সালমান শাহ: গল্পটা সংক্ষিপ্ত, অসমাপ্ত ও অমীমাংসিত

Send
সৈয়দা আখতার জাহান
প্রকাশিত : ১৪:১৬, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৩, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯

সালমান শাহ

২২ বছর বয়সে রুপালি জগতে পদার্পণ করা সালমান শাহের যবনিকা পর্বের আজ (৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯) ২২ বছর অতিক্রম করলো। একজন কমন-ম্যানের রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠার গল্প এটি। গল্পটা সংক্ষিপ্ত, অসমাপ্ত ও অমীমাংসিত।
শোবিজে কাজ করার ইচ্ছেটা অনেক দিনের হলেও সুযোগ হচ্ছিল না তার। বড় পর্দায় কাজ করার অভিজ্ঞতাটা হয় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মধ্য দিয়ে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। প্রথম ছবির সূত্র ধরেই তিনি ঢালিউডের প্রথম শ্রেণির নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। এরপর ক্রমশ অপ্রতিদ্বন্দ্বী! শুটিংয়ে যাওয়ার সময় সালমান শাহের সঙ্গে ব্যক্তিগত একটি ব্রিফকেস থাকতো সবসময়। যার ওপরে লেখা থাকতো ‘সালমান, দ্যা শ্যাডো অব ইমন’। তাতে থাকতো শিডিউলের সব কাগজপত্র ও ডায়েরি। মানুষ ও নায়ক, সালমান শাহের দ্বৈত সত্তা। তার জন্ম, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা, সামিরার সঙ্গে প্রেম-বিয়ে, শাবনূরের সঙ্গে সম্পর্ক রহস্য, তারকা খ্যাতি, অতঃপর অমীমাংসিত মৃত্যু।
সালমানের মৃত্যু কোনও নায়কের মৃত্যু নয়, ব্যক্তির মৃত্যু। তাই তো নায়ক হয়েও পর্দার সালমান অম্লান হয়ে রয়ে গেছেন দর্শক-সমালোচকদের হৃদয়ে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্তত ৩টির নায়ক সালমান শাহ। যাকে ঢাকাই ছবির যুবরাজ বলতে দ্বিতীয়বার ভাবার কোনও কারণ থাকে না। জনপ্রিয় এই নায়কের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ ও ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবি তিনটি রয়েছে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের তালিকায়। নায়করাজ রাজ্জাকের পর পরিচালকরা সালমানের ওপর ভরসা করেছেন সবচেয়ে বেশি। ৯০ দশক সময়টা ছিল নতুনদের আগমনের স্বর্ণসময়। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের দুই সফল নায়ক রাজ্জাক ও জাফর ইকবালের ঠিক উত্তরসূরী তিনি (সালমান) নন।
সালমান শাহের অভিনয়ের মধ্যে ছিল নিজস্ব ধারা। মাত্র তিন বছরের অভিনয় জীবনে কাজ করেছেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। সদ্য রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটা সালমান পর্দা থেকে বেরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন কোটি তরুণের স্বপ্নের নায়ক। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে করেছিলেন সিনেমা হলমুখী।
ফ্যাশন সচেতন হিসেবে সালমানের সুনাম ছিল বরাবর। গতানুগতিক পোশাক আর পরচুলা পরা চলচ্চিত্র অভিনেতাদের পাশে চরিত্রানুগ গেটআপের সালমানকে দর্শকপ্রিয়তা এনে দেয় তার সাবলীল প্রাণবন্ত অভিনয়। ফ্যাশন বিষয়টা অনেকখানি অনুশীলনের ব্যাপার। যেটা শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন তিনি। অর্থহীন চিত্রনাট্য, বাজে মেকিং মধ্যবিত্ত দর্শকদের যখন হলবিমুখ করে তোলে ঠিক সেই সময়টাতেই সালমানকে তৈরি করেছে আমাদের কনজিউমার প্রণোদিত সোসাইটি। পুঁজিবাদের চক্রবূহ্যে ঢুকে পড়েন সালমান। এটাই বোধহয় সালমানের সাফল্যের ট্র্যাজেডি!
মডেলিং থেকে বড় পর্দার জার্নিটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সালমানের ছবি যদি কেউ ধারাবাহিকভাবে দেখেন তবে একটা বিষয় লক্ষ করবেন, তার অভিনয়শৈলীতে অগ্রজদের অনুকরণ ছিল না। তিনি দর্শকের চাহিদার স্তরকে মেনেই নিজস্ব স্টাইল চালু করেছিলেন। একই সঙ্গে বাস্তবের সাধারণ মানুষ এবং কল্পনার আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণে আনন্দদান করেছেন তিনি। সীমারেখা ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন অভিনয়ের মাধ্যমে। সালমান এক সামাজিক চরিত্র। কারোর প্রেমিক, কারোর ভাই, কারোর ছেলে আবার কারোর বন্ধু হয়ে উঠে এসেছেন পর্দায়। সালমানের চরিত্র চিত্রণের মধ্যে দর্শকের আইডেন্টিফিকেশন হয়।
সালমানের দ্যুতির কাছে অনেক প্রতিষ্ঠিত নায়ক কিংবা অভিনেতাই কোথাও ম্লান হয়েছেন, কোথাও মিলিয়ে গেছেন। বাণিজ্যিক অঙ্কের হিসাবটা ব্যবসার টেবিলে হলেও জনপ্রিয়তার দেখা মেলে প্রকাশ্যে।


সালমান শাহভবিষ্যৎহীন কিছু ছবির সঙ্গে নিজের নাম জড়ানোর ইচ্ছে না থাকলেও অনেক পরিচালক কিংবা প্রযোজকের অনুরোধে কিছু কাজ করতে হয় তাকে। কেননা, তখন সালমান মানেই দর্শকপ্রিয়তায় অব্যর্থ সাফল্য। খারাপ সময় কখনোই পিছু ছাড়েনি এই তারকার। কখনো রোড এক্সিসিডেন্ট কিংবা শুটিং করতে গিয়ে আহত হয়েছেন। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘শেষ ঠিকানা’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে সালমান আহত হন। ঈর্ষা কিংবা প্রতিহিংসার বলি হয়েছেন অনেকবার। সমস্যায় পড়েছেন যেমন, সমস্যা কাটিয়ে ওঠার মনোবলও তার ছিল।

২৬ বছরের জীবন দিয়েই সালমান চিরদিন দর্শকদের কাছে তারুণ্যের জয়গানের নায়ক হয়ে রয়ে গেছেন।

তারকাদের নিয়ে দর্শকরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন। তাদের সম্পর্কে কৌতূহল মেটাতে শরণাপন্ন হন গণমাধ্যমের। সালমান শাহকে পর্দার ভেতরে এবং বাইরে, বিশেষ করে তার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিয়ে অনেক গল্প কিংবা উপকথা তৈরি হয়েছে। এবং এখন পর্যন্ত দর্শক তাকে স্মরণে রেখেছেন পজেটিভ অর্থেই। সালমানই একমাত্র বাংলাদেশি নায়ক, যাকে নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন একটি প্রতিবেদন করেছে।

১৯৯৪ সালের ১৬ নভেম্বর সংখ্যায় সাপ্তাহিক ‘পূর্ণিমা’য় প্রকাশিত হয় চমক সৃষ্টি করা আলোচিত কাভারস্টোরি ‘তেইশ বছরের সালমানকে ঘিরে বাইশ কোটি টাকার বিনিয়োগ’। দর্শকদের রুচির একটা পরিবর্তন আসছিলো এ সময়। প্রতিবাদী রোমান্টিক নায়কের ভূমিকাতেই শুধু নয়, সালমান অভিনীত চরিত্রগুলোতে বৈচিত্র্য খুঁজে পান দর্শক। তারকাদের প্রতি দর্শকদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং প্রত্যাশার পারদ ঊর্ধ্বমুখী থাকে। সালমান হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাক্ট থেকে ফ্যাক্টর। ফ্যাক্ট ছিল সালমান সুদর্শন ছিলেন। স্মার্টনেসটা ছিল। নাচ-গান-অ্যাকশনে হয়ে উঠেছিলেন পারদর্শী। কাজ করেছেন সেই সময়ের আধুনিক এবং সফল পরিচালকদের সঙ্গে। দর্শকের ধরনে ভিন্নতা থাকে বলে অভিনেতাদের গ্রহণযোগ্যতা পেতেও সময় লাগে। সুপারস্টার যেমন দর্শক তৈরি করে, দর্শকও তেমনি সুপারস্টার বানায়।

প্রস্থানের ২২ বছর পেরিয়েও সালমান দর্শকের হৃদয়ে অনস্বীকার্যভাবে উপস্থিত। অন্তত দর্শকের নিরন্তর অভাববোধের মধ্যে তিনি হৃদয়জন হয়ে রয়েছেন। এখনও টিভি পর্দায় তার অভিনীত সিনেমা প্রচার হলে দর্শক রিমোটে সহজে হাত রাখেন না। এখনও পত্রিকার মলাটে তার ছবি থাকলে পথচারী হাঁটতে হাঁটতে থেমে যান। এবং সালমানের প্রতি ৯০ দশকের দর্শকই শুধু নয়, পরবর্তী দশকের দর্শকদেরও অগাধ ভালোবাসার প্রকাশ আমরা গণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখি। সালমান শাহের জন্ম ও মৃত্যুদিনে বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক লেখালেখি থেকে বোঝা যায়, সেই ভালোবাসা এখনও অব্যাহত আছে।
এখনও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা অবলীলায় বলেন, সালমান শাহর মতো আর কেউ এলো না। বাংলা চলচ্চিত্রে বোধকরি সালমানই একমাত্র নায়ক, যার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের চেয়ে অজনপ্রিয় ছবির তালিকা করা সহজ।

সৈয়দা আখতার জাহানলেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
সালমান শাহ: প্রস্থানের ২৩ বছর

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ