আমার কাছে সংসদ এখনও সিনেমা দেখার মতো: ফারুক

Send
মাহমুদ মানজুর
প্রকাশিত : ১৯:৩৭, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১১, জানুয়ারি ১৬, ২০১৯

আমার কাছে সংসদ এখনও সিনেমা দেখার মতো। অথচ আমার আসনেই সিনেমা হল নেই- ভিন্ন দুই প্রসঙ্গে কথাগুলো বললেন ঢাকা–১৭ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান (ফারুক)। যিনি মূলত ‘নায়ক ফারুক’ অথবা ‘মিয়া ভাই’ নামে সমধিক পরিচিত। সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর ১৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর এক রেস্তোরাঁয় বিনোদন বিভাগের সংবাদকর্মীদের নিয়ে নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের সঙ্গে কথায় কথায় বললেন সংসদ ও চলচ্চিত্র নিয়ে তার কর্মপরিকল্পনা ও কিছু আক্ষেপের কথা।

আকবর হোসেন পাঠান (ফারুক)বাংলা ট্রিবিউন: সিনেমার বাইরেও দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা বহু পুরনো। তবে এবারই প্রথম দলীয় সমর্থন নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেন এবং সাংসদ নির্বাচিত হলেন। আপনাকে অভিনন্দন।
ফারুক: ধন্যবাদ। আপনাদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা। কারণ, সবসময় বিনোদন পরিবারের বেশিরভাগ মানুষকেই আমি পাশে পেয়েছি। এটা আমার বড় গর্বের জায়গা।
বাংলা ট্রিবিউন: এতদিন বাংলাদেশের সিনেমার একটি অংশ ছিলেন। এবার বাংলাদেশ সরকারেরও অংশ হলেন। সিনেমার গুণগত উন্নয়নের জন্য নিশ্চয় পরিকল্পনা রয়েছে আপনার।
ফারুক: সিনেমার উন্নয়নের জন্য তো মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী মহদয় থাকছেন। তারা নিশ্চয়ই সিনেমার উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। এটা ঠিক, সব কিছুর পরেও সিনেমার মিয়া ভাই হিসেবে একটা বাড়তি ফিলিং-তো থাকবেই। তাই সিনেমার লোকদের সাথে থেকে আবার সরকারের সঙ্গে থেকে চেষ্টা করবো- কিছু করার। ইন্ডাস্ট্রিটা ছোট, কিন্তু প্রবলেম বড়। ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। সময় লাগবে সমাধানের।
সিনেমা নিয়ে আমার ফিলিং বেশি, কারণ এখান থেকেই ফারুক হয়েছি। ফারুক হওয়ার পর জানতে পেরেছি এটা (বিএফডিসি) বানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর প্রতি যে শ্রদ্ধা, সেটা তো সাগরের চেয়েও গভীর। তাই, যেখানে যে অবস্থানেই থাকি না কেন- স্বাভাবিকভাবেই এটার উন্নয়ন চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৮ এর পর কয়েকটি ছবিতে পাওয়া গেছে আপনাকে। যদিও আপনার মূল ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ২৯ বছর আগেই। এখন তো এমপি হলেন। সিনেমায় আর দেখা যাবে আপনাকে?
ফারুক: ক্যামেরার সামনে তো আসাই যায়। বাধা তো দেখি না। প্রবলেম তো অন্য বিষয়ে। সেটা খুলে বললে অনেক কথা বলতে হয়। আমাদের সিনেমায় আসলে টেকনিক্যাল প্রবলেম। সিনেমা হলের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সহজ শর্তে ব্যাংক লোন যদি মালিকদের দেওয়া যায়- তাহলে আমাদের অনেক সমস্যারই সমাধান হতে পারে। হলগুলোতে সিলভার স্ক্রিন, ডলবি সাউন্ড সিস্টেম হয়ে গেলে কিন্তু মানুষ অটোমেটিক আসবে। আমাদের এখানে প্রডিউসার কিন্তু ঘুর ঘুর করে, আরও আসবে। দরকার শুধু উন্নত সিনেমা হল। আরেকটা কথা আছে- আমরা নকলে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমরা মৌলিক গল্প থেকে দূরে সরে গেছি। সিনসিয়ারিটি থাকতে হবে আমাদের কাজে।
আমি সিনেমার ১৮টা সংগঠনের কনভেইনার ছিলাম। এখনও আছি। সবসময় সবাইকে বলি, ভালো ছবি করো। আবার ভালো বানালেই বা দেখাবে কোথায়? সেটাও ভাবি। আমরা যখন সিনেমা শুরু করি তখন দেখলাম, পাইপ দিয়ে একটা রেল লাইন বানালো। সেটার উপর ক্যামেরা। দেখলাম ক্যামেরাটা হেঁটে একেবারে মুখের কাছে চলে আসছে। জানতে পারলাম, ওটার নাম ট্রলি শট। বাহ! মজা পেলাম তখন। অভিনয়ে আরও মজা পেলাম। অথচ এখন শুটিংয়ে কতো সুযোগ-সুবিধা, যা ইচ্ছা তাই করা যায়। অথচ আমরা কিছু পারছি না।
বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু পারছি না কেন?
ফারুক: এগুলোর প্রপার ইউজ হচ্ছে না। আমি বানালাম বা অভিনয় করলাম একটা চিন্তা থেকে, স্ক্রিনে গিয়ে দেখলাম আরেকটা। এটা মজা লাগে না। চলচ্চিত্রটাকে আমরা যেভাবে নিয়েছি, সেভাবে এখন নেয় না। আমাদের সময় ৪৫ থেকে ৬০ শিফটে একটা সিনেমা হতো। এখন ১৫-২০ শিফটে বানিয়ে ফেলে! ডেফথ থাকে না। একটু ধরে বুঝে শুনে বানানো দরকার। আমার মনে হয় হয়ে যাবে। টোটাল চেঞ্জ দরকার।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো সিনেমা পরিবেশনার জন্য একটা সেন্ট্রাল সার্ভারের কথাও বলেছিলেন সম্ভবত। যেখান থেকে সারা দেশের সিনেমা অপারেট করা যাবে।
ফারুক: সেটা কে লাগাবে? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা কে বাঁধবে? পুরো বিষয়টা সরকারের করতে হলে আগে সেটাকে বুঝতে হবে। সময় লাগবে। ৩০-৫০ কোটি টাকা দাম একটা সেন্ট্রাল সার্ভারের। এটা তো মুখের কথা না। তাই আমার প্রথম দাবি, সিনেমা হলগুলিতে প্রপার প্রজেক্টর মেশিন, সাউন্ড সিস্টেম আর হল সংস্কারের জন্য সহজ শর্তে লোন। আশা করি, এসব হয়ে যাবে।
বাংলা ট্রিবিউন: আবার একটু আপনার অভিনয়ে ফেরা যাক। সংসদ ভবন থেকে শুটিংয়ে ফেরার সময় হবে তো?
ফারুক: অবশ্যই। আগেও বলেছি এতে কোনও বাধা নেই। অভিনয়ে আমার কোনও ক্লান্তি নেই। আমার চাহিদা গল্প, ক্যারেক্টার আর মেশিনারিজ। কাজ করবো মন দিয়ে, সিনেমা হলে তার ইফেক্ট না থাকলে তো করবো না।
বহু বছর পর একটা গল্প পছন্দ হয়েছে সম্প্রতি। চারটা ইয়াং ছেলে এসেছিল। গল্পটা শুনলাম। রাজিও হলাম। কিছু পরামর্শ দিলাম। বললাম, এখনই আর্ট-কালচার কইরো না। বিজনেসটাকে সামনে রেখে সিনেমাটা বানানোর চেষ্টা করো। কারণ, লাভের মুখ দেখলে আর্ট-কালচার অনেক করা যাবে। তো ছেলেগুলো কাজটা আর করলো না। এত বেশি বুঝলে তো সমস্যা। পরামর্শ দেওয়াটাও দেখি অপরাধের মতো!
আকবর হোসেন পাঠান (ফারুক)বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তিনটি ছবি বানানোর ঘোষণা দিয়েছেন বেশ কিছুদিন আগে। সেগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
ফারুক: একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। অভিনয়ের ভবিষ্যত যেটা, প্রযোজনাও একই। আমার কষ্টার্জিত পয়সা দিয়ে ছবি বানাবো, সেটা তোমরা দেখবা না, আমি প্রপারলি দেখাতে পারবো না- তো সেই সিনেমা বানাবো কেন?
আরেকটা বড় দুঃখজনক বিষয়। আমজাদ ভাই। তিনি তো চলে গেলেন। শেষের দিনগুলোতে আমরা দুজন বসে বসে সারাক্ষণ আলাপ করতাম। কী বানালে, কীভাবে করলে আমরা আবার ভালো ছবি করতে পারবো। ঐ সোফাটা খালি থাকে এখন, যেখানে তিনি বসতেন। আমাদের প্রডাকশন হাউজের নাম রেখেছি ‌‘আমরা দুজন’।
তো একদিন আমাদের আলাপের মধ্যে হঠাৎ আমজাদ ভাই আমাকে বললেন, ‘মিয়া ভাই, আমাদের সংসার তো বেশিদিন চালাতে পারিনি। টেকেনি।’ আমি বুঝলাম তার কথা। বললাম, ‘আমারও তাই মনে হয়। যে কারণেই হোক, সংসারটা টেকাতে পারিনি আমরা।’ তা না হলে, ‘গোলাপী’র মতো ছবি করার পর আমজাদ আর ফারুক একসঙ্গে নাই কেন? এই আফসোসগুলো আমরা করতাম একই সঙ্গে সিনেমার উন্নয়নের জন্য কী কী করা দরকার সেসব নিয়েও আমরা সারাদিন ভাবতাম। সেই ভাবনার মানুষটি এখন আর নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকা-১৭ আসনের এমপি হলেন। সংসদে নিশ্চয়ই নিজ এলাকার জন্যই কথা বলবেন। চলচ্চিত্রের জন্য বলবেন তো?
ফারুক: এটা হলো রাজধানী। এখানে অনেক সাবধানে পা ফেলতে হয়। রাজধানীর একজন এমপির অনেক সাবধানে পা বাড়াতে হয়। কথা বলতে হয়। আমি এখনও পার্লামেন্টেই গেলাম না। ওখানে কী হয়। কে কেমন কথা বলেন। জানি না তো। আমরা টেলিভিশন পর্দায় সংসদ অধিবেশন বা সংসদ ভবনকে যেমন দেখি, বিষয়টা তো হুবহু তেমন কিছু নয়। আমার কাছে সংসদ এখনও ঘরে বসে টিভি পর্দায় সিনেমা দেখার মতো! সংসদের ভেতরে যারা কাজ করেন, এটা যে কত কঠিন, সেই কঠিন জায়গাটাতে এখনও আমি যেতে পারিনি। একটি সিনেমা দেখার পর যে কোনও দর্শক কমেন্ট করে ফেলতে পারেন- এটা ভুয়া ছবি! কিন্তু সে তো জানে না, এই সিনেমাটা বানানোর পেছনে কত মানুষ কষ্ট, মেধা, শ্রম আর অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। তেমনি আমার কাছেও সংসদটাকে এখন পর্দায় দেখা সিনেমার মতো। কারণ, সেই জায়গাটাতে এখনও আমি যেতে পারিনি। কিন্তু আমি সাধারণ দর্শকের মতো- এটা নিয়ে কোনও কমেন্ট করতে চাই না।
আগে সেখানে যাই। যাওয়ার পরে বুঝতে পারবো- সেটার পরিবেশ পরিস্থিতি। এরপর দেখবো এলাকার মানুষের জন্য কিছু চাওয়ার বাইরে প্রিয় সিনেমার জন্য কিছু বলতে পারি কি না! তবে আমার মনে হয় সুযোগ পেলে অবশ্যই আমি সিনেমার কথা বলবো। সবাই যেভাবে সবসময় আমাকে এই বিষয় নিয়ে চেপে ধরছে, সেটা করা ঠিক নয়। বিব্রত হই।
বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু এমপি ফারুকের প্রতি বিনোদন পরিবারের অনেক প্রত্যাশা-
ফারুক: সেটা বুঝি। কিন্তু বিব্রতও হই। একটা কথা কী জানেন, সন্তানদের অনেক আশা থাকে বাবার ওপর। কিন্তু সন্তানদের এটাও বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে, যে তার বাবার আর্নিং কতটুকু। এখানে একটা কথা বলি, আমি যে এলাকাতে আছি; ঢাকা-১৭। এখানে অনেক কাজ করার আছে। সে জন্যই মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছেন। তাদের দাবিগুলোর দিকেও তো আমাকে তাকাতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: এটা ঠিক। সাংসদ হিসেবে আপনার প্রথম প্রায়োরিটি ঢাকা-১৭। এবং এটাও তো বিস্ময়কর, আপনার আসনে একটা সিনেমা হলও নেই!
ফারুক: হ্যাঁ, নেই। এটা সত্যি। এটা অনেক বড় এলাকা। আমি সিনেমারই একজন মানুষ। অথচ আমার আসনেই সিনেমা হল নেই! সেটাই বলছি, ঢাকা-১৭ তে অনেক কিছু করার আছে আমার। প্রথমে ভাবলাম, কাজ বেশি করা লাগবে না। মাঠে গিয়ে দেখি অনেক কিছু করার বাকি। আরেকটা কথা বলে রাখি, আমি সিনেমার মানুষ হয়ে ভোটে যাইনি। আমি গিয়েছি রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা থেকে। তাই ঢাকা-১৭ এখন আমার প্রাণ, চলচ্চিত্র আমার হৃদয়। কোনোটাকেই আমি অ্যাভয়েড করতে পারবো না। দুটো নিয়ে ঝামেলায় থাকবো মনে হয়।
বাংলা ট্রিবিউন: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক: আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালোবাসা আমার বিনোদন পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি।

/এমএম/

লাইভ

টপ