শাহনাজ রহমতুল্লাহর সঙ্গে শেষ দিন

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৬:৩১, মার্চ ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৩, মার্চ ২৪, ২০১৯

২৩ মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে না ফেরার দেশে চলে যান নন্দিত কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ঠিক তার আগের পুরোটা দিন (২২ মার্চ) যার কেটেছে হারমোনিয়ামের রিডে হাত রেখে, কণ্ঠে ছিল নিজের গাওয়া দেশাত্মবোধের গান। আরেক কণ্ঠশিল্পী দিনাত জাহান মুন্নীকে সঙ্গে নিয়ে রেওয়াজ করেছেন, ২৬ মার্চের বিশেষ এক অনুষ্ঠানে গাইবেন বলে। স্বাধীনতা দিবসের সেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিলেও গাওয়া আর হলো না তাঁর।
শাহনাজ রহমতুল্লাহর শেষ দিন (২২ মার্চ) কেমন ছিল, কী করেছেন, কী বলেছেন—তার সবটুকুই উঠে এসেছে কণ্ঠশিল্পী দিনাত জাহান মুন্নীর আবেগী এই লেখায় :

শাহনাজ রহমতুল্লাহর সঙ্গে শেষ দিন- দিনাত জাহান মুন্নী ও ফোয়াদ নাসের বাবুবেশ কয়েক বছর আগে একটি টেলিভিশন লাইভে তাঁর (শাহনাজ রহমতুল্লাহ) একটি গান করেছিলাম। সেই সুবাদে তিনি আমাকে খুঁজে বের করে টেলিফোনে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার গান নিয়মিত গাইবে।’
এরপর মাঝেমাঝেই ফোন করতেন। বলতেন, ‘বাসায় এসে কিছু গান তুলে নিস।’ তুমি থেকে তুই, আহা ভালোবাসা। কিছু দিন আগে এক ঘরোয়া আড্ডায় দেখা হলো বরেণ্য কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে। সেখানে ছিলেন শ্রদ্ধেয় ফেরদৌসী রহমানসহ তিনিও। শাহনাজ আপা গাইলেন ‘খোলা জানালায়’ গানটি। তার সঙ্গে গাওয়ার জন্য ডেকে নিলেন তপন চৌধুরী, আগুন, শফিক তুহিন আর আমাকে। দলবেঁধে গাইলাম তারই সাথে।
গত সপ্তাহে ফোয়াদ নাসের বাবু ভাই ফোন করে বললেন, ‘মুন্নী তুমি শাহনাজ রহমতুল্লাহর গান গাইবে তারই সামনে বসে। এটি হবে ২৬ মার্চের একটি বিশেষ আয়োজন।’ ভাবলাম, এটা বুঝি স্বপ্ন দেখছি, বাস্তবে নয়। বাবু ভাই দু’দিন আগে ফোন দিয়ে আবার বললেন, ‘প্র্যাকটিস করতে হবে, শাহনাজ রহমতুল্লাহর বাসায় গিয়ে।’ এরই মাঝে শাহনাজ আপার ফোন, বললেন- ‘তুই শুক্রবার (২২ মার্চ) তোর হারমোনিয়াম এবং বকুলসহ (গীতিকার কবির বকুল) আমার বাসায় চলে আসবি।’ শুক্রবার বকুলের কাজ থাকায় একাই গেলাম সকাল সাড়ে ১১টার দিকে। দরজা খুলেই আমাকে তিনি বুকে জড়িয়ে রাখলেন প্রায় ৩০ সেকেন্ড। আমাকে পেয়ে কী থেকে কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আহা! বেলের শরবত বানিয়ে রেখেছেন আমার জন্য। কতো কথা। নিজের শোবার বালিশ এনে আমাকে হেলান দিয়ে বসালেন। আমার হারমোনিয়ামে হাত দিয়েই বললেন,  ‘এতো সুরেলা! আমারটাও একটু টিউন করিয়ে দিবি তুই?’
এরপর একের পর এক গান বাজিয়ে শেখাতে লাগলেন আমাকে। আমার জন্য ধুয়ে রাখা কত রকমের ফল ট্রলিতে করে নিয়ে এলেন। এরপর হাঁকডাক, ‘এই আমার বোন আমার সাথে খাবে। গাছের লাউ রান্না করো, কই মাছ’। এটা সেটা কতকিছুর পদ!
এরই মাঝে ফোয়াদ নাসের বাবু ভাইও চলে এলেন। ২৬ মার্চ দেশটিভিতে শাহনাজ রহমতুল্লাহর গান ‘ট্যাগোর ট্যারাস’ থেকে সরাসরি সম্প্রচার হবে। গাইবেন তিনি এবং সঙ্গে আমিও। আসাদুজ্জামান নূর ভাই সরাসরি সেই অনুষ্ঠানে থাকবেন।
এরপর একের পর এক গান তুললাম। তালিকা তৈরি করলাম। এরই মাঝে নামাজের সময় হলো। আমার জন্য তারই পাশে জায়নামাজ সাজালেন। নিয়ত বেঁধেছি, হঠাৎ উপলব্ধি করলাম টেবিল ফ্যান টেনে এনে আমার পেছনে চালিয়ে দিলেন, যেন আমার গরম না লাগে!
সাম্প্রতিক এক আড্ডায় তপন চৌধুরী, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, ফেরদৌসী রহমান, দিনাত জাহান মুন্নী প্রমুখএরপর বাবু ভাই ও রহমতুল্লাহ ভাইসহ একত্রে দুপুরের খাবার খেলাম। আবারও প্র্যাকটিস করলাম। বিকাল সাড়ে ৪টায় ফেরার পালা। আমাকে বললেন, ‘তোর বাসায় যাবো অনুষ্ঠানের (২৬ মার্চ) পরই।’ এরপর ঘরের কাপড় পরেই ছয়তলা থেকে নিচে নেমে এসে বিদায় দিলেন আমাকে। বারবার বুকে জড়িয়ে ধরছিলেন। চালকের সিটে আমি, তাই গেট পর্যন্ত আমাকে নিরাপদে যাওয়ার জন্য বিদায় জানালেন। গাড়ির ভেতর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘সাবধানে যাস....’।
এই শেষ বিদায়, শেষ কথা। এর ঠিক ৩১ ঘণ্টা পর আপনাকে চিরবিদায় জানাতে হবে, তা জানতাম না আপা। আপা, আপনার জীবনের শেষ দিনটায় আপনার সাথে থাকা স্মৃতিগুলো এখন আমাকে ভয়ঙ্কর কষ্ট দিচ্ছে। আমি কিছুতেই এই সময়গুলো থেকে বের হতে পারছি না আপা।
সম্পাদনা: মাহমুদ মানজুর

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ