‘আমরা স্মৃতি হয়ে যাইনি, ও ছবি হয়ে গেছে এটুকুই পার্থক্য’

Send
সাজিয়া সুলতানা পুতুল, সংগীতশিল্পী
প্রকাশিত : ১৪:২৫, জুলাই ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, জুলাই ২৯, ২০১৯

আবিদের সঙ্গে পুতুল‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন জেগে ওঠে...’ ক্লোজআপ ওয়ান সংগীত প্রতিযোগিতায় কবিগুরুর এ গানটি গেয়ে ২০০৫ সালে অনেকটা হঠাৎ করেই আলোচনায় আসেন খুলনার ছেলে আবিদ শাহরিয়ার। এরপর গান, উপস্থাপনায় নানা ভঙ্গিমায় এসেছেন তিনি। আবার হঠাৎ করেই অকালে হারিয়ে যান এই শিল্পী। ২০১১ সালের ২৯ জুলাই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে মারা যান তিনি। অবেলায় আবিদের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি সংগীতাঙ্গন। তার স্মৃতিতে এখনও কাঁদেন শিল্পী ও ভক্তরা। আজ আবিদের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন সংগীতশিল্পী সাজিয়া সুলতানা পুতুল। গান ছাড়াও তারা বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে কাজ করেছেন। নিচে থাকছে পুতুলের লেখা আবিদের মৃত্যুদিনের স্মৃতিচারণ—


২৯ জুলাই ২০১১, সন্ধ্যা ধেয়ে যাচ্ছে রাতের দিকে। রাতে 'কলের গান' (দেশটিভির সরাসরি অনুষ্ঠান) উপস্থাপনায় যাবো; তাই সাজছি। হাতে ধরা কাজল পেন্সিল, এক চোখে কাজল পরেছি, অন্য চোখটা বাকি তখনও। একটা ফোন এলো—
‘পুতুল, আবিদের খবর কিছু জানো?’
‘না তো, কেন?’
‘ও তো কক্সবাজারে ডুবে গেছে।’
‘কী বলেন না বলেন! ও কক্সবাজার গেলো কবে?’
‘একটা ফোন করে দেখো তো ওকে’
‘এখনি দেখছি, দেখে জানাচ্ছি। ধুর, এ রকম একটা আজগুবি খবর কে দিলো আপনাকে?’
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলাম। কই, আবিদের ফোন তো বেজে যাচ্ছে! ডুবে যাওয়া মানুষের ফোন বাজে নাকি? হাসলাম মনে মনে। আমার কান তৈরি করে রেখেছি। এখনই সে তার স্বভাবসুলভ দুষ্টু কণ্ঠে ফোনটা তুলে বলবে, ‘সুলতানা, কী খবর?’ দুবার ফোনটা বেজে চললো, দ্বিতীয়বার কিন্তু আমি একটু এলোমেলো। তুললো না এবারও। একটু থামলাম, কী যেন ভাবলাম। তৃতীয়বার কেন যেন ভয় লাগলো। একটাবার বাজতেই ওপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো সংযোগ।
মনে মনে ঝগড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফোন না ধরার বাতিক আছে তার। নাছোড় হয়ে গেলাম আবার, আবার কল। এবার কল হতে না হতেই কেটে গেলো। বুকের ভেতর ক্যাচ করে উঠলো। হাত পা অসাড় লাগছিলো। টিভির ঘর পর্যন্ত কী করে যাবো আমি! আমার ঘরটা এতো বড় কেন? এটা কত বর্গফুটের বাসা? আমি এরকম প্রান্তরের মতো একটা ঘরে থাকি আগে তো কখনও বুঝিনি!
টিভি চালু করবো। কিন্তু কোথায় কী খুঁজবো? টিভিতে কী দেখাচ্ছে? রিমোট কী করে চালায় এক মুহূর্তে মনে হলো তা-ও ভুলে গেছি। এলোমেলো হাতে একটা দুটো চ্যানেলে ঘুরলাম, না তো সব তো ঠিকই আছে! একটা চ্যানেলে খবরের ফাঁকে দুটো মৃতদেহের ছবি ভেসে এলো। এরা আবিদ হবে কেন? এরা কি আবিদ হওয়ার কথা ছিল? মৃতদেহদের মুখের ছবি দেখাচ্ছে তখন, আবিদের আধবোজা চোখ দেখেও আমার চোখের ধাঁধা মনে হচ্ছিলো। দেখি, গলায় ঝুলছে এমন একটা লকেট, যা অবিকল আবিদের পরে থাকা লকেটটার মতো। সব শেষ! তারকা আবিদ অখ্যাত একটা হাসপাতালে কাঠখোট্টা একটা তক্তার ওপর পড়ে আছে।
‘কলের গান’-এর গাড়ি বাসার নিচে দাঁড়িয়ে। বললাম, ‘পারবো না, আমি মানুষ। আমি আবিদের বন্ধু।’ লাভ হয়নি। সে রাতে বুঝেছিলাম দায়িত্বের কাছে আবেগ হেরে যায়। ওই এক চোখে কাজল নিয়েই কাঁদতে কাঁদতে পুরো অনুষ্ঠান সফলভাবে উপস্থাপনা করে দিয়ে এসেছিলাম। আবিদ হয়তো হেসেছে মনে মনে। হয়তো বলেছে, ‘সুলতানা আজকেও...? এতো টাকা কই রাখবি রে?’
বাড়ি ফিরলাম মধ্যরাতে। রাতটা দীর্ঘ খুব। ভোরে আবিদের সাথে দেখা হবে। ওর সাথে দেখা করতে এতো উতলা আগে কখনো হইনি তো! দেখা হলো সকালে। প্রথমে ধানমন্ডিতে, এরপর শহীদ মিনার, শেষে এনটিভি, আমাদের কাজের জায়গা। জায়গাগুলোতে একসঙ্গে কতবার গিয়েছি! সেদিনও গিয়েছি। শুধু প্রাণহীন আবিদকে সঙ্গে নিয়ে, এটুকুই পার্থক্য। একটা নিশ্বাসের পার্থক্য। সেদিন হেঁটে যেতে পারেনি, গিয়েছে অন্যের কাঁধে চড়ে, এটুকুই পার্থক্য। সেদিন সবার হাসির কারণ না হয়ে কান্নার উপলক্ষ হয়েছিলো, এটুকুই পার্থক্য। আমরা মাটির ওপরে আছি, আর ও মাটির নিচে এটুকুই পার্থক্য। আমরা স্মৃতি হয়ে যাইনি, ও ছবি হয়ে গেছে এটুকুই পার্থক্য। আমরা ওকে ভুলে গিয়েছি, ও আমাদের মনে রেখেছে এটুকুই পার্থক্য।

 

/এম/এমওএফ/

লাইভ

টপ