নীরবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের মঞ্চনাটক

Send
ওয়ালিউল বিশ্বাস
প্রকাশিত : ১২:২৪, জুন ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩০, জুন ০৭, ২০১৯

সংবাদমাধ্যম বা প্রচারণার পাদপ্রদীপে খুব একটা থাকে না মঞ্চনাটকের দলগুলো। কিন্তু প্রতি বছরই ঈর্ষণীয় ধরনের প্রযোজনা আসছে নাটকপাড়ায়। মুক্তি ও কাজের সংখ্যায় চলচ্চিত্রের চেয়ে অনেকাংশেই এগিয়ে মঞ্চনাটক। কিছু নাটকের গুণগত মান ও বৈচিত্র্য অন্য যেকোনও মাধ্যমের সৃষ্টিশীলতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এগুলো পেয়েছে দর্শকদের প্রশংসা।
২০১৮ সালে মঞ্চে এসেছে ৫০টির বেশি নাটক। যার মধ্যে আলোচিত আছে বেশ কয়েকটি। প্রশংসিতও হয়েছে কিছু নাটক। চলতি বছরেও এর সংখ্যা মন্দ নয়।
নাট্যজনেরা বলছেন, মঞ্চের প্রতি ভালোবাসা ও ডেডিকেশনেই নাটকের দলগুলো এ পর্যন্ত এসেছে। তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের দর্শকও।
‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’সাম্প্রতিক আলোচিত কিছু নাটকের হালহকিকত নিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন নাট্যবোদ্ধার সঙ্গে। তারা জানান, প্রতিদিন ঢাকা শিল্পকলা একাডেমির তিনটি মঞ্চে নাটক মঞ্চায়ন করা হয়। এছাড়া মহিলা সমিতি, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই নাটকের প্রদর্শনী হয়। সারাদেশে পাঁচ শতাধিক নাট্য সংগঠন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। এর একটা বড় অংশ নিয়মিত না হলেও বিভিন্ন উৎসব উদযাপন উপলক্ষে নাটক মঞ্চায়ন করে থাকে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনভুক্ত এবং ফেডারেশনের বাইরে অন্তত ৫০/৬০টি দল আছে, যারা নিয়মিত নাটকের কাজ করে। এসব সংগঠন প্রতিবছর না হলেও দুই বছরে অন্তত একটি নতুন নাটক মঞ্চে আনার চেষ্টা করে।
সেখান থেকে উঠে এসেছে নন্দিত কিছু নাটক। আবার পুরনো প্রযোজনা নতুনভাবে মঞ্চে আসছে, যা দর্শকরা বেশ ভালোভাবে গ্রহণও করেছেন। এরমধ্যে আছে ‘গ্যালিলিও’ ও ‘নিত্যপুরাণ’ নাটক দুটি। আরণ্যকের ‘ইবলিশ’ নতুনভাবে মঞ্চে আসার পর এর প্রতি দর্শকদের তুমুল আগ্রহও দেখা যায়।
‘নিত্যপুরাণ’নতুন নাটকের মধ্যে সম্প্রতি মঞ্চে আসে সৈয়দ জামিল আহমেদের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, নাট্যচক্রের ‘একা এক নারী’, ‘হ্যাপি ডেইজ’, ‘অনুদ্ধারণীয়’, ‘রসপুরাণ’, ‘জননী সাহসিকা’, ‘রহু চণ্ডালের হাড়’, নাগরিকের ‘ওপেন কাপল’, প্রাঙ্গণেমোর-এর ‘হাছনজানের রাজা’, হৃদমঞ্চ রেপার্টরির ‘রুধিঙ্গিনী’, যাত্রিক রেপার্টরির ‘অ্যান ইনস্পেক্টর কলস’, ঢাকা থিয়েটারের ‘পুত্র’, পালাকারের ‘উজানে মৃত্যু’, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য আলকেমিস্ট’ প্রভৃতি। ২০১৮ সালে মঞ্চে আসা আরও কিছু নাটক হলো, লোক নাট্যদলের (বনানী) ‘ঠিকানা’, রাজশাহীর অনুশীলন নাট্যদলের ‘বুদেরামের কূপে পড়া’, চট্টগ্রামের নান্দিমুখের ‘আমার আমি’, অ্যাভাগার্ডের ‘নবান্ন’, সংস্কার নাট্যদলের ‘ভুলস্বর্গ’ ও ‘মহাপতঙ্গ’, নাট্যম রেপার্টরির ‘ডিয়ার লায়ার’, ঢাকা পদাতিকের ‘ট্রায়াল অব সূর্য সেন’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগের ‘ম্যাকবেথ’, নাট্যধারার ‘চার্লি’, ঢাকা থিয়েটার মঞ্চের ‘বহিপীর’, নটনন্দনের ‘নারী ও রাক্ষুসী’, বরিশালের শব্দাবলির ‘বৈশাখিনী’ প্রভৃতি।/
‘গ্যালিলিও’বছরের আলোচিত নাটকগুলো নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন নাট্যজন আতাউর রহমান। তার ভাষ্যে, ‘‘নাটচক্রের ‘একা এক নারী’র কথাটা আমি আলাদাভাবে বলতে চাই। এক বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে তালাবদ্ধ নিঃসঙ্গ এক নারীর সংলাপের মাধ্যমে এগিয়ে যায় নাটকের গল্প। অনেক দিন পর এমন একটি একক নাটক এলো। আমি বলবো ফেরদৌসী মজুমদারের ‘কোকিলারা’র পর এমন একক নাটক হলো। আর এটাও তনিমা হামিদের প্রথম একক। অসাধারণ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রসপুরাণ’ নাটকটিও চমৎকার। নাটমণ্ডলে হয়েছিল। সুইডেনে ঘুরে এলো থিয়েটার আর্ট ইউনিটের 'সুতায় সুতায় হ্যানা ও শাপলা'। রোকেয়া রফিক বেবী'র এ নাটকটিও মন্দ না। পৃথিবীর সব মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা একই জায়গায়। নতুন নাটকের মধ্যে আমার ও অপি করিমের করা 'ডিয়ার লায়ার'টাও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।’’
`ডিয়ার লায়ার’নতুন প্রজন্মের নির্মাণ ও দর্শক প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান এ নির্দেশক বলেন, ‘‘শহরে নাটক প্রদর্শনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ হয়েছে। যেমন, জ্যামটা বড় সমস্যা। কেউ-ই এখন ৬টার নাটক সময় মতো করতে পারে না। সবাই-ই সাড়ে ছয়টায় করেন। আবার নতুন প্রজন্ম নাটক দেখছে। আমাদের ‘হেমলেট’ নাটকটিতে ৮৫ থেকে ১ লাখ প্লাস টাকার টিকিট বিক্রি হয়। এমন বেশ কিছু প্রযোজনা আছে যেগুলো দর্শক দেখছে। এর মধ্যে সৈয়দ জামিল আহমেদ ‘রিজওয়ান’ বা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ নাটকগুলো করলেন। উনি তো টানা ১০-১১ দিন প্রদর্শন করেন। টিকিটের মূল্যও বেশ চওড়া। তবে তার ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ভালো লাগেনি আমার। তথ্যচ্যুতি আছে।’’
সৈয়দ জামিল আহমেদ২০১৭ সালে মঞ্চে আসে সৈয়দ জামিল আহমেদের ‘রিজওয়ান’। সে বছরের শিল্পাঙ্গনের প্রধানতম আলোচিত সৃষ্টি হিসেবে এর নাম আসতে থাকে। টানা পাঁচদিন চলে এ নাটকের তিনটি করে প্রদর্শনী। যা তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলে। এরপর ২০১৮ সালে এই বরেণ্য নির্দেশক আনেন ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। এটিও আলোচিত হয়। টানা ৭ দিন চলে এর প্রদর্শনী।
মঞ্চনাটকে দিনে তিনটি করে টানা প্রদর্শনী সাধারণত হয় না। এমন আয়োজন করার কারণ হিসেবে সৈয়দ জামিল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারণটা পরিষ্কার। ঢাকা শহরে সব চলে অর্থনীতির ওপর। আপনি প্রথম মঞ্চায়নের পরে আবার যখন রিহার্সেলের জন্য ডাকবেন, শিল্পীরা নির্ঘাতভাবে আসবেন না। কোনও কারণে দেরি করবে বা মিস করবে। মানুষ যেভাবে ছুটছে- তাই সময় বের করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। সময় মতো পৌঁছাতে পারে না। এতে নাটকের গুণগত দিক ক্ষতি হয়। শতভাগ কাজ পাওয়া যায় না। না পাওয়া গেলে নতুন করে আবার শুরু করতে হয়। রিহার্সেল করে এটাকে নিয়ে খেলতে হয়, যেন নষ্ট না হয়। এ জন্যই টানা শো করা। আর একটা উদ্দেশ্য ছিল, অভিনেতারা যেন নাটকটা আরও বুঝতে পারেন। প্রফেশনালি টানা করলে ধারাবাহিক উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’
এই নাট্যব্যক্তিত্ব ও শিক্ষকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তার দেখা অন্যদের নির্দেশিত নাটকগুলো নিয়েও।
‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’তিনি বলেন, ‘‘রেজা আরিফের ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ নাটকটি ভালো লেগেছে। আরশিনগরের প্রযোজনা ছিল এটা। এই প্রযোজনাটা মনে হয়েছে কার্যকর। ভালো-মন্দর হিসাবটা অন্য। তারা এর আগেও একটি কাজ করেছিল। এটা নতুন কথা বলে এবং এটাকে বলবো নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে অর্থপূর্ণ। মানে কাজটি নাড়া দেয়। ভালো বা খারাপের বিষয়টি এমন হতে পারে, ধরুন পাকিস্তানে একটি নাটক হয়েছে যেখানে বাংলাদেশ নিয়ে বিদ্বেষ রয়েছে। এটি আমার খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু অভিনয় ও নাট্যশৈলী দুর্দান্ত হলে সরাসরি খারাপ বলার সুযোগ থাকে না। আমরা এ জায়গাটা নিয়ে কথা বলছি। ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ অভিনয়ে দুর্বল ছিল কিন্তু নতুন কথা বলেছে।’’

নিজের পছন্দের নাটক প্রসঙ্গে সৈয়দ জামিল আহমেদ আরও বলেন, ‘‘ইসরাফিল শাহীনের ‘পাঁজরে চন্দ্রবান’, এখানে কয়েকটি দৃশ্যে নতুন একটা ভাষা তৈরি করেছিল। অভারঅল এটার কয়েকটি দৃশ্য কাজ করে ঠিকই কিন্তু অন্যান্য দৃশ্য দুর্বল হয়ে যায়। এরপর বলবো, ‘দ্য টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান’-এর কথা। এটার চরিত্রায়ন, যেটা আমাদের দেশে খুব কম হয়। আলাদা আলাদা করে তুলে ধরা। একদম সাদা আলোর ভেতরে.. চারিত্রিক নির্দিষ্টতা তৈরি হয়েছে এতে। এটা খুব কার্যকর মনে হয়েছে আমার কাছে। এরপর ‘ক্র্যাচের কার্নেল’, এটা প্রযোজনার জন্য বলছি না। এই নাটকটিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য রয়েছে।’’



এদিকে নিজের দেখা খারাপ নাটকের মধ্যে সৈয়দ জামিল আহমেদ তুলে এনেছেন আলোচিত ও জনপ্রিয় প্রযোজনা ‘কঞ্জুস’কে। তার ভাষ্যে, ‘‘লিয়াকত আলী লাকী, লোক নাট্যদলের ‘কঞ্জুস’। যদিও এটা ৬শর বেশি মঞ্চায়ন হয়েছে। আমি বলবো এটা মলিয়েরের না। এটাকে স্থূল আর ভাঁড়ামো পর্যায়ে নিয়ে গেছে তারা।’’

‘ক্র্যাচের কর্নেল’-এর কথা বলবো। এর প্রযোজনার বিষয়ে আমি একমত নই। রাজনৈতিক বা নির্মাণ কাঠামো আমার ভালো লাগেনি। যেটা লেগেছে তা হলো তারা কর্নেল তাহেরকে মঞ্চে এনেছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ নাটক- কারণ কর্নেল তাহেরকে মঞ্চে এনেছে।’’
‘ক্র্যাচের কর্নেল’ নাটকটি বেশ আলোচিত হয়। এটি নিয়মিতভাবে মঞ্চায়ন করে গেছে বটতলা। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের লেখা উপন্যাস ‘ক্র্যাচের কর্নেল’ থেকেই এটি মঞ্চে আসে। প্রথমে ৩ ঘণ্টার প্রযোজনা হলেও পরে তা কমিয়ে ২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়।
‘ক্রাচের কর্নেল’নাটকটির জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে এর অন্যতম শিল্পী কাজী রোকসানা রুমা বলেন, ‘৭৫ পরবর্তী সময়ের গল্প। যেটা অনেকগুলো বছর আমাদের সামনে প্রকাশিত ছিল না। এ কাজটি করার আগে আমার নিজেরও সেই সময়টা নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। আমাদের প্রজন্ম বা ৭১ পরবর্তী প্রজন্ম আস্তে আস্তে কিছুটা জানতে পারে। নাটকটিতে আমরা একজন কর্নেলের ছেলেবেলা, পরবর্তী সময়ে ক্রাচের কর্নেল হয়ে ওঠার গল্পটা বলেছি। আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা জাতীয় চার নেতাকেও সেভাবে রাখতে পারিনি। কারণ, আমরা কর্নেলকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছি। আর নিজেদের অজানা গল্পের কারণেই এটি এতটা সমাদৃত হয়েছে বলে আমার মনে হয়।’
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে মঞ্চের নারীরা বেশ সক্রিয় হয়েছেন। গত বছর সারা যাকেরের ‘ওপেন কাপল’, শিমুল ইউসূফ করেছেন সেলিম আল দীনের ‘পুত্র’, নায়লা আজাদ নূপুরের ‘অ্যান ইনস্পেক্টর কলস’, আইরিন পারভীন লোপার ‘ডিয়ার লায়ার’ নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি লিজা আসমা আক্তার ও আফরিন হুদা তোড়ারও অভিষেক ঘটে।
‘ওপেন কাপল’শুধু দেশেই নয়, দেশের মঞ্চনাটক বিদেশেও ভালো সমাদর পেয়েছে। মেঠোপথ থিয়েটার ‘অতঃপর মাধো’ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল ডুও পারফর্মিং আর্টস ফেস্টিভ্যালে (১৮তম কিডপাফ) স্পেশাল পারফরম্যান্স বুক অব অনারে সম্মানিত হয়েছে। স্বপ্নদল ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ নাটক নিয়ে জাপানে প্রদর্শনী করেছে। নাগরিক এবং নটনন্দন যথাক্রমে ‘ওপেন কাপল’ এবং ‘নারী ও রাক্ষুসী’ নাটক নিয়ে যুক্তরাজ্যের নাট্যোৎসবে অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছে। সুইডেনে গিয়েছে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘সুতায় সুতায় হ্যানা ও শাপলা’।
সব মিলিয়ে বছরজুড়ে বিরতিহীনভাবে চলছে মঞ্চনাটকের কার্যক্রম। অনেকটা নীরবেই বের হয়ে আসছে মঞ্চনাটকের নতুন দর্শক প্রজন্ম ও শিল্পীরা।‘পুত্র’

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ