তেলুগু সিনেমায় প্রশংসিত, বিমানবন্দরে নিগৃহীত ঢাকার অভিনেত্রী!

Send
মাহমুদ মানজুর
প্রকাশিত : ১৫:৪৫, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৮, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

মেঘলা মুক্তা/ ছবি: আবির হোসাইন নোমানঢাকার উদীয়মান অভিনেত্রী মেঘলা মুক্তা হেনস্তার শিকার হলেন ভারতের হায়দরাবাদ বিমানবন্দরে! অথচ একই অঞ্চলের দেড় শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে এখনও চলছে সেই অভিনেত্রীর সিনেমা।  
দক্ষিণ ভারতের তেলুগু ইন্ডাস্ট্রির মূলধারার এই ছবিটির নাম ‘সাকালাকালা ভাল্লাবুড়ু’। বাংলাদেশের কোনও অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রে এটাই তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম পা। ১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণের দেড়শ’টি প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পায় এটি।
ছবি মুক্তি উপলক্ষে এর প্রচারণায় অংশ নিতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকা থেকে হায়দরাবাদে উড়ে যান মেঘলা। সফল প্রচারণা আর অভিনয় প্রশংসা নিয়ে গেল ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন এই অভিনেত্রী। তবে টানা এক সপ্তাহে দক্ষিণের দর্শক-সমালোচকদের কাছ থেকে পাওয়া অসামান্য সেই ভালোবাসার প্রায় সবটুকুই ম্লান হয়ে গেল হায়দরাবাদ বিমানবন্দরে। সেখানে এয়ার ইন্ডিয়ার এক গ্রাউন্ড স্টাফের কাছে ভয়ংকর নিগ্রহের শিকার হলেন ঢাকার মেয়ে মেঘলা মুক্তা।
মেঘলা মুক্তা/ ছবি: রফিকুল ইসলাম র‌্যাফদেশে ফিরে ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলা ট্রিবিউনকে এমনটাই জানালেন তিনি। বললেন, ‘অভিনেত্রী হিসেবে নয়, পৃথিবীর কোনও সাধারণ যাত্রীই যেন আমার মতো এমন অপমান আর নিগ্রহের শিকার না হন। এই প্রার্থনাই করছি সেদিনের পর থেকে। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা।’
কিন্তু সেদিন কী এমন ঘটেছিল? অভিনেত্রীরাও তো অন্যায় করতে পারেন! এমন অভিমতের বিপরীতে মেঘলা বললেন, ‘দেখুন ভুল বলেন আর অন্যায় বলেন, কিছু একটা তো হয়েছেই। তবে সেই ভুলের জন্য যে এত বড় মূল্য আমাকে দিতে হবে সেটি কল্পনাও করিনি।’
মেঘলা এবার বললেন সবিস্তারে, ‘‘যাত্রী হিসেবে আমার ক্যারি করার সুযোগ ছিল ২৮ কেজি। আমি সে হিসেবেই বন্দরে এসেছি। কিন্তু সেখানে আসার পর চেকইন কাউন্টার থেকে বললো আমার মালামালের ওজন ২৯ কেজি। মানে এক কেজি বেশি। তো এটা তো হয়েই থাকে। বাড়তি চার্জ দিয়ে দিলেই প্রবলেম সল্ভড। মূলত তখন থেকেই আমাকে অপমান করার শুরু। কিন্তু আমি সেসব গায়ে না মেখে বিনয়ের সঙ্গেই এয়ার ইন্ডিয়ার ঐ স্টাফকে বললাম, ‘বাড়তি এক কেজির জন্য আমি নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ করছি। সমস্যা নেই।’ এর পরেও ঐ গ্রাউন্ড স্টাফ সুপারভাইজার কানিজ ফাতেমা আমার সঙ্গে অশোভন আচরণ করতে থাকলেন। বললেন, ‘পরিশোধ করতে হলে ক্রেডিট কার্ডে করতে হবে। আছে আপনার কাছে?’ বললাম, ‘না। আমার কাছে ডলার আছে। সেটি কনভার্ট করে আমি পরিশোধ করছি। একটু সময় দিন।’ তখন সেই ভদ্র মহিলা ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘ক্রেডিট কার্ড নেই যখন আপনার বাসে চলাচল করা উচিত। বিমানে নয়!’’
মেঘলা আরও জানালেন, এভাবে অনেকক্ষণ ধরে সবার সামনে আমি যখন অহেতুক হেনস্তা হতে থাকলাম তখন একই বিমানের কয়েকজন যাত্রী এগিয়ে এলেন। তারা চাইলেন আমার ব্যাগের বাড়তি ওজন শেয়ার করতে। কিন্তু তাতেও কানিজ ফাতেমা রাজি হয়নি। উল্টো ঐ ভদ্রমহিলা সবার সামনে বলে বসলেন, ‘আপনি এখানে কোনও ব্যবসা বা চুক্তি করতে পারেন না।’ এরপর আমি নিজের পরিচয় দিলাম। বললাম, ‘আমি একজন অভিনেত্রী।’ এটা শুনে সে আরও বাজে ব্যবহার শুরু করলো। এরপর উপায় না দেখে বললাম, ‘আপনি একজন যাত্রীর সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন না। আমি আপনার নামে কমপ্লেইন দেবো।’ তিনি হেসে উঠে আমাকে ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘অভিযোগ করে কোনও লাভ নেই। করুন।’’
অভিযুক্ত গ্রাউন্ড স্টাফ/ ছবি: মেঘলা মুক্তাঅবশেষে মেঘলা ডলার এক্সচেঞ্জ করে বাড়তি ওজনের ফি দিয়ে বিমান ছাড়ার আগমুহূর্তে ছাড়া পান।
মেঘলা মুক্তা সেদিন এয়ার ইন্ডিয়ার AI780 নম্বর ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন। সেদিন বিমানবন্দরেই এয়ার ইন্ডিয়ার অভিযোগ ডেস্কে বিষয়টি জানান। দেশে ফিরে এর প্রতিকারের জন্য বিমানটির সদর দফতরে একটি লিখিত অভিযোগও করেন তথ্য-প্রমাণসহ।
মেঘলা বললেন, ‘দেখুন আমি দেশে ফিরে সব ভুলে গেলেই পারতাম। কারণ, কাজের স্বার্থেই হায়দরাবাদে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে হবে এখন। কিন্তু আমি নিজের স্বার্থে সেদিনের অন্যায় অপমান হজম করতে চাই না। আমি চাই না, পৃথিবীর কোনও যাত্রী এমন ছোট্ট কারণে এত বড় অপমানের শিকার হোক। প্রতিটি যাত্রী সমান সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। একজন যাত্রীর কাছে ক্রেডিট কার্ড না থাকা মানে সে বিমানে চড়ার যোগ্যতা হারাবে! এই কথা বলার অধিকার একজন বিমান স্টাফ কেমন করে পায়? অতিরিক্ত ওজন হলে সেটির সমাধানও তো আছে। বাড়তি পে করতে হবে। করেছিও। কিন্তু বিনা কারণে আমি সেদিন একটা ঘণ্টা হেনস্তা হলাম। এটা তো মেনে নেওয়া অন্যায়। আমি এর বিচার দাবি করে যাবো। আমি এয়ার ইন্ডিয়াকে মেইল করে অফিশিয়াল লেটার দিয়েছি। তাদের কাছ থেকে যৌক্তিক উত্তরের অপেক্ষায় আছি।’

‘সাকালাকালা ভাল্লাবুড়ু’র এক ঝলক:

এদিকে বিমানবন্দরে অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার আগে দক্ষিণের দিনগুলো দারুণ রোমাঞ্চকর ছিলো মেঘলা মুক্তার। বললেন, ‘এটা অপ্রকাশযোগ্য অনুভূতি। আমরা সাত দিনে অসংখ্য সিনেমা হলে ঘুরেছি পুরো টিম। সিনেমার প্রতি মানুষের যে টান দেখলাম, শিল্পীদের প্রতি দর্শকদের যে রেসপেক্ট, আতিথেয়তা- সেটি আসলে বলে বোঝানো যাবে না। মানে, কল্পনাই করা যায় না- একই অঞ্চলের অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা নিয়ে ফেরার পথে একজন মহিলার (গ্রাউন্ড স্টাফ) কাছে এভাবে অপমানিত হবো।’
তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন কাজের খবর কী? জবাবে মেঘলা বলেন, ‘সত্যি বলতে প্রথম ছবিটি ছিল একটু লো বাজেটের। মানে, সেখানে একটা সিনেমার সাধারণ বাজেট হয় ১০ থেকে ৫০ কোটি পর্যন্ত। তবে আমাদের এই ছবির বাজেট ছিল মাত্র ৩ কোটি রুপি। যার কারণে, এই ছবিটি শহরের বাইরের প্রেক্ষাগৃহে বেশি চলছে। মানে গ্রামাঞ্চলে। মূল শহরগুলোতে আমরা যেতে পারিনি। তো এরমধ্যে আরেকটি ছবির বিষয়ে প্রায় চূড়ান্ত করে এসেছি। এটির বাজেট বেশ বড়। যদিও এসব নিয়ে আগাম বলা একেবারেই নিষেধ। মার্চের প্রথম সপ্তাহে আমি আবার যাচ্ছি সেখানে। তখন সব চূড়ান্ত হবে আশা করছি।’
ছবিটির একটি দৃশ্যে নায়কের সঙ্গে মেঘলাভারতের তেলুগু ভাষায় নির্মিত ‘সাকালাকালা ভাল্লাবুড়ু’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন শিবা গণেশ। মেঘলা এই ছবির গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার চরিত্রের নাম চৈত্রা।
এ ছবিতে তার বিপরীতে নায়ক হিসেবে আছেন তানিষ্ক রেড্ডি। অন্যদিকে মেঘলার বাবার চরিত্রে আছেন তামিল ও তেলুগু ছবির জনপ্রিয় অভিনেতা সুমন তালওয়ার। যিনি রজনীকান্তের ‘শিবাজি’ ও অক্ষয় কুমারের ‘গাব্বার ইজ ব্যাক’-এ খল অভিনেতা ছিলেন।
তেলুগু ভাষার বাণিজ্যিক ঘরানার এই ছবিতে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই সহজ কিছু ছিল না। মেঘলা বলেন, ‘ভারতে গিয়ে তেলুগু ভাষার ছবিতে অভিনয় করা আসলেই কঠিন একটা কাজ ছিল। কোনও দিনই এমন সুযোগ পাবো বলে আশা করিনি। এটা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। অনেক পরিশ্রম করেছি। সব উসুল হয়ে গেল তখনই, যখন হলে গিয়ে দেখলাম মানুষ আমাকে পর্দায় দেখেই শিষ মারে, হৈহৈ করে ওঠে।’
প্রসঙ্গত, মেঘলা মুক্তা নিয়মিত মডেলিং ছাড়াও শাকিব খানের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘নবাব’-এ অভিনয় করেছেন।মেঘলা মুক্তা/ ছবি: রনি রেজাউল

/এমএম/

লাইভ

টপ