কান কথা-৪ সিনেমার ‌‘অলিম্পিক’

Send
জনি হক, কান (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশিত : ০২:০২, মে ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০৩, মে ১৮, ২০১৯

কান উৎসব থেকে দেওয়া বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের এবারের আইডি কার্ডকানের চারদিকে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি। যেদিক তাকাবেন চোখে পড়বে দামি দামি ইয়ট আর স্পিডবোট। কান উৎসবে সিনেমা আর তারকা দেখার পাশাপাশি আরেক আকর্ষণ সাগরপাড়ের সৌন্দর্য। বর্ণিল আয়োজন, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির পসরা, দর্শক উপস্থিতি, চলচ্চিত্রানুরাগীদের মিলনমেলা, সংবাদকর্মী, আলোকচিত্রী ও উৎসুক মানুষের সমারোহে কান হয়ে উঠেছে সিনেমার ‘অলিম্পিক’।
অফিসিয়াল সিলেকশনের ছবিগুলোর কলাকুশলী ছাড়াও কান উৎসব কর্তৃপক্ষ অনেক তারকাকে আমন্ত্রণ জানান। বিভিন্ন অফিসিয়াল পার্টনার প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাও দাওয়াত পান। এছাড়া লালগালিচার জৌলুস বাড়াতে বিভিন্ন দেশের নামিদামি তারকা ও মডেলদের আনা হয়। যাদের সব ব্যয় আয়োজকদের।
অ্যাক্রেডিটেশন পেয়ে কানসৈকতে ভিড় করেন বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা। তাদের জন্য এবার প্রেস বিভাগ পুনর্বিন্যাস করা হয়। এখন হেড অব প্রেস অফিস হিসেবে আছেন আইদা বেলুলিদ। তাকে দেখে মনেই হবে না এত বড় একটি দায়িত্ব পালন করছেন! বয়সে তরুণী। সংবাদকর্মীদের অ্যাক্রেডিটেশন, তাদের জন্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের ভার তার কাঁধে। গত ২ জানুয়ারি থেকে নতুন পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আলফনসো কুয়ারন, টেরেন্স ম্যালিক, ফাতি আকিন, সের্গেই লজনিৎসা ও নিকোলাস উইন্ডিং রেফনের ছবির প্রচারণার অভিজ্ঞতা আছে তার ঝুলিতে। মরক্বোর মারাকেশ ও ফ্রান্সের দ্যভিল, ব্যুন ও জেরার্দমার চলচ্চিত্র উৎসবে প্রচারণায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি।হেড অব প্রেস অফিস আইদা বেলুলিদএদিকে ছবি কেনাবেচার বাজার মার্শে দ্যু ফিল্মে ১২ হাজার ফিল্ম প্রফেশনালস, দেড় হাজারেরও বেশি সিনেমা ক্রেতা (পরিবেশক) আর ভিলেজ ইন্টারন্যাশনালে ১৬০টি দেশের ৪০ হাজার প্রতিনিধি নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করে এসেছেন। এছাড়া গত আসরে যুক্ত করা ‘থ্রি ডেজ ইন কান’ পাস নিয়ে ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী প্রায় দুই হাজার তরুণ-তরুণী উৎসবের ৭২তম আসরে প্রতিযোগিতা বিভাগ, প্রতিযোগিতা বিভাগের বাইরে, স্পেশাল স্ক্রিনিং, আঁ সাঁর্তে রিগার, কান ক্ল্যাসিকস ও সিনেমা ডি লা প্লাজের ছবি উপভোগ করছে। গত ১৫ থেকে ১৭ মে এর প্রথম ভাগ হয়েছে। আগামী ২৩ থেকে ২৫ মে রয়েছে দ্বিতীয় ধাপ। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সুবিধার্থে সাগরপাড়ের শহরটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে রেস্তোরাঁ আছে প্রায় ৯০০টি। সবটাতেই সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খানাপিনা চলতে থাকে। রাত ৯টায় সূর্য ডুবলে বেশিরভাগ খাবারের দোকানে গান-বাজনা শোনা যায়।
দিনভর পালে দে ফেস্তিভাল ভবনের বিভিন্ন থিয়েটারসহ কানসৈকতের কয়েকটি পাঁচতারকা হোটেল ও প্রেক্ষাগৃহগুলোতে এখন চলছে নতুন নতুন ছবির প্রদর্শনী। এছাড়া থাকে চলচ্চিত্র বিষয়ক নানান আয়োজন। ই-মেইলে সেসব তথ্য এসে ভরে যায়! এর মধ্যে বেছে বেছে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করি। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন কিংবা লালগালিচায় কখন কোন তারকা চলে আসেন, সেদিকে সজাগ থাকতে হয় বলে বেশিরভাগ পার্টি মিস করতে হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন ছিল না। তাই এবারের আসরে আঁ সার্তে রিগারের প্রধান বিচারক নাদিন লাবাকির সঙ্গে আড্ডার সুযোগ লুফে নিলাম। তার ওপর তিনি আসবেন হোটেল ম্যাজেস্টিক ব্যারিয়েরে। কানসৈকতে সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেলগুলোর অন্যতম এটি। লিফটে সাত তলায় উঠে মনে হলো আলিশান কোনও জমিদার বাড়িতে ঢুকে পড়েছি! আড্ডার নির্ধারিত স্থান সাগরমুখো। সেই নীল জলরাশির সৌন্দর্যে চোখ আটকে থাকে। কান ছাড়া এই দৃশ্য উপভোগের সুযোগ নেই!
লেবানিজ নারী নির্মাতা নাদিন লাবাকি কানের সন্তানতুল্য! কানসৈকতেই তার সেলুলয়েড যাত্রা শুরু হয়েছিল। এ পর্যন্ত তিনটি ছবি পরিচালনা করেছেন তিনি। সবই প্রদর্শিত হয়েছে কানে। এর সুবাদে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এসেছে তার মুঠোয়। ১৫ বছর আগে কান উৎসবের সিনেফঁদাসোতে অংশ নেন তিনি। এরপর ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে তার পরিচালিত প্রথম ছবি ‘ক্যারামেল’ প্রদর্শিত হয় ২০০৭ সালে। নারীর অবস্থা ও ধর্মীয় টানাপোড়েনকে ঘিরে তার বানানো ‘হোয়্যার ডু উই গো নাউ?’ ২০১১ সালে স্থান পায় আঁ সার্তে রিগারে।
গত বছর নাদিন লাবাকির তৃতীয় ছবি ‘কেপারনম’ কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেয়। এতে বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ক্ষয়ে যাওয়া শৈশব, শরণার্থী জীবন ও সমাজের ফাটলগুলোর ওপর আলোকপাত করেন তিনি। ছবিটির সুবাদে তার হাতে ওঠে কানের জুরি প্রাইজ। কান চলচ্চিত্র উৎসবে হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার পর অস্কার আর গোল্ডেন গ্লোবেও মনোনয়ন পায় লেবাননের ‘কেপারনম’। তার হাত ধরে আরবি ভাষাভাষি দেশগুলোর প্রথম কোনও নারী নির্মাতার চলচ্চিত্র অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস ও গোল্ডেন গ্লোবের বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে।
হতবাক করার মতো ব্যাপার হলো, নাদিন লাবাকি ছবি বানানো শুরুর সময় লেবাননে কোনও চলচ্চিত্র শিল্পই ছিল না‍! তার ওপর তিনি নারী। এসব কারণে অনেক প্রতিবন্ধকতা পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। তবে তিনি বলেন, ‘আমার কখনও মনে হয়নি, মেয়ে হয়েছি বলে কিছু করতে পারবো না।’
উঠতি নারী ফিল্মমেকার বা যারা এই পথে পা ফেলতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে নাদিন লাবাকির বার্তা, ‘মনের ভেতর কী অনুভব করছো তার ওপর নির্ভর করবে সফল হবে কিনা। আর পর্দায় কোন প্রতিফলন দেখাতে চাও সেটা নির্ধারণ করাও জরুরি।’

‘ওমেন ইন মোশন টক’ শীর্ষক আড্ডাটি আয়োজন করে ফরাসি বিলাসবহুল পণ্যের ব্র্যান্ড কেরিং। কানে অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে বাছাইকরা কয়েকজনকে ই-মেইল পাঠানো হয়। এর উত্তরে নিজের আগ্রহ দেখালে তারা ইনভাইটেশন পাঠান। নাদিন লাবাকির দু’চার কথা শোনার সুযোগ পেতে ই-মেইল পাওয়া মাত্র দেরি করিনি। মধ্যপ্রাচ্যের এই নারী নির্মাতা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন। পরিচয় দিতেই বুঝে ফেললাম তা। এরপর তিনি পাশে দাঁড়িয়ে ছবিও তুললেন।
নাদিন লাবাকির মতোই বাংলাদেশ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেন ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের চেয়ারম্যান প্রসূন জোশি। ভারতীয় প্যাভিলিয়নে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা। তবে সেন্সর বোর্ডের প্রধান নয়, গীতিকার হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত। হিন্দি ছবিতে অসংখ্য জনপ্রিয় গান আছে তার।
ভারতীয় প্যাভিলিয়ন থেকে বেরিয়ে লালগালিচা উপভোগ করছিলাম হেঁটে হেঁটে। যেদিকে তাকাই শুধু মানুষ আর মানুষ! তারকারা একেকজন পায়চারি করে সিঁড়িতে দাঁড়ালেই উৎসুক মানুষের মধ্যে হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে যায়। দূর থেকে দেখেও কত না শান্তি তাদের!নাদিন লাবাকির সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদক

/এমএম/

লাইভ

টপ