নারী দিবসের পরদিন আমার যা মনে হয়

Send
জ্যোতিকা জ্যোতি, অভিনেত্রী
প্রকাশিত : ১৭:১২, মার্চ ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪০, মার্চ ০৯, ২০১৯

জ্যোতিকা জ্যোতিসাজগোজ করতে আমার একদমই ভালো লাগে না। না মানে না। টুয়েলভ ক্লাস পাস করার পর জীবনে প্রথমবার আমি লিপস্টিক দিয়েছি ও ভ্রু প্লাক করেছি, তাও প্রেমিকের উৎসাহে!
তারপর হঠাৎ কোনও উৎসব-অনুষ্ঠানে সবার সাথে আমিও সেজেছি পারিপার্শ্বিকতার চাপে। কিন্তু অভিনয় করতে গিয়ে যখন মেকআপ নিই, তখন অবশ্য কোনও চাপ অনুভব করি না। বরং তখন আনন্দ নিয়ে আসল আমাকে অন্য একটা চরিত্র বানিয়ে তোলার জন্য মনোযোগ দিয়ে কাজটা করি। কিন্তু আমার প্রতিদিনকার জীবনে সাজগোজ, পোশাকআশাক মেইনটেইন করতে ভালো লাগে না।
বেশিরভাগ সময় আমি একেবারেই সাধারণভাবে রাস্তায় বের হই। তখন মানুষের চোখ আমাকে বলে- এই বুঝি নায়িকা! সেই মানুষরাই যখন মেকআপ সাজুগুজুসহ আমাকে দেখেন, তখন দেখি তাদের চোখে আমার গুরুত্ব বেড়ে যায়! আমার মন তখন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। কাছের মানুষেরা বলে, তোমার যা পেশা তার জন্য তোমাকে সবসময় নায়িকার মতোই সেজে থাকা উচিত। এভাবে কেউ বের হয়?
বুঝি, কিন্তু আমি আমার স্বভাবের বাইরে যেতে পারি না।
গত সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় প্রার্থীর পক্ষে এভাবেই প্রচারণার মাঠে ছিলেন জ্যোতিতো, এই যে একজন অভিনেত্রীর সাজুগুজু ইমেজ সমাজ তৈরি করে রেখেছে সেটা আসলে কেন? কেন রং সাদা করে, ঠোঁট লাল করে, তাদের কাঙ্ক্ষিত পোশাক পরে, হেলেদুলে ন্যাকা সেজে আমাকে হাজির থাকতে হবে? পুরুষশাষিত সামাজিক গঠনতন্ত্র এবং নারীবাদীদের কাছে কি এর কোনও সমাধান আছে?
আবার নারী দিবসে সেই ‘তারা’ই যখন আমার সাদামাটা উপস্থিতির স্তুতি গায় বা আমাকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানায়, তখন আমার কেমন অনুভূতি হয় সেটা হয় তো কোনও কোনও নারী বুঝলেও বুঝতে পারছেন।
জ্যোতিকা জ্যোতিএখনও আমাদের সমাজে বাইরে কাজ করা এবং অবশ্যই মিডিয়ায় কাজ করা নারীদের ‘খারাপ মেয়ে’ বা ‘বাজে মেয়ে’ হিসেবেই ট্রিট করে। কোথাও কখনও মিডিয়া বা বাইরে কাজ করা নারীকে বাড়তি কদর দেখালেও, তাদের সাথে মতের বনিবনা বা উদ্দেশ্য চরিতার্থ না হলে সেই জায়গা ত্যাগ করার সাথে সাথেই নারীটি তাদের কাছে ‘খারাপ/বাজে মেয়ে’ হয়ে ওঠে। নারী দিবসে আবার সেই বাজে মেয়েদেরই তারা শুভেচ্ছা, সম্মাননা দেন প্রথম প্রহর থেকে।
নারী দিবসের পরদিন (৯ মার্চ) আমি সেসব কাণ্ড ও খবরাখবর খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি!
এলিট পার্টি বা আড্ডায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অন্য সকল পেশার নারীদের রেখে প্রথমে সিগারেট বা মদ অভিনেত্রীদেরই অফার করেন পুরুষেরা। এতে তারা নিজেকে স্মার্ট হিসেবে হাজির করার চেষ্টায় থাকেন এবং তারা মনে করেন মিডিয়ার মেয়েদের যে কোনও কিছুই অফার করা যায়। অভিনেত্রী সে অফার রিফিউজ করলেই প্রস্তাবক ‘পুরুষ’টির কাছে সেই নারী দেমাগি, বেয়াদব এবং খারাপ মেয়ে হয়ে ওঠে!
নারী দিবসে সেই বুদ্ধিজীবীরা স্ত্রীদের স্তুতি গেয়ে থাকেন শাশ্বত চিরন্তন বাঙালি নারী হিসেবে। তার ঘরের স্ত্রী সারাজীবন ঘরে থেকে কীভাবে তাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন ইত্যাদি। আবার পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা তাদের কন্যাদেরও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কন্যাকে পৃথিবী দেখতে দিলেও নিজের স্ত্রীকে ঠিকই তার ঘর ও বিছানার সীমানাতেই শেকল পরিয়ে রেখেছেন! নারীটিও সারাজীবন গুণী স্বামীর গুণমুগ্ধ হয়ে জীবন পার করছেন।
নারী দিবসের পরদিন আমি সেইসব পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের এইসব সেলিব্রেশন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখি! মাজা পাই। আপন মনে হাসি।
অনেক পুরুষ নিজেকে নারী হিসেবে দাবি করেন। নারী হৃদয়ের ক্ষমতা, মমতার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নারীদের দেবতা বন্ধু হয়ে ওঠেন তারা। নারী দিবসে তাদের কেউ নারীদের অলংকার পরে নানারকম মহান ছবি বা নানান অলংকারযুক্ত শব্দে নারীর সাথে তাদের মনের একাত্মতা প্রকাশ করেন।
নারী দিবসের পরদিন আমার চেনা এইসব কোনও কোনও মহান পুরুষদের পেছনের গল্প খুবকরে মনে পড়ে।
তারপর আমাদের বেগুনি-গোলাপি শাড়ির নারীবাদীরা যারা স্লিভলেস ব্লাউজ পরা, সিগারেট খাওয়া ও পুরুষদের বিরুদ্ধে তর্ক করাকেই মনে করেন নারীবাদ, নারী দিবসের পরদিন তাদের নানান উৎসব, উদযাপনের মুখরতা দেখি!
জ্যোতিকা জ্যোতিতবে নারী দিবসের প্রকৃত ইতিহাস যা পুরুষদের সমান কর্মক্ষমতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও নারী শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রতিবাদ দিয়ে শুরু- সে বিষয়ে খুব একটা কথাবার্তা দেখি না। সেসব ইতিহাসের জের ধরে বর্তমানে কর্মক্ষমতা ও মেধাসম্পন্ন নারীদের যোগ্য ক্ষমতায়ন ও মূল্যায়ন হচ্ছে কিনা সে নিয়ে আলাপ, সভা-সেমিনার খুব একটা চোখে পড়ে না। শুধু নারী দিবসের শুভেচ্ছার চাপে চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
নারী দিবসের পরদিন থেকে পরের বছর নারী দিবসের আগের দিন পর্যন্ত আমার শুধু মনে পড়তে থাকে- নারীবাদী গৃহকর্ত্রী দ্বারা কাজের মেয়েটাকে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়ার কথা, অগণিত ধর্ষিতা নারীর ধর্ষকদের বিচারের আওতায় না আনার কথা, রাস্তাঘাটে-যানবাহনে-মানুষের ভিড়ে নারীর মানসিক ও যৌন নির্যাতনের কথা, স্বামীদ্বারা প্রতিনিয়ত লক্ষ কোটি স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা, যৌতুকের জন্য স্বামী-শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দ্বারা কতশত নারীকে পুড়িয়ে, কুপিয়ে, ঝুলিয়ে মেরে ফেলার কথা, যোগ্য স্ত্রীকে স্বামীদের দমিয়ে রাখার ছলাকলার কথা, সমাজ দ্বারা প্রতিনিয়ত নারীকে অবমূল্যায়ন ও অবহেলার কথা। আরও আরও আরও অনেক কথা!
এত কিছুর পরও যে নারী নিজেকে সম্মান করে, নিজের মেধা ও ইচ্ছার মূল্যায়ন করে এবং যে পুরুষ নারীর কাজ ও ইচ্ছাকে সত্যিকার অর্থেই সম্মান করে, তাদের প্রতি হৃদয় গহীন থেকে জানাই শ্রদ্ধা।
লেখক: অভিনেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

/এমএম/

লাইভ

টপ