বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটিতে চম্পার রিকশা গ্যারেজ!

Send
মাহমুদ মানজুর
প্রকাশিত : ০০:০৩, জুন ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, জুন ২৮, ২০১৯

নিজের গ্যারেজে রিক্সায় বসে আছেন চম্পাগাজীপুরের কবিরপুর এলাকার ১০৫ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটি। সেখানে ঢুকেই চোখে পড়ে সুরম্য বিল্ডিং, ছোট ছোট কটেজ, লেকের পাশে শানবাঁধানো ঘাট, ফুলের বাগান, বিস্তৃত সবুজ মাঠ। সবই দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু কিছু দূর এগোলেই চোখ আটকে যাবে এসবের পাশে গড়ে ওঠা বস্তিতে। যে বস্তিকে ঘিরে রয়েছে কিছু দোকানপাট, রিকশা গ্যারেজ, এখানে-ওখানে এঁটে রাখা সিনেমার পোস্টার।

তবে বস্তির কাছে গিয়ে এটুকু স্পষ্ট, এখানকার মূল কেন্দ্র একটি রিকশা গ্যারেজ। এটি পরিচালনা করেন চম্পা। মানে চিত্রনায়িকা চম্পা!
আশির দশকের পর্দা চমকানো গুলশান আরা আক্তার চম্পা এখন আর চলচ্চিত্রে সচরাচর দেখা দেন না। তাই বলে এটাও ভাবা ঠিক হবে না, বাঁচার তাগিদে চম্পা সত্যি সত্যিই রিকশা গ্যারেজ দিয়েছেন! জানা গেলো, সেখানে এখন যা ঘটছে, তার সবটুকুই চরিত্রের প্রয়োজনে।
বস্তির একটি অংশমানে লম্বা বিরতির পর আবারও এই অভিনেত্রী ফিরছেন বড় পর্দায়। বেশ ভিন্ন আয়োজনে, পুরনো আবহ ভেঙে।
চম্পাকে দলে ভিড়িয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী। নাম ‌‘রিকশা গার্ল’। এর অন্যতম চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি। এতে ঢাকা শহরের একটি রিকশা গ্যারেজের মালিকের চরিত্রে দেখা যাবে তাকে! তার চরিত্রের গঠনেও রয়েছে বৈচিত্র্য।

বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) সকালে রিকশা গ্যারেজে বসে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় চম্পার। বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটিতে বিস্তর জায়গাজুড়ে অমিতাভ রেজা ও তার টিম প্রায় এক সপ্তাহ সময় নিয়ে এই শুটিং সেট তৈরি করেছেন। শুধু রিকশা গ্যারেজই নয়, গড়ে তোলা হয়েছে পুরো একটি বস্তি। ক্যামেরা-লাইটের ফ্রেমে দেখে বোঝাই দায়—এটি আসল নয়, পুরোটাই শুটিং সেট।নাইমা চরিত্রে নভেরা চৌধুরী
রিকশা গ্যারেজের পাশেই চম্পার বসবাসের ঘর। স্বামী মারা গেছেন বহু আগে। তবে ঘরের সঙ্গী হিসেবে তিনি খুঁজে পেয়েছেন নভেরা চৌধুরীকে। চলচ্চিত্রে এই নভেরাকে তার সংকটময় জীবন থেকে নতুন সড়কে তুলে দেয় চম্পার চরিত্রটি। যে সড়ক একজন চিত্রকর অথবা রিকশা পেইন্টারের।     
বস্তিতে চম্পা ও নভেরার থাকার ঘরচম্পার রিকশা গ্যারেজে বসে এসব আলাপ হয় নির্মাতা অমিতাভ রেজার সঙ্গে, শুটিংয়ের ফাঁকে। এই অভিনেত্রীকে নিয়ে কাজ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আমার এই ছবিতে চম্পা আপাই মূলত স্টার কাস্ট। উনাদের সঙ্গে কাজ করতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ, ফিল্মে উনাদের যে অভিজ্ঞতা ও অর্জন সেসব তো বলার অপেক্ষা রাখে না। উনাদের মতো শিল্পীকে আমি পাচ্ছি, এটা আনন্দের বিষয়। আরও ভালো লাগছে, এমন একজন তারকা কেমন করে আমাদের সঙ্গে মিশে গেছেন- সেটা তো দেখতেই পারছেন। উনাকে নিয়ে আমি আরও কাজ করতে চাই।’

ঠিক শেষের কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে অদূরে রিকশার আসনে বসা চম্পা হাততালি দিয়ে উঠলেন। এ বুঝি এক কিশোরীর উচ্ছ্লতা! অমিতাভ রেজাকে বলে উঠলেন, ‘আমি কিন্তু শুনে ফেলেছি! সবাই এখানে সাক্ষী। অমিতাভ ভাই আমাকে নিয়ে আরও কাজ করবেন।’অমিতাভের কথা শুনে খুশি চম্পাএরইমধ্যে একটি দৃশ্যের শুটিং শুরু হলো। চম্পার ঘরের মেঝেতে বসে আছেন ‘রিকশা গার্ল’ নভেরা। তার সামনে কিছু রিকশার পেইন্টিং। চম্পা ঘরে ঢুকে সেগুলো দেখলেন। চোখে-মুখে বিস্ময় নিয়ে বললেন, ‘এগুলো তুমি এঁকেছো!’ নভেরার স্বাভাবিক জবাব, ‘হুম, আমিই।’ অথচ চম্পা জানতেন, এই মেয়েটি গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছে জীবনের দায় মেটাতে, ছদ্মবেশে রিকশা চালানোর জন্য!    
কথা হলো চম্পার সঙ্গে। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তিনি বললেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই, অমিতাভ রেজার কাজের ভীষণ ভক্ত আমি। সবসময় আশায় থাকতাম, যদি উনার ডাক পাই। বিশ্বাস করতাম, তার সঙ্গে কাজ করলে আমার অভিনয় জীবনে অন্যমাত্রা যোগ হবে। এটা বিস্ময়কর, সেই সুযোগটা এবার পেয়ে গেছি।’
শুটিংয়ের ফাঁকে এক টেবিলে চম্পা-অমিতাভএকফাঁকে এটুকুও জানালেন, এই ছবিটি মূলত রিকশা গার্ল নাইমাকে (নভেরা চৌধুরী) ঘিরে। এতে চম্পার চরিত্র বেশ ছোট। তবে, গভীরতা আর বৈচিত্র্য অনেক।
চম্পা এবার বলে গেলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর তার রিকশা গ্যারেজের দায়িত্ব নিই আমি। আমার মধ্যে একটু পুরুষালী ভাব আছে। একটু ভিন্ন রকমের চরিত্র। একজন শিল্পী কী চায়, ডিফারেন্ট ধরনের ক্যারেক্টার। আর কিছুই না। এই চরিত্রে সেই আনন্দটা পাচ্ছি।’
কিন্তু অমিতাভ রেজাদের নির্মাণ ভাবনা ও ভঙ্গি তো খানিক আলাদা। মানে, ট্র্যাডিশনাল ফিল্মমেকারদের মতো নয়। যাদের সঙ্গে আপনি দীর্ঘ অভিনয় জীবনে পরিচিত। সে হিসেবে এই ইউনিটে নিজেকে খাপ খাওয়াতে বেগ পেতে হচ্ছে না? জবাবে চম্পার উদাহরণটা এমন, ‘চাইলে এখান থেকে রোজ সকাল-বিকাল ঢাকায় নিজের বাসায় যেতে পারি। এখানে অনেক গরম। অনেক কষ্ট। কিন্তু যাচ্ছি না। তিন দিন ধরে আছি। থাকছি আরও দুই দিন। কারণ, এখান থেকে যেতে মন চাইছে না। শুটিংয়ে ক্লান্তি আসছে না। এবার বুঝুন আমার আনন্দটা।’
আরেকটু ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, ‘আমরা সারা জীবন কাজ করেছি একভাবে। ডিরেক্টরের সঙ্গে গল্প নিয়ে একটু কথা বললাম। লাইনআপটা শুনলাম। শুটিংয়ে গেলাম। পেছন থেকে একজন প্রম্পট (সংলাপ বলে দেওয়া) করলো। আমরা সেটা শুনে শুনে ক্যামেরার সামনে সংলাপ বললাম। বাসায় ফিরে গেলাম। ব্যস। আর এখানে চিত্রনাট্যের প্রতিটি লাইন নিয়ে গবেষণা চলছে প্রথম থেকে আজও। কোন সংলাপে আমার গলার স্বর একটু উঁচু হবে, কোনটাতে নিচু হবে- সেই ড্রাফট আমাকে কাগজে এঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে, এই চরিত্রকে ভালোবেসে ফেলেছি। তাকে এই বস্তিতে ফেলে নিজের বাসায় ফেরা যায় না! অমিতাভ ভাইদের পার্থক্য এখানেই। শুটিং অভিজ্ঞতার নতুন দুনিয়া দেখছি এখন।’

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখিকা মিতালি পারকিনসের ‘রিকশা গার্ল’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি তৈরি হচ্ছে। শুটিং হয়ে গেছে প্রায় ৮০ ভাগ। এর একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করছেন ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান। তবে তার শিডিউল এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
ছবিটিতে আরও অভিনয় করছেন মোমেনা চৌধুরী, নরেশ ভূঁইয়া, নাসির উদ্দিন খান, অ্যালেন শুভ্র, রূপকথা, অশোক বেপারী প্রমুখ।
বলছেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী‘রিকশা গার্ল’ প্রসঙ্গে অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সবসময়ই মানসম্পন্ন সিনেমা নির্মাণের চেষ্টা করি। এখন বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। আমরা এমন সব সিনেমা বানাতে চাই যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে। বাংলাদেশে সাধারণত আমরা দেখি বস্তির শুটিংয়ের প্রয়োজন হলে সবাই বস্তির দিকে ছুটে যায়। কিন্তু গল্পের প্রয়োজনে আমরা শতাধিক বস্তিঘর নির্মাণ করে নিজেরা বস্তির অবয়ব দিয়ে সেট বানিয়েছি। এছাড়া আমরা বাংলাদেশের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিনেমার শুটিং করেছি। আশা করছি খুব বেশি খারাপ কিছু হবে না।’
নির্মাতা জানান, ছবিটি মুক্তির জন্য প্রস্তুত করতে চলতি বছরের পুরোটা সময়ই লাগবে।নভেরা তথা নাইমার আঁকা ছবি

/এমএম/জেএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ