মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৯ ‘আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া ও শক্তি চাই’

Send
ওয়ালিউল বিশ্বাস
প্রকাশিত : ১৯:২৭, অক্টোবর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৭, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

রাফাহ্ নানজীবা তোরসারাফাহ্ নানজীবা তোরসা। ১১ অক্টোবর মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের মুকুট মাথায় তুলেছেন। তাই লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে নভেম্বরে  লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য ৬৯তম মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় যাচ্ছেন তিনি। সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া তোরসার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারে। তবে শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছে চট্টগ্রাম। ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিযোগিতায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। বলা হয়ে থাকে, কোনও প্রতিযোগিতায় তাকে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হতে দেখা যায়নি। পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সম্মান। তোরসার আদ্যোপান্তই থাকছে এই কথোপকথনে-
বাংলা ট্রিবিউন: শুক্রবার আপনার জীবনে অন্যতম সেরা প্রাপ্তি হলো। ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৯’-এ দেশসেরা হয়েছেন। তখন হয়তো অন্যরকম এক ঘোরের মধ্যে ছিলেন। আজ (১৩ অক্টোবর) কেমন লাগছে?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: অবশ্যই এটা অন্যরকম একটা প্রাপ্তি। তবে গতকাল আর আজকের অনুভূতি বলব, এটা সেন্স অব রেসপন্সিবিলিটি। নিজেদের দেশকে কীভাবে উপস্থাপন করলে উন্নত একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারব- সেই বোধ কাজ করছে। এই অনুভূতিটাই এখন কাজ করছে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার নামটি চমৎকার, ব্যতিক্রমীও। এই নামটি কে রেখেছেন?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: নামটা আমার ফুফু ও বাবা রেখেছিলেন। রাফাহ্ নানজীবা মানে, যত ধরনের সুন্দর আছে সেগুলোর বিশেষণ।  আর তোরসা মানে ‘পৃথিবী’। আমার পুরো নামের অর্থ দাঁড়ায়, ‘সুন্দর পৃথিবী’।
বাংলা ট্রিবিউন: ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আপনার বেড়ে ওঠা। হয়তো তারই ধারাবাহিকতায় মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছেন। নিবন্ধন কোথায়ে করেছিলেন? প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: রেজিস্ট্রেশনটি মোবাইলের মাধ্যমে প্রথম করি। এরপর বিএফডিসিতে গিয়ে আরও একবার নিবন্ধন করেছিলাম। সেখানেই অডিশন দিলাম। এরপর থেকেই মূলত আমাদের একটার পর আর একটা জার্নি চলতে থাকে। গতকাল (১১ অক্টোবর) সেই জার্নিটা শেষ হলো। এবার চোখ রাখতে হচ্ছে বিশ্বসুন্দরীদের মূল আসর ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এ।  ‘মিস ওয়ার্ল্ড-এর উদ্দেশ্য থাকে সমাজ উন্নয়ন বা সেবা জাতীয়।
এটাই একমাত্র প্রতিযোগিতা যেখানে বিউটি বলতে বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, আপনার মনটাও যে সুন্দর এবং সমাজকে আপনি কীভাবে সুন্দর করবেন, এসব কিছু! এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়টি আমাকে খুব টানে। যার কারণে এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখানো।
বাংলা ট্রিবিউন: কখনও মনে হচ্ছিলো না যে বাদ পড়তে পারেন?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: বারবার মনে হচ্ছিলো। কারণ সেরা ১২-তে যারা ছিলেন তারা সবাই দারুণ। সেরা ছয় বাছাইয়ে যখন এক এক করে অনেকেই বাদ পড়ছিলেন। মনে হচ্ছিলো, এই বুঝি আমিও বাদ পড়ে গেলাম।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ছোটবেলার কথা একটু শুনতে চাই। অল্প  বয়স থেকেই আপনি মঞ্চে অভ্যস্ত। শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: আমি খুব ভাগ্যবান যে, এমন পরিবারের জন্মগ্রহণ করেছি। সত্যি বলতে, আমার বাবা ও মা দুজনই সংস্কৃতিমনা।
বাবার নাম শেখ মোর্শেদ। তিনি পেশায় চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। ২০১৮ সালে বাবা মারা গেছেন। মা শারমিন মোর্শেদ এবং একমাত্র ছোট ভাই তুরাজ। আমি চট্টগ্রামে বড় হলেও আমাদের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়াতে।
ছোটবেলা থেকেই পরিবারের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছি। যখন আমার বয়স সাড়ে তিনি তখন থেকেই আমি মঞ্চে উঠেছি।
গান, নৃত্য, আবৃত্তি, অংকন, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। এছাড়া থিয়েটার, মডেলিং, মূকাভিনয়ও করেছি। আবৃত্তি সংগঠন ‘নরেন’ এবং থিয়েটার সংগঠন ‘ফেইম’ এর সাথে যুক্ত আছি। সামাজিক সংগঠন লিও ক্লাব এবং রেডক্রিসেন্টেরও সদস্য।
দুই রানারআপের মাঝে রাফাহ্ নানজীবা তোরসাবাংলা ট্রিবিউন: সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদচারণায় অনেক সমর্থন পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। আর এ বিজয় নিশ্চয়ই তাকে অনেক আনন্দ দিত। উনার প্রসঙ্গে যদি বলতেন-
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: হ্যাঁ, আমার এই পথচলায় উনার অবদান সত্যি অন্যরকম। বাবা ২০১৪ সালে মারা যাওয়ার পর যখনই আমার মন খারাপ হতো বা ভালো কিছু পেতাম, উনার কবরে যেতাম। জিয়ারত করতাম। গতকালের প্রাপ্তি আমার জীবনের সেরা। কিন্তু এখনও বাবার কবরে যেতে পারিনি। ওটা আসলে চট্টগ্রামে। শুক্রবার তো বটেই বাবা সমসময় আমার স্মরণে থাকেন। এই যে এখন কথা বলছি, তার আগেও বাবাকে মনে পড়ছিল। তার মেয়ে বলেই হয়তো এই অর্জনগুলো করা সম্ভব হয়েছে। আর অবশ্যই আমার মায়ের কথা বলব। তিনিও অক্লান্তভাবে আমার পাশে আছেন। আমরা জন্য সবার কাছে সমর্থন চাইছি
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রসঙ্গে একটা কথা শোনা যায়, কোনও প্রতিযোগিতায় নাকি প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি। বিষয়টি কি আসলেই তাই?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: পুরোপুরি না হলেও অনেকটা তাই। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে অনেক প্রতিযোগিতায় আমি অংশ নিয়েছি চট্টগ্রামে। কখনও দ্বিতীয় হয়নি।
২০০৮ সালে ‘লিটল মিস চিটাগাং’ প্রতিযোগিতায় প্রথম হই। ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে লোকনৃত্যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় শিশু–কিশোর প্রতিযোগিতায় প্রথম হই। এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছি। ২০১০ সালে জাতীয় শিশু–কিশোর প্রতিযোগিতায় ভরতনাট্যম নৃত্যে স্বর্ণপদক পেয়েছিলাম। বিদেশে মনিপুরী নাচের জন্যও পুরস্কার পেয়েছি। ২০১০ সালে এনটিভি মার্কস অলরাউন্ডারে প্রতিযোগিতার হয়েছিলাম প্রথম রানারআপ। আমি দুবার দেশকে উপস্থাপন করেছি। এর মধ্যে একটি হলো ২০০৮ সালে দিল্লিতে আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসব। অপরটি ত্রিপুরায় মনিপুরী নৃত্য উৎসব।
বাংলা ট্রিবিউন: গত দুই বছর দুজন প্রতিযোগী ‘মিস ওয়ার্ল্ড’-এ ঘুরে এসেছেন। তারা ভালো কিছু করেছেন, তবে শিরোপাটা অধরা থেকে গেছে। এই শিরোপা পেতে আপনাকে কোন কোন জায়গায় কাজ করা উচিত বলে মনে করেন?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: ইংরেজিতে একটা শব্দ ব্যবহার করা হয়, ‘এসডাব্লিউওটি’। এর পুরো রূপ হলো- স্ট্রেংন্থ, উইকনেস অপরচুনিটি ও থ্রেট। এই চারটা বিষয় নিয়ে আমি এগুতে চাই। আমার শক্তিশালী জায়গা হলো আত্মবিশ্বাস। এটাকে কাজে লাগাতে চাই। আর আমার দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করছি। এশীয় প্রতিযোগীর কিছু দুর্বলতা থাকে, আমি চেষ্টা করব, এগুলোকে কাটিয়ে উঠে আমার স্ট্রেংন্থকে আরও শক্তিশালী করতে।
বাংলা ট্রিবিউন:  গত দুটি মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় দুটি বিষয় খুব চোখে লেগেছে। তার মধ্যে একটি হলো প্রতিযোগীকে নিয়ে পাঠানো ভিডিওচিত্রের বেহাল দশা এবং অপরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিযোগীর ভোট কম পাওয়া। মিস ওয়ার্ল্ড তাদের ফেসবুক, টুইটারসহ তাদের নিজস্ব যোগাযোগমাধ্যমে ভোট সংগ্রহ করে। এ দুটি বিষয়ে আপনারা কাজ করেছেন?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: প্রথমত আয়োজক প্রতিষ্ঠান ভিডিওর বিষয়ে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। আশা করি, প্রতিযোগী পরিচিতির আমার যে  ভিডিও সেটা ভালো হবে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও যোগাযোগ বাড়াতে প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই কাজ করা হচ্ছে। আসলে এক্ষেত্রে দেশবাসীর ভূমিকা খুব বেশি। আমি আমার দেশবাসীর কাছে দোয়া ও শক্তি চাই। তাদের সমর্থনেই হয়তো আমি লাল-সবুজকে আরও উপরে তুলে ধরতে পারব।
মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ জয়ে আমার ক্যাম্পাসও প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি আমি। যখন সবাই জানতে পারলেন যে, আমি মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে সেরা ১২ জনের একজন হয়েছি সেখানে হৈ চৈ পড়ে গেল। আমার ক্যাম্পাসের বন্ধুরা, বড় ও ছোট ভাইবোনেরা আমার জন্য ভোট চেয়েছেন। এটা আমাকে দারুণভাবে প্রেরণা দিয়েছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে। ঠিক একইভাবে দেশবাসীর কাছে আমি সেই সমর্থন চাইব।
বাংলা ট্রিবিউন: শেষ করব ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ দিয়ে। এখানে আপনার জার্নিটা কেমন ছিল? বিশেষ করে সেরা ৩৫ জনের সঙ্গে আপনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। এই জার্নিতে সবচেয়ে রোমন্থন করার মতো ঘটনা কী?
রাফাহ্ নানজীবা তোরসা: আমি বলব, এটা একটা পরিবার ছিল আমার। তাদের সবসময় মিস করব। ৩৫ জন মিলে অনেক সময় কাটিয়েছি। এরপরই তো সংখ্যাটা কমতে থাকলো। অনেক মজার মজার স্মৃতি জমে আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা অত্যন্ত ইতিবাচক মানসিকতার। এটা আমার খুব ভালো লেগেছে।
আর যারা এখানে অংশ নিয়েছেন সবাইকে অভিনন্দন জানাতে চাই আমি। কারণ সবাই অনেক গর্জিয়াস আর স্মার্ট লেডি।রাফাহ্ নানজীবা তোরসা

/এমএম/

লাইভ

টপ