হলো না। কারণ শুনেছি এটা ইন্দ্রনীলের প্রজেক্ট। গল্প না পড়ে পরিচালকের নামটা শুনে প্রথম দিন অম্লান দাকে বলে দিয়েছি— সব ঠিক থাকলে এই কাজটা করতে চাই। কারণ, ইন্দ্রনীল অসাধারণ ডিরেক্টর। তার দুটি কাজ দেখেছি— ‘ফড়িং’ আর ‘ভালোবাসার শহর’। এই দুটি কাজ যিনি বানাতে পারেস তার যেকোনও কাজে চোখ বন্ধ করে সম্মতি দেওয়া যায়।

মাহমুদ মানজুর: তবে কী এখানে গল্পটা মুখ্য ছিল না। সাধারণত যেটার ওপর আপনি বরাবরই জোর দিয়ে আসছিলেন।

অপি করিম: অবশ্যই ছিল। এটা ঠিক প্রথম আগ্রহ পাই ইন্দ্রনীলের কথা শুনে। পরে গল্পটা পড়লাম। সেটাও আমাকে খুব টেনে নিলো। এই গল্পের স্টোরিটেলিংয়ে মজার বিষয় হলো, গল্পটা খুব টানে। ওপর থেকে গল্পটাকে দেখলে মনে হবে, ওয়েভের মতো। এই চিত্রনাট্যটি পড়লে মনে হবে, ইনডিভিজ্যুয়ালি উই আর কানেক্টিং ইচ আদার। তৃতীয়ত হচ্ছে আমার চরিত্রটা। সোমা যে খুব বড় ক্যারেক্টার তা নয়। কিন্তু এর মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে। সব মিলিয়েই কাজটি করা। হতে পারে আমি এমন কিছুর অপেক্ষাতেই ছিলাম।

মাহমুদ মানজুর: কলকাতায় কাজের অভিজ্ঞতা কেমন হচ্ছে?

অপি করিম: খুবই ভালো। আসলে এখনও সে অর্থে শুটিং শুরু করিনি আমরা। রিহার্সেল-লুক টেস্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রথম বিষয় হচ্ছে, এখানে ডিসিপ্লিন ওয়েতে কাজ চলে। সবার হোমওয়ার্ক করা। প্রত্যেকে প্রত্যেকের ডিপার্টমেন্ট সম্পর্কে অবগত। সেজন্য রিল্যাক্সভাবে কাজ করা যায়।

আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে, আমাদের যিনি নির্মাতা আছেন উনি এত সহজভাবে আপনাকে গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, যাতে করে আপনার কোনও চাপ লাগে না। খুব আরাম লাগে। আরেকটা হচ্ছে, আমি এ পর্যন্ত তিনজনের সঙ্গে রিহার্সেল আর লুক টেস্ট করার সুযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে একজন বাংলাদেশের অভিনেতা শাহীন। তার সঙ্গে আগেও কাজ করেছি। বাট ঋত্বিক ও পরাণ দার সঙ্গে কাজ করে আমার মনেই হয়নি, তাদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আমার!

পরাণ বন্দোপাধ্যায় ও অপি করিম, লুচি খাচ্ছিলেন কলকাতার ফুটপাতে বসে

কলকাতায় এটা আমার প্রথম কাজ না। এর আগে একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজ করেছি, আরেকবার টেলিফিল্ম ‘পিছুটান’ করেছি। ফলে এখানে এসে কাজ করাটা নতুন কিছু না। এটা ঠিক, এঁরা অসম্ভব আন্তরিক। কারণ এঁরা কাজটাকে নিজের বলে মনে করে, ভালোবাসে। এদের বেশিরভাগের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়, অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমরা সবাই বন্ধুর মতো হয়ে গেছি। ভাবটা এমন, ২০ বছর ধরেই এদের সঙ্গে কাজ করছি! এই আত্মিক সম্পর্কটা না হলে বোধহয় টিমওয়ার্কটা হয় না। যেটা এখানে এসে বুঝছি বারবার।
মাহমুদ মানজুর:
এটা ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবি। তবে এই ধারার কাজ যৌথ প্রযোজনায় আর হয়নি। এর নির্মাতা, গল্প, কাস্টিং, প্রযোজক ও ছবিটি নিয়ে বিশ্ববাজারে বিপণনের যে বিশাল পরিকল্পনা, সেটা দারুণ। কিছু বলবেন?

অপি করিম: আমার মূল কাজ অভিনয় করা। তার আগে গল্প ও নির্মাণ ভাবনাটা বুঝে নেওয়া। সে হিসেবে এসব বিষয়ে আমার বলার জায়গা থাকে না। তবে এই পর্যায়ে এসে কাজটি করার মাধ্যমে এটুকু মনে হচ্ছে, আমাদের চলচ্চিত্রের জায়গায় নতুন একটা শেড তৈরি হচ্ছে। নতুন আলো আসছে। সেটা পজেটিভ সাইন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে একটা আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার যে সাহসিকতা দেখাচ্ছেন প্রযোজক জসীম ভাই ও পরিচালক কবিদা (ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর ডাকনাম) মিলে, এটা ডেফিনেটলি প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে এটা যে ধারার গল্প, দুটি গল্প মার্চ করে করা, এমন সাহসী গল্প এভাবে সচরাচর কেউ করে না। এজন্য প্রচুর সাহস লাগে।

মাহমুদ মানজুর: আবারও একটু গল্পের ভেতরে যাই। এই গল্পে আপনার মূল চরিত্র পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেয়ারটেকার। মানে তার দেখাশোনা করার চাকরি। তাই তো?

অপি করিম: ঠিক কেয়ারটেকার বলবো না। সোমা মূলত একজনের স্ত্রী। সে স্বপ্ন দেখে ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াবে। হাজবেন্ডের চাকরি নাই। এই অবস্থায় তাকে চাকরিতে যেতে হয়। আমি বলবো, সোমা ক্যারেক্টারটা স্বপ্নবাজ। ও মানুষ। মানে আলাদা করে ও কেয়ারটেকার, কাজের লোক, গৃহিণী এসব বলার দরকার পড়বে না। ও আশাবাদী একটা মানুষ।

টলি টেলস-এ অপি করিমমাহমুদ মানজুর: গল্পের সোমা আর বাস্তবের এই অপির মধ্যে কোনও যোগাযোগ আছে?

অপি করিম: আমাদের মধ্যে হয়তো সোশ্যাল স্ট্যাটাসে মিল নেই। কিন্তু একটা মিল তো আছেই। আশাবাদের বিষয়ে। আমি ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব আশাবাদী একজন মানুষ। মানে পাঁচ বছর আগেও একটু দ্বিধা ছিল, প্রশ্নবোধক চিহ্ন আসতো কথায় কথায়। হবে কী হবে না। এখন পুরোপুরি পজিটিভ আমি। কেন, জানি না।

মাহমুদ মানজুর: সিনেমা দেখেন?

অপি করিম: সত্যি বলতে খুব একটা ছবি এখন আর দেখা হয় না। তবে সাম্প্রতিক ছবিগুলোর মধ্যে ‘হালদা’ আর ‘দেবী’ দেখেছি। ‘হালদা’ দেখার পর মনে হলো, মানুষগুলো ছবিটার জন্য কী কষ্টটাই না করেছে। বুকটা ভরে গেছে সিনেমার জন্য মানুষগুলোর ডেডিকেশন দেখে। এরপর বলবো ‘দেবী’র কথা। মাত্র দেখে এলাম ঢাকা থেকে। জয়া আপাও ছিলেন, যমুনার ব্লকবাস্টারে। এটা দেখার পর মনে হলো- দর্শক তার কল্পনার তৈরি মিসির আলি থেকে বের হয়ে ছবিটা দেখতে হবে। তবে পুরো ছবির আনন্দটা পাওয়া যাবে। পরিচালক অনম, প্রযোজক জয়া শতভাগ সফল হয়েছেন।

আর অভিনেতা জয়া তো জয়াই। তার কথা বলার কিছু নেই। এর বাইরে শবনম ফারিয়া, অনিমেষ, ইরেশ খুব ভালো করেছে। আমার বেশি ভালো লেগেছে এই ছবিটার সাউন্ড, লাইট, ক্যামেরার কাজ। মানে একটা সিনেমার প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট যখন সমান অ্যাফোর্ট দেয়, সেটা ভালো কিছু হতে বাধ্য। এভাবে সবাই কাজ করলে আমাদের সিনেমার নতুন দিন ফিরতে বেশি সময় লাগবে না।

টলি টেলস-এর দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নায়ক দেবের পেইন্টিংমাহমুদ মানজুর: তো আপনার কাছে কী মনে হচ্ছে, ‘ডেব্রি অব ডিজায়ার’ কেমন হচ্ছে। তাছাড়া আপনি ও আপনার পরিচালকের কাছে প্রত্যাশাও তো অনেক।
অপি করিম: বললাম তো, আমি ভাই আশাবাদী মানুষ। কখনওই এত হিসাব-নিকাশ করিনি। করলে তো রেগুলারই কাজ করতাম। ডেফিনেটলি যখন যে কাজটা করি তখন মাথায় থাকে দর্শক-সমালোচকদের ভালো কিছু উপহার দেওয়ার। এখন এটার হিসাব কী হবে, দর্শক কীভাবে নেবে, আমি জানি না। যদি দর্শক কাজটাকে উইলিংলি নেয় খুবই খুশি হবো। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই, আমি অভিনয়ই করতে চাই। আমাকে অভিনয় করতে দিন, অভিনয় করার জায়গা তৈরি করুন।
মাহমুদ মানজুর: আসলেই কী নিয়মিত অভিনয় করতে চান! কিন্তু অনুযোগ রয়েছে, আপনি শুটিং-সিডিউলের চেয়ে শিক্ষকতা আর আর্কিটেকচার নিয়েই বেশি আগ্রহী ও ব্যস্ত।
অপি করিম: এটা ভুল অভিযোগ। অভিনয় অবশ্যই করতে চাই। আপনাকে একটা পাল্টা প্রশ্ন করি তাহলে, আমাদের নাটকের অবস্থা ও মান এখন কেমন?
মাহমুদ মানজুর: মাঝে খারাপ ছিল। তবে গেলো দুই ঈদে দারুণ ভালো কিছু কাজ হয়েছে। সামনে নিশ্চয়ই আরও ভালো হবে।
অপি করিম: না। মোটেও তা না। খুব খারাপ অবস্থা। আমরা যখন নিয়মিত কাজ করেছি বা আমাদেরও আগে যে কাজ হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় এখনকার নাটকের মানের অনেক পার্থক্য। এটা আমার প্রথম অবজার্ভেশন। দ্বিতীয়ত, আপনি কোথায় গিয়ে শুটিং করবেন? যেখানে আপনার জন্য একটা ভালো টয়লেটের ব্যবস্থাও থাকবে না। আপনি কার সঙ্গে শুটিং করবেন? আমি সেটে গিয়ে বসে থাকি সকাল ৮টায়, আর কোআর্টিস্ট মহারাজ আসেন হেলেদুলে বেলা ১২টা-১টার সময়! এরপর রাত ৩টা-৪টা পর্যন্ত শুটিং চলে। এভাবে নিয়মিত কাজ করা সম্ভব বলেন? আমরা শুটিংয়ের আগে একটা গল্প পাই, দুই দিনের মধ্যে সেটি নিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস তৈরি হয়। এভাবে কাজ করলে বদনাম তো আমারই হবে। আপনারাই বলবেন, আপনি খারাপ কাজ করেছেন। এই দায় নিয়ে কেন নিয়মিত কাজ করবো?
মাহমুদ মানজুর: তবুও করছেন তো। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, নাচ এমনকি নাটকও। যদিও সেসব ঈদ-উৎসবের জন্য।
অপি করিম: উপস্থাপনা লম্বা সময় নিয়েই করেছি। সুবিধা আছে। আমার শিক্ষকতার অফিস শেষ করে নিজের মতো করে শুটিং ডেট ফিক্সড করা যায়। একদিন সন্ধ্যার পর গেলাম, তিন-চার পর্বের শুটিং করে চলে এলাম। নাচের অবস্থাও তাই। আর নাটকের বেলায় সাধারণত সাগর জাহান আর আশফাক নিপুণের কাজ করি। কারণ, ওরা দুজন আমার এ টু জেড বোঝে। মানে আমার গল্প ভাবনা, আমার সিডিউল- সব। তাই ওদের কাজটা করা হয় ঈদে-চাঁদে। যদি দেখেন কোনও ঈদে বা একেবারেই আমার কোনও কাজ নাই, তখন ধরে নেবেন সেই সময় আমার হাতে কোনও ভালো স্ক্রিপ্ট আসে নাই অথবা সিডিউল মেলাতে পারিনি।
মাহমুদ মানজুর: তার মানে আপনার কাজ করার বিষয়টা মূলত সিডিউলের ওপর নির্ভর করে। মানে শিক্ষকতার বাইরে সময়-সুযোগ পেলে। বিষয়টা এমনই তো!
অপি করিম: তা মনে করি না। এই কাজটা করতে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এলাম না? আমার কলিগ, ডিপার্টমেন্ট, প্রতিষ্ঠান বিনা শর্তে সেই সুযোগটা বরাবরই দিতে চান। এবারও যেমন দিলেন। কিন্তু কোন কাজটার জন্য কতটুকু ছাড় দেবো সেটাও তো বিষয়।
তাছাড়া রিপিটেড ক্যারেক্টারে কেন কাজ করবো? ২০ বছর হলো অভিনয় করছি। তো যে চরিত্র করে ফেলেছি সেরকম আরেকটা চরিত্র করার মানে নেই তো। এমনকি বহু আগে একটা নাটক করেছিলাম। সেই গল্পটা নিয়ে এখন একটা সিনেমা হবে। আমাকে প্রস্তাব পাঠালেন। করলাম না। কেন করবো? দুনিয়ায় গল্পের এত অভাব? মানে আমারও তো একটা প্রাণের খোরাক আছে। তাই না?
আরেকটা বিষয় আমাদের ওখানে দু’দিনে কেমন করে একটা নাটক শেষ করে! আমি তো অসুস্থ হয়ে যাই। এখানে (কলকাতা) সন্ধ্যা ছ’টা বাজলেই ছুটি। আর ওখানে (ঢাকা) রাত ৪টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। পরের দিন সকালে সবারই তো কাজ থাকতে পারে। প্রত্যেকটা জীবনে একটা ডিসিপ্লিন দরকার। এটা খুব মেনটেইন করি। 

বাংলা ট্রিবিউনের অ্যাসিসট্যান্ট নিউজ এডিটর জনি হক, অভিনেত্রী অপি করিম ও প্রযোজক জসীম আহমেদ

মাহমুদ মানজুর: শিক্ষকতা, নিজের অফিস, পরিবার ও অভিনয়। এখন আপনার লাইফস্টাইল কেমন?

অপি করিম: শুরু থেকে একইভাবে চলছি এখনও। ইউনিভার্সিটি লাইফে ক্লাস করতাম। এখনও একই। ইউনিভার্সিটিতেই আছি। আগে ক্লাস করতাম, এখন ক্লাস করাই। ক্লাসে ছিলাম, ক্লাসেই আছি। আগে স্টুডেন্টদের আসনে বসতাম। এখন শিক্ষকের আসনে দাঁড়িয়ে থাকি। আগে শিক্ষকদের কাছে প্রজেক্ট জমা দিতাম, এখন জমা নিই। এর বাইরে আমার একটা আর্কিটেকচার ফার্ম আছে। এর নাম ‘মৃ’। সেখান থেকে এখন প্রজেক্ট দেই অন্যদের।

মাহমুদ মানজুর: মানে ক্লাসের বাইরে আর আসা হলো না আপনার। বলছিলাম, বেশিরভাগই অভিনয়ের জন্য প্রায় সব ছাড়ে। আর আপনি ক্লাসের জন্য তাই করছেন! 

অপি করিম: তা মোটেও নয়। যদিও মানুষ তাই ভেবে নেন। কারণও আছে। আমাকে কেউ যখন ফোন করে সিডিউল চায়, তখন প্রথমেই বলি আমার প্রজেক্ট সাবমিশন আছে! তখন আমাকে একটা কমন কথা শুনতে হয়— ‘তোমার এই প্রজেক্ট সাবমিশন কি জীবনেও শেষ হবে না?’ এর বাইরে আসলে আমার আর বের হওয়া হবে না। কারণ নিয়মহীন শুটিং ও গভীরতাহীন গল্পের জন্য ক্লাসের টান ছাড়তে পারবো না।

মাহমুদ মানজুর: এরপর… আমরা লাইফস্টাইল প্রসঙ্গে ছিলাম। মানে কেমন করে কাটে শুটিংয়ের বাইরে…

অপি করিম: এর বাইরে ব্যক্তিজীবন। আর এখন মঞ্চে বেশ সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। অভিনয় হিসেবে না। সেখানে এখন সেট ডিজাইন করি। সম্প্রতি ‘গ্যালিলিও’র জন্য সেট সাজিয়েছি। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ‘ওপেন কাপল’-এর সেট করছি। ভালোই লাগে।

নায়ক দেবের ‘টলি টেলস’ এর ইনটেরিয়র

মাহমুদ মানজুর: ‘ডেব্রি অব ডিজায়ার’-এর পর নতুন আর কিছু? নাকি ফের ক্লাস রুমে ফিরে যাবেন।

অপি করিম: ক্লাসে তো ফিরবোই। তবে আরেকটা ভালো প্রজেক্ট আছে। কলকাতারই। তবে এখনই বলা যাবে না। আগে এটা শেষ করি। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়লো। আজ  থেকে প্রায় সাত-আট বছর আগের ঘটনা। আমার সঙ্গে তখন কথা হয়েছে একজন নির্মাতার। তো উনি হুট করে শুটিং ডেট দিয়ে দিলেন। আমি তো অপ্রস্তুত। ক্লাস চলছে। শুটিং করতে পারছি না। তো সেই পরিচালক বললেন, আমি নাকি শুটিংয়ের ডেট দিচ্ছি না। খুব বিব্রত হয়েছি তখন। সেই থেকে যতক্ষণ না অ্যাগ্রিমেন্ট সাইন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আসলে নতুন কাজ নিয়ে বলতে চাই না। তবে এই অফার কেম ফ্রম অ্যানাদার ইন্ডিয়ান ডিরেক্টর।

মাহমুদ মানজুর: আচ্ছা এটা কি বলা যায়— কলকাতা আমাদের ঢাকার সুঅভিনেত্রীদের বেছে বেছে নিয়ে আসছে? জয়া আহসান, সোহানা সাবা, জ্যোতিকা জ্যোতি প্রমুখ। এখন আপনি যুক্ত হলেন পরপর দুটি ছবিতে। তার মানে কী আমরা নিজেরাই আমাদের শিল্পীদের সঠিক জায়গা দিতে পারছি না!

অপি করিম: এভাবে বলতে চাই না। এমনও হতে পারে এঁরা (কলকাতার নির্মাতা-প্রযোজক) যে ধরণের গল্প ভাবে সেখানে আমরা সামহাউ ম্যাচ করি। ঢাকায় হয়তো তারা যেভাবে যে গল্পগুলো ভাবে সেখানে হয়তো আমরা ফিটিং করি না। মানে সব মিলিয়েই তো বিষয়টা। আমি ওরকম বলবো না, আমাদের একদমই পাত্তা দেওয়া হয় না ঢাকায়। মানে ওনারা যা ভাবেন সেখানে হয়তো একজন অপি বা জয়াকে দরকার পড়ে না। ম্যাচ করে না। যেটা আবার এখানে করে।

মাহমুদ মানজুর: এই সাবলীল উত্তরের আড়ালে দীর্ঘশ্বাস নেই তো!

অপি করিম: না-না। অভিমানের কিছু নেই। পরিবার আর স্টুডেন্ট ছাড়া কারও সঙ্গে অভিমান করি না। আমার সমস্ত রাগ পরিবার আর শিক্ষার্থীদের ওপর।

ক্যামেরা রিহার্সেলে অপি করিম ও পরাণ বন্দোপাধ্যায়মাহমুদ মানজুর: এই ছবির গল্পটা শুনে দেবের ডায়নিং থেকে উঠতে চাই। চাপ না থাকলে বলতে পারেন।

অপি করিম: এটা বলা খুব কঠিন। কারণ আমি তো জানি না আপনি ছবিটাকে কোন চোখে দেখবেন। আমরা তো প্রতিটি বিষয়ই যে যার মতো করে দেখার চেষ্টা করি। আমার চরিত্র যেটা করছি, সেটা কিন্তু তিন নম্বর। আমি বলবো এই গল্প, এর প্রতিটা চরিত্রে এত শেড, এত লেয়ার, প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে এত ঢেউ। বরং সোমার চরিত্রটি বেশ সোজা। সব মিলিয়ে মানুষ এই ছবিতে মানবিক কিছু দেখবে। একেকটি চরিত্রে একেক ধরনের মানবিক বিষয় কাজ করবে, দর্শক দেখার পর।

মাহমুদ মানজুর: ওকে। আজ  তাহলে এটুকুই থাক। অল দ্য বেস্ট।

অপি করিম: তার আগে একটা সিরিয়াস কথা বলতে চাই। একেবারে হৃদয় থেকে। সেটা হলো— থ্যাংক ইউ সো মাচ। কারণ, কলকাতায় এসে আমার সিনেমার খবরটুকু নেওয়ার জন্য। আমাকে সময় দেওয়ার জন্য। এত লম্বা একটা গল্প বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। এটা আমার জন্য অনেক প্রশান্তির একটি বিষয়। মনে হচ্ছে পরবাসে হলেও দেশটা আমার সঙ্গেই আছে। থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর কামিং।

মাহমুদ মানজুর: ইউ অলওয়েজ ওয়েলকাম। কিন্তু দেবের কথা তো কিছু বললেন না!

অপি করিম: হা হা হা। কী বলবো! এখানকার খাবার সত্যিই সুস্বাদু। ইন্টেরিয়র দারুণ। সিনেমার গল্প করার জন্য কলকাতায় এটা বেস্ট প্লেস, দেয়ালজুড়ে সিনেমার গল্প। থ্যাংকস দেব!গল্পের ফাঁকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ‘টলি টেলস’-এ অপি করিম

/জেএইচ/

লাইভ

টপ