শনিবার বিকেল: সেন্সরে নেই অগ্রগতি, প্রদর্শনে ক্ষুব্ধ বোর্ড

Send
ওয়ালিউল বিশ্বাস
প্রকাশিত : ১৮:২১, জুলাই ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, জুলাই ০২, ২০১৯

শনিবার বিকেল-এ জাহিদ হাসান, তিশা ও পরমব্রত২০১৬ সালের এই দিনে (১ জুলাই) ঢাকার গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বিদেশিসহ ১৭ জন মারা যান। এরপর বিদেশি এক সংবাদমাধ্যম জানায়, এই ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে ‘শনিবার বিকেল’ নামের চলচ্চিত্র। যার পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। গত ৯ জানুয়ারি খবর আসে সেন্সর পাচ্ছে ‘শনিবার বিকেল’। মুঠোফোনে সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা ইতিবাচক খবর দেন। এর এক সপ্তাহ পর  ১৬ জানুয়ারি একেবারেই বিপরীত ঘোষণা দেওয়া হয়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে জানা যায়, ছাড়পত্র নয়, ছবিটি ব্যান করা হয়েছে! অভিযোগ ওঠে, এতে ২০১৬ সালে ঢাকার হলি আর্টিজানে ঘটা নির্মম সন্ত্রাসী হামলার ছায়া আছে। ছবিটিকে ঘিরে এরপর আপিল ও প্রদর্শনীসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চলেছে; আসেনি চূড়ান্ত কোনও ফল। আপিলের পর অনেকটা সময় গড়িয়েছে। হলি আর্টিজানের সেই ভয়াবহ ঘটনার দিনে (১ জুলাই) অনুসন্ধান করা হয়েছিল ছবিটির বর্তমান অবস্থা। তারই সবিস্তার থাকল নিচে-

২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ‘শনিবার বিকেল’ ছবির মহড়া শুরু হয়। আর শুটিং হয় ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে, ঢাকার কোক স্টুডিওতে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নতুন এ ছবিতে কাজ করেছেন ফিলিস্তিনের অভিনেতা ইয়াদ হুরানি। সঙ্গে আছেন স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। এতে একেবারে ভিন্ন গেটআপে রয়েছেন অভিনেতা জাহিদ হাসান। থাকছেন নন্দিত নাট্যজন মামুনুর রশীদ, কলকাতার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও। ছবিটি বাংলাদেশ থেকে প্রযোজনা করছে জাজ মাল্টিমিডিয়া ও ছবিয়াল, আরও আছেন ভারতের শ্যাম সুন্দর দে।

এটি কি আদতেই হলি আর্টিজান অবলম্বনে নির্মিত:

এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে মুখ খুলতে নারাজ পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ সেন্সর বোর্ডের প্রায় সব সদস্যই। জানুয়ারি মাসে সেন্সর বোর্ডে প্রদর্শিত ‘শনিবার বিকেল’ ছবি প্রসঙ্গে সে সময়ে বোর্ডের জ্যেষ্ঠ সদস্য মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেছিলেন, ‘ছবিটিতে সেই হামলার ইঙ্গিত আছে।’

১ জুলাই দুপুরে কথা হয় সেই বোর্ডের অপর সদস্য ইফতেখার উদ্দিন নওশাদের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ‘দেশবিরুদ্ধ কোনও কিছু থাকলে বা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, এমন কিছু প্রচার (তৈরি) করা কারও উচিত নয়।’
বোর্ড সদস্যরা সরাসরি না বললেও আপিল বিভাগের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছবিতে বেশ কিছু দৃশ্য ও ঘটনা হলি আর্টিজানের সঙ্গে মিলে যায়!

হামলার বা ছবির নাম আলাদা হলেও ঘটনা প্রায় একই দেখানো হয়েছে। যেমন এতে আছে, একটি হোটেলে যুবকদের ঢুকে পড়া, সেখানকার গ্রাহকদের জিম্মি করা ও শেষ পর্যন্ত বিদেশিদের হত্যা করা। এসব বিষয় হলি আর্টিজানের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

কী ভাবছেন সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা:

‘শনিবার বিকেল’ সেন্সরে প্রদর্শিত হয় গত জানুয়ারি মাসে। এর এক মাস পরে নতুন সেন্সর বোর্ড গঠন করা হয়। যেখানে যুক্ত হয়েছেন অভিনেতা ড্যানি সিডাক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যুক্ত হওয়ার পর ছবিটি নিয়ে কোনও প্রদর্শনী হয়নি। তাই এটি নিয়ে বলাটা মুশকিল।’

এদিকে বর্তমান সেন্সর বোর্ডের অপর জ্যেষ্ঠ সদস্য খোরশেদুল আলম খসরু বলেন, ‘এটা সেন্সর বোর্ড সদস্যরা আর দেখভাল করছেন না। ছবিটি এখন আপিল বিভাগে আছে। এটির জন্য বিশেষ কমিটি আছে। তারাই বিষয়টির সিদ্ধান্ত দেবেন।’


যারা ছবিটি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন:

আপিল কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন কেবিনেট সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। এর আহ্বায়ক হিসেবে আছেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেক। জানা যায়, ছবিটি নিয়ে সাম্প্রতিক কোনও অগ্রগতি হয়নি। সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নিজামুল কবীর বললেন, ‘ছবিটি যখন ব্যান করা হয় তখন তাদের (নির্মাতাদের) আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। তারা ছবিটি নিয়ে আপিল করেন। এরপর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী লিখিত আকারে ছবিটির পক্ষে একজন প্রতিনিধি পাঠান। ছবিটি আবার দেখে আপিল বোর্ড। আমরা প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করি। সরকারের পক্ষ থেকে ছবির কিছু কিছু বিষয়ে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। যদি এগুলো হয়, তবে সেন্সর সম্ভব। কিংবা তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও আলোচনা করতে পারেন।’
জানা যায়, দেশের একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ‘শনিবার বিকেল’ ছবির পক্ষে আলোচনায় বসেছিলেন। তিনি সরকারসহ সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য।মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

বিদেশে প্রদর্শনে ক্ষুব্ধ বোর্ড:

এদিকে গত ১৮ থেকে ২৫ এপ্রিল রাশিয়ার মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শনিবার বিকেল’-এর প্রদর্শনী হয়। গত ২৭ জুন এটি জার্মানির মিউনিখ চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছে। 

সেন্সর না পেলেও দেশের বাইরে এমন প্রদর্শনী নিয়ে সেন্সরের আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট দু-একজন ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে। তথ্য সচিব ও আপিল বোর্ডের আহ্বায়ক আবদুল মালেকও এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে একটি আলোচনার মধ্যে এ প্রসঙ্গটি এলে তিনি নাখোশ মন্তব্য করেন।

তবে সেন্সর বোর্ডের একাধিক সদস্য ও বোর্ড কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দেশে প্রদর্শনীর জন্য সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। তবে বিদেশে প্রদর্শনের জন্য এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই।

ছবি মুক্তিতে বাধা যে কারণগুলো:

সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নিজামুল কবীর বলেন, ‘ছবিটি নিয়ে সবারই কনসার্ন ছিল, এটি যদি বাংলাদেশে প্রদর্শন করি তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব কী হতে পারে? যদি হলি আর্টিজানের ছায়ায় এটি করা হয়ে থাকে তাহলে আরও গুরুত্বসহকারে এগুলো ভাবা উচিত।’

ছবিটি নিয়ে সেন্সর বোর্ড ও আপিল বোর্ড যে বিষয়গুলো প্রধান্য দিয়েছেন তার মধ্যে আছে—
# ছবিতে বিদেশিদের হত্যা করার বিষয়টি আছে,  যা ব্যবসায়িকভাবে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে কিনা!

# ছবি মুক্তি পেলে নতুন করে হলি আর্টিজান প্রসঙ্গটি জাগিয়ে তুলবে কিনা!
# জঙ্গিবাদ উৎসাহিত হবে কিনা!
# ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে কিনা!

এই বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন এই কর্মকর্তারা।
এদিকে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ছবিটির মুক্তি বা সংশোধন দেওয়া অংশ নির্মাণ নিয়ে কোনও আলোচনা কোনও পক্ষই করেনি। আবার ছবিটি নিয়ে আপাতত কোনও মন্তব্য জানাতে রাজি হননি এর বিশেষ প্রতিনিধি সেই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাই অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যেই থাকছে ছবিটির ভবিষ্যৎ।শনিবার বিকেল-এর একটি দৃশ্যে তিশা ও মামুনুর রশীদ
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, ১ ভারতীয় ও ২ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন। রাতভর সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলার পরদিন (শনিবার) সকালে সেনাবাহিনীর 'অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে ঘটনার সমাপ্তি ঘটে। পরে সেখান থেকে পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ সাইফুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়। আর সাইফুলের সহকারী জাকির হোসেন শাওন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

ধারণা করা হচ্ছে, এমন নির্মম ঘটনার মানবিক কিছু দিক উঠে আসবে ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’-এ। যদিও বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত খুব বেশি স্পষ্ট করেননি ‘ডুব’ খ্যাত এই নির্মাতা।
প্রসঙ্গত, ‘ডুব’ ছবিটি নিয়েও অনেকটা এমন সেন্সর জটিলতায় পড়েন নির্মাতা ফারুকী। কারণও একই, অনুমোদনহীন বিতর্কিত গল্প।

/এম/এমওএফ/

লাইভ

টপ