কান কেন গুরুত্বপূর্ণ

Send
জনি হক, কান (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশিত : ১৮:২২, মে ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৯, মে ২৬, ২০১৯

৭২তম কান উৎসবের অফিসিয়াল পোস্টারদক্ষিণ ফ্রান্সের সাগরপাড়ের শহর কানে আয়োজন করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব। কান কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার এটি একটি কারণ।
চলচ্চিত্রানুরাগী ও চলচ্চিত্র শিল্পের মানুষদের কাছে কান হলো তীর্থভূমি। কান নিয়ে তামাম দুনিয়ার আগ্রহের শেষ নেই। কেন? একশব্দে বললে ঐতিহ্য! গত ১৪ মে শুরু হওয়া কানের ৭২তম আসরের পর্দা নামলো ২৫ মে।   
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ছায়াছবি দুনিয়ার প্রায় সবাই ও রূপালি পর্দার অনুরাগীরা মে মাসে বছরের সবচেয়ে বড় আয়োজন কান চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য দক্ষিণ ফরাসি উপকূলে দুই সপ্তাহের জন্য দেশান্তরী হয়। চাকচিক্যময় তারকাখচিত লালগালিচা প্রিমিয়ার, দিনভর ছবির প্রদর্শনী, মিটিং, নেটওয়ার্কিং ও পার্টির সম্মিলন থাকে সাগরপাড়ের এই শহরে। ন্যূনতম আগ্রহ থাকলেও কান উৎসবে প্রদর্শিত ছবি দেখার সুযোগ হাতছাড়া করে না বেশিরভাগ মানুষ।    
কানের উচ্চারণ
অনেক ইংরেজি ‘ক্যান’ শব্দের মতো এর উচ্চারণ। তবে ‘ক্যানস’ নয়‍! ফরাসি অনেক শব্দের শেষের ‘এস’-এর উচ্চারণ উহ্য থাকে। আর শব্দটি ফরাসি হওয়ায় স্বরভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যদিও বেশিরভাগ ইংরেজি জানা মানুষ এটাকে ‘ক্যান’ বলে থাকে। তারা আদতে ভুল করেন।
কানের বিভাগ
উৎসবে প্রদর্শনের জন্য কিছু চলচ্চিত্র নির্বাচন করা হয়। মর্যাদাসম্পন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকরা প্রায়ই স্থান পান এই আয়োজনে, যাদের কাজ আগেও কানে জায়গা করে নিয়েছে। মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২২টি ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। এগুলো উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দ’রের (স্বর্ণ পাম) জন্য লড়ে। এবার এই সম্মান জেতে দক্ষিণ কোরিয়ার বঙ জুন-হো পরিচালিত ‘প্যারাসাইট’। স্বর্ণ পাম ছাড়াও উৎসবে সাতটি পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাঁ প্রিঁ ও প্রিঁ দ্যু জুরি।
উৎসবের অফিসিয়াল প্রোগ্রাম কয়েকটি ভাগে বিভক্ত থাকে। সারাবিশ্বে বেশিসংখ্যক দর্শকের মধ্যে আবেদন তৈরি করতে পারবে এমন আর্টহাউস ছবিগুলোকে এগুলোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আঁ সাঁর্তে রিগার বিভাগে নির্বাচন করা হয় সীমিতসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে পরিবেশনার সুযোগ থাকা নান্দনিক ছবি, যেগুলোর আন্তর্জাতিক পরিচিতির লক্ষ্য রয়েছে।
নির্বাচক কমিটি স্বীকৃতি দিতে চায় কিন্তু প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে পড়ে না এমন ছবিকে রাখা হয় আউট অব কম্পিটিশনে। এবারের আসরে ব্রিটিশ কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী এলটন জনের বায়োপিক ‘রকেটম্যান’ ছিল এই বিভাগে। প্রতিযোগিতার বাইরে আরও থাকে স্পেশাল স্ক্রিনিংস, মিডনাইট স্ক্রিনিংস, ট্রিবিউটসসহ নানান আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনা করে এমন শিক্ষার্থীদের ছবির বিভাগ হলো সিনেফঁদাসো। এগুলোর দৈর্ঘ্য হতে হবে একঘণ্টার মধ্যে। উৎসব চলাকালীন অন্যান্য সংগঠনের আয়োজনে কয়েকটি প্যারালাল বিভাগ থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট, স্যুমেন দ্যু লা ক্রিতিক ও এসিড। এর মধ্যে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে প্রবীণ ও উদীয়মান সব ধরনের নির্মাতার কাজ জায়গা পায়। আর ক্রিটিকস উইকে কেবল উদীয়মানদের ছবি স্থান করে নিতে পারে।
কান কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয় কানকে। মূলত এর এক্সক্লুসিভিটি ও সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগের উদ্বোধনী প্রদর্শনী দক্ষিণ ফ্রান্সে হওয়ার লম্বা ইতিহাস প্রধান কারণ। ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ থেকে ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত ও জনপ্রিয় ছবির প্রিমিয়ারগুলো এখানেই দেখা গেছে। কানের হাত ধরে কোয়েন্টিন টারান্টিনো, স্টিভেন সোডারবার্গসহ স্বনামধন্য অনেক পরিচালকের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল।
আয়োজকরা বেশ সুচারূভাবে সীমিতসংখ্যক ছবির প্রোগ্রামিং চর্চার ভাবমূর্তি ধরে রেখেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার ও সংগীত পরিচালকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক প্যানেলের রায়ে পুরস্কার দেয় কান। এছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছবি বেচাকেনার বাজার মার্শে দ্যু ফিল্ম দেখভাল করে কান।
কানের পুরস্কার অনেক বড় ব্যাপার ও সম্মানের। এর মাধ্যমে পরিচালকদের প্রশংসিত ক্যারিয়ার শুরু হয়। পাশাপাশি পরিচালক হিসেবে জায়গা পাওয়া যায় অনায়াসে। একইসঙ্গে হলিউডের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানগুলোতে সাফল্য পাওয়ার পথ সুগম করে দেয় কান। যেমন, ২০১১  সালে ‘দ্য আর্টিস্ট’-এর পয়লা প্রদর্শনী হয়েছিল কানসৈকতে। ওইবার এই ছবির তারকা জ্যঁ দুজারদা সেরা অভিনেতা হন। পরে এটি সেরা চলচ্চিত্রসহ পাঁচটি বিভাগে অস্কার জেতে। ফরাসি কোনও ছবির এই জয় এটাই ছিল প্রথম। গত বছর স্পাইক লি’র ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’ কানে গ্রাঁ প্রিঁ জেতার পর অস্কারে সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পান।
কিন্তু কানের গুরুত্ব পুরস্কার জয়ের চেয়েও বেশি। কোন ছবিগুলো দর্শকদের মন ভরাবে তার ওপর প্রভাব থাকে এই আয়োজনের। কানে বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মার্শে দ্যু ফিল্ম। এটাই বিশ্বের ব্যস্ততম চলচ্চিত্র বেচাকেনার বাজার। বিশেষ করে পরিবেশকদের জন্য বিদেশি, আর্টহাউস ও অন্যান্য মানসম্পন্ন ছবি পাওয়ার উপযুক্ত স্থান এটি। সাধারণত তারা বছরের সেরা কেনাবেচা করেন এখানেই। নির্মাতারা তাদের ছবির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও পরিবেশক পাওয়ার আশায় কানের নেটওয়ার্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী, পরিবেশক ও পাবলিসিস্টদের সঙ্গে সময় কাটান।
কানে কারা যেতে পারে
সানড্যান্স কিংবা টরন্টোর মতো বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের চেয়ে কান আলাদা। এটি শুধুই শিল্পবান্ধব আয়োজন। এর অর্থ হলো ছবি প্রদর্শনীর টিকিট সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি হয় না। আয়োজকরাই পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, পাবলিসিস্ট, পরিবেশক ও সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন দেয়। এজন্য প্রত্যেককে আবেদন করতে হয়। কান কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করলেই মিলে যায় ব্যাজ।
উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে ঢোকার সময় ব্যাজ দেখাতে হয়। ধনী বিনিয়োগকারী ও প্রযোজকরা নিজেদের প্রিমিয়ার উদযাপন কিংবা মানসম্পন্ন ছবি পেতে পার্টির আয়োজন করেন। এজন্য তাদের ভাড়া করতে হয় বিলাসবহুল হোটেল স্যুট। একইসঙ্গে ভূমধ্যসাগরের তীরে নোঙর ফেলতে হয় ইয়ট।
কানের জৌলুস লালগালিচায় পৃথিবী গ্রহের নামিদামি নক্ষত্রদের দেখা যায়। তবে ব্যাজ না থাকলেও উৎসবের নির্বাচিত ছবির দেখার সুযোগ আছে সাধারণ মানুষের। আয়োজকরা প্রতিদিন রাত সাড়ে ৯টায় ম্যাসি সৈকতে খোলা আকাশের নিচে ধ্রুপদী ছবি দেখায়। অনেকে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত না হলেও ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন ক্লাবের সদস্য হিসেবে কান সিনেফিল ব্যাজ পায়। এছাড়া বিভিন্ন ছবির প্রদর্শনীর আগে আয়োজকরা  টিকিট দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যাজধারীরা অগ্রাধিকার পায়।
লালগালিচা প্রিমিয়ারগুলোতে ছেলেদের টাক্সেডো ও বো-টাই পরে আসা বাধ্যতামূলক। এর ব্যতিক্রম খুব কমই ঘটে। এমন নজির কালেভদ্রে যেগুলো হয়েছে সবই আয়োজকদের অনুমতি সাপেক্ষে। সুতরাং ব্যাজ কিংবা টিকিট থাকলেও ফরমাল স্যুট ও বো-টাই পরে না গেলে লালগালিচায় ঢোকার সম্ভাবনা কমে যায়। আর নারীদের উঁচু হিল পরতে হয়, যদিও এ নিয়ে বাঁধাধরা নিয়ম নেই।
*৭২তম কান উৎসবের বিজয়ী তালিকা

/এমএম/

লাইভ

টপ