আমাকে পেছনে ফেলে সে পৌঁছে গেল আসল গন্তব্যে

Send
কুমার বিশ্বজিৎ, সংগীতশিল্পী
প্রকাশিত : ১২:৩১, অক্টোবর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০১, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

কেউ আগে কেউ পরে এভাবেই হয়তো যেতে হবে। তবে এই বয়সটা তার যাওয়ার ছিল না। একটু অসময়ে চলে গেলো বাচ্চু। হয় না, মানুষের একটা সিম্পটম থাকে। বা কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি  থাকে। বয়স হয়ে যায় ৭০-এর কাছে। এর কিছুই তো ছিল না তার। হঠাৎ করে চলে যাওয়া তো ভারি একটা দুঃখ। এক বছর হয়ে গেলো, এটাই বলবো, পরপারে সে শান্তি পাক, পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা রইলো। তার স্বপ্নগুলো, সে যতটুকু পেরেছে করেছে, বাকিটা ক্যারি করতে হবে নেক্সট প্রজন্মকে। কোনও ব্যবসায় দৃষ্টিকোণ থেকে না, শ্রদ্ধাভরে মন থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রিপ্রেজেন্ট করতে হবে।

একজন শিল্পীর সৃষ্টি সর্বজনীন। এটা যে কেউ ক্যারি করতে পারে। বাচ্চুর গান এলআরবি কনটিনিউ করলেও ভালো। বা তাকে ভালোবেসে যে কেউ ক্যারি করতে পারে। বাচ্চু ওয়ানম্যান শো ছিল। সে কম্পোজার, প্লেয়ার, সিঙ্গার, লিরিসিস্ট; বাকিরা সহযোগী। সুতরাং কে কী করলো এটা আমার কাছে মূল বিষয় না। তার সৃষ্টিটাই মূল বিষয়। যে গানগুলো করেছে, সেগুলোকে ধরে রাখাই আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রতিটা সংগীতপ্রেমীর দায়িত্ব। এগুলো আমাদের সম্পদ। এটা কারোর একার নয়। এটাকে কোনোভাবেই হারাতে দেওয়া উচিত না। এটা যেভাবে হোক বহির্বিশ্বের কাছে, নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের তুলে ধরা উচিত। এখান থেকেই জানবে আমাদের পূর্বপুরুষরা কী করেছিল আমাদের জন্য।

আমি দেখলাম চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চু চত্বর হয়েছে। এটা আমার কাছে অসাধারণ ব্যাপার। এর আগে কারোর ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। স্বাভাবিকভাবে এটা সব শিল্পীর জন্যই বড় প্রাপ্তি। এ পদক্ষেপটা যারা নিয়েছেন আমি শিল্পীদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। একজন শিল্পীকে সম্মান জানিয়ে আইয়ুব বাচ্চু চত্বর করা এটা আমাদের বা পরবর্তী প্রজন্মকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত এবং গর্বিত করেছে। আমি সার্বিক অর্থেই বলবো, এই দেশে সংস্কৃতি সমৃদ্ধির পেছনে প্রচুর গুণীজনের কন্ট্রিবিউশন আছে। একটা জাতির বিচার বিবেচনা করি শুধু তার সংস্কৃতি দিয়ে। একটাই কথা, যে জাতি গুণীর সম্মান দিতে জানে না সেখানে গুণীর জন্ম হয় না।

এতদিন স্মৃতিগুলো আমাদের কাছে মধুর ছিল। দেখা হলেই একে অপরের সঙ্গে তুমুল মজা হতো এসব স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে। প্রতিবারই আমরা হয়ে উঠতাম জুবলি রোডের দুরন্ত দুই কিশোর।

বাচ্চুকে নিয়ে আমার স্মৃতির ‘ভার’ এত বেশি, সেটা এখন আর বইতে পারছি না। কারণ, এতদিন আমরা ভাগাভাগি করে স্মৃতিগুলোকে বয়ে বেড়াতাম। আর আজ থেকে সব স্মৃতি ও আমার কাছে রেখে উড়াল দিলো। এই ভার কতটা ভয়ঙ্কর, সেটা বলে প্রকাশ করা যাবে না।

‘ব্যান্ড ৭৭’ দিয়ে ও আমার সহযাত্রী। সে হিসেবে ৪১ বছরের পথচলা আমাদের। তারপর ৭৮ সালে ওকে আমি নতুন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’-এ নিয়ে আসি। ৮২ সালে আমি ওকে ফেলে ঢাকায় চলে আছি। সলো ক্যারিয়ার শুরু করি। একই বছর ও জয়েন করে ‘সোলস’-এ। এরপর সেও ঢাকায় চলে আসে। এখানে এসে আবার আমরা একসঙ্গে। একই বাসায়, একই খাটে আমাদের সহস্র রাত-দিন কাটে।

দিন-রাত আমরা একসঙ্গে প্র্যাকটিস করছি। মিউজিক নিয়ে নানা স্বপ্ন নানা পরিকল্পনা আমাদের। আসলে ঢাকা-চট্টগ্রামের এমন কোনও জায়গা নাই, অলিগলি নাই, যেখানে সুন্নতে খাতনা থেকে গায়ে হলুদের শো করিনি।

শুরু থেকেই বাচ্চুর মধ্যে যেটা প্রকট ছিল, খুব সহজে মানুষকে আপন করে নেওয়া। মিউজিক দিয়ে মানুষদের নিজের গ্রিপে নিয়ে আসা। একজন সিঙ্গারের জন্য এটা সবচেয়ে বড় গুণ। ও খুব তাড়াতাড়ি শ্রোতাদের আত্মীয় বানিয়ে ফেলতো পারফরম্যান্স দিয়ে। আমরা অনেকে মঞ্চে উঠে বলি না- কই হাততালি দেন। কিন্তু ওর বেলায় হচ্ছে অটোমেটিক। বলতে হতো না। মানুষ হাততালি দিতো তার কথায়-গানে-মিউজিকে মুগ্ধ হয়ে। মিউজিক দিয়ে মানুষকে সম্মোহন করার প্রচণ্ড পাওয়ার ছিল। মিউজিকের জন্য তার ডেডিকেশন, পরিশ্রম ও গান শোনা- সেটা আর  ক’জন মিউজিশিয়ানের ছিল এবং আছে, আমার সন্দেহ হয়। সে যে পরিমাণ দেশি-বিদেশি গান শুনতো, সেটা ভাবাই যায় না।

আমরা শুরুর দিকে মূলত ইন্সট্রুমেন্টাল বাজাতাম। আমি কিবোর্ড, বাচ্চু গিটার। তখন তার হাতটা পিওর ওয়েস্টার্ন শেখে। তার মধ্যে দুটো ভার্সনই ছিল। সে কিন্তু দেশ ও ওয়েস্টার্ন ব্ল্যান্ডিংটা করতে পারতো। এটার প্রবর্তক বাংলাদেশে কিন্তু সে-ই। আমরা কেউ না। এই ফিউশনটাকে তখন বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য করা- এটা কিন্তু যেনতেন ব্যাপার না। এটা খুবই কষ্টের। আমরা যে ইমোশনের জাতি, সেখানে এসব কাজ করা খুবই রিস্কি। সেই রিস্ক সে একাই পার করে দিয়েছে চোখের সামনে। এই কথাগুলো আমাদের সবার জানা দরকার। প্রজন্মকে জানানো দরকার।

আমাদের পরিচয় ৭৫ সালের দিকে। একই এলাকায় থাকতাম, জুবলি রোডে। ওর বাসা আমাদের বাসা ওয়াকিং ডিসটেন্স। আমাদের দুই পরিবারের কেউই চাইতো না গানবাজনা করি। কারণ, কেউ কখনও তার সন্তানকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে চায় না। আমরা দুজনেই বাবা-মায়ের বড় ছেলে। তো কে চাইবে মিউজিক করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ঠেলে দিতে তার সন্তানকে? কিন্তু খালাম্মা আবার আমাকে খুব ট্রাস্ট করতো। আমি ওর বাসায় গেলে বলতেন, ঠিক আছে যাও। তুমি আবার ফেরত দিয়ে যাইবা। একইভাবে আমার মাও বাচ্চুকে ছেলের মতোই জানতো। সত্যি বলতে, দুই পরিবারের দুজন মায়ের মমতার কারণে আমাদের দুজনের আজকের এই অবস্থান।

সেই সময়ে, আমরা যখন রাত্রিবেলায় শো করে ফিরতাম তখন বাসায় ঢোকা ছিল বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ। তখন মাগরিবের আগেই ঢোকার নিয়ম, অথচ আমরা রাতের দুইটা তিনটা বাজে ফিরতাম। তখন আমার মা রান্না করে বেড়ে আমাদের খাওয়াতেন। তখন থেকেই আমার মায়ের প্রতি বাচ্চুর আলাদা একটা টান ছিল। আমার মা বলতো, আমার দুইটা ছেলে। আর বাচ্চু বলতো তার দুইটা মা।

গত বছর এই সকালে (১৮ অক্টোবর) ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনের স্ক্রল দেখে আমি প্রথমে ভাবলাম এটা অন্য কোনও আইয়ুব বাচ্চু। পরে যখন খেয়াল করে পড়লাম সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু, তখন চিৎকার করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলাম। আমার স্ত্রী দৌড়ে এসে বললেন, কী হইছে কী হইছে...।

যাহোক, এভাবে তার মৃত্যুর খবর ঘুম ভেঙে শুনবো এত তাড়াতাড়ি—সেটা কল্পনাও করিনি। সারা জীবন এত মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, নিশ্চয়ই পরজনমে ও আনন্দেই থাকবে। বারবার আমার আজ এ কথাটাই মনে হচ্ছে।

সুখ এটুকুই, একটা সাকসেসফুল মিউজিক্যাল লাইফ পার করে গেছে আমার বন্ধু। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আইয়ুব বাচ্চু ভেবে দেখলো, আমার চেয়ে ওর আপন শুরু থেকে এ পর্যন্ত আর একজনও নেই। আমরা পারলে এক বালিশে ঘুমিয়েছি। এক থালায় খেয়েছি।

খুব মনে পড়ে। আমরা দুজন প্রথম ঢাকায় আসলাম ৭৮-৭৯-এর দিকে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল (শেরাটন) হোটেলের পাশে সাকুরা বারে আমরা অডিশন দিতে এলাম। মানে পরীক্ষায় পাস করলে এই বারে নিয়মিত বাজানোর সুযোগ হবে। ঢাকায় এসে উঠলাম বাসাবোর একটা হোটেলে। দুই দিন গেল, তারপরও অডিশনে ডাকে না। দুজনের পকেট ফাঁকা। পরিবার থেকে তো ‘না’ বলে আসছি। এরপর এক রাতে হোটেলে বসে বাচ্চুকে বললাম, তোর পকেটে কত আছে? বললো ৫ টাকা। আমার পকেটে হাত দিয়ে পেলাম ১০ টাকা। বললাম, তাহলে আমরা চট্টগ্রাম ফিরে যাবো কেমনে? বাচ্চু তো আবার বেশ মজার লোক। সে আমার এই টেনশনের কোনও পাত্তাই দিলো না। সে আবার বেশ ভোজন রসিক ছিল। বলে, ‘আগে খাইয়া নিই বেটা। পরে অন্য হিসাব।’

আমি পরে ডাক দিলাম বেয়ারাকে। বললাম, আচ্ছা কমের মধ্যে কী আছে নাস্তা (ডিনার)। বললো, পরোটা আর ভাজি আছে। বললাম, দুইটা পরোটা আর একটা ভাজি নিয়ে আসো। বেয়ারা আনলো। তখন আবার এগুলা খবরের কাগজে মোড়ায়ে দিতো। দুই পরোটা একটা পেপারে। আরেকটা পেপারের টুকরায় ভাজি। বেয়ারা আমাদের রুমে আনার সঙ্গে সঙ্গে ভাজির পেপার ভিজে ধপাস করে হোটেল রুমের ফ্লোরে পড়ে গেল!

আমি তখন বললাম, বাচ্চু রুটি-ভাজিও তোর কপালে নাই। কী আর করা। পানি খেয়ে শুয়ে পড়।

বাচ্চু বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বললো, আরে রাখ তোর কপাল। এই বলে সে ফ্লোর থেকে ভাজিটা তুলে নিলো আরেকটা কাগজে। এরপর দুজনে সেটা তৃপ্তি নিয়ে খেলাম।

আহারে বাচ্চু... তোর এসব স্মৃতির ভার আমি আর বইতে পারছি না।

গত বছর এই দিনে বাচ্চুর নিথর দেহ হাসপাতালে ফেলে এসে বাসায় ফিরে এসব ভাবি আর মনে হয়, আজকের ছেলেরা যে মসৃণ একটা পথ পেয়েছে সেটা এই বাচ্চুদের ঘামের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে। এই কথাটা আমরা যেন ভুলে না যাই। এমন হাজার হাজার কষ্টের ঘটনা আছে আমার আর বাচ্চুর, যা বলে শেষ করা যাবে না।

সংগীতের জন্য আমাদের দুই বন্ধুর দু-একটা কষ্টের ঘটনা না বলেও পারছি না। এসব বলতে চাইনি কখনও। না ও, না আমি। তবে এখন বোধহয় বলার সময় এসেছে। কারণ, আমি এসব বলে হালকা হতে চাই। এত এত স্মৃতির ভার আমি একা একা আর বইতে পারছি না।

‘‘মনে পড়ে, তখন আমাদের একমাত্র মিউজিক করার ক্ষেত্র ছিল বিয়েবাড়ি। ২০/৩০টা বাস ভরে মেহমান আসতো বিয়ের বাড়িতে। তাদের তো ঘুমানোর জায়গা দিতে পারতো না। তাই আমাদের গান দিয়ে অতিথিদের জাগিয়ে রাখতে হতো। আমরা টানা গাইতাম আগের দিন সন্ধ্যা ৮টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত! এরমধ্যে হয়তো যার বিয়ে তার শ্বশুর বলেছে মোহাম্মদ রফির গান করার জন্য। আবার কেউ হয়তো আবদার করলো ‘মান্না দে’ গাইবার জন্য। যা বলছে যেমনে বলছে তা-ই আমাদের গাইতে হতো। একবার এমন একটা অনুরোধ রাখিনি আমরা। ভুলে গিয়েছি হয়তো। সকালে আমাদের ইনস্ট্রুমেন্টস গোছাতে গোছাতে বললাম, ভাই আমাদের পারিশ্রমিক? জামাই বললো, আপনারা তো আমার আব্বার অনুরোধের গানটা পরিবেশন করেন নাই। সরি ভাই, আপনাদের জিনিসপত্র (গিটার-কিবোর্ড-ড্রামস) দিতে পারবো না। আপনারা চলে যান।”

পরে ওসব ফেলে রিকশা ভাড়া করে গ্রাম থেকে শহরে ফিরে আসি খালি হাতে। এই যে কষ্টগুলো, এই করুণ কাহিনি আমাদের জীবনে এসেছে।

আরেকটা বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা বলে শেষ করি। দুই বন্ধু মঞ্চে উঠে অনুষ্ঠান শুরু করে দিলাম। বেশ ফুরফুরে মেজাজ আমাদের। হঠাৎ দেখলাম একজন দা হাতে নিয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে! আমরা সব ফেলে দৌড় দিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে তাকেই বললাম, ভাই কী হয়েছে? পেছন থেকে ওই লোক বললো, আব্বা নামাজি মানুষ। উনি বলছে গান বাজনা হারাম। তোদের আনছে কে। আজকে তোদের জবাই করে ফেলবো ইত্যাদি। সঙ্গে গালাগালি তো আছেই।

এ কথা শুনে বাচ্চু একদিকে দৌড়াচ্ছে আমি আরেক দিকে। পায়ে একজনেরও স্যান্ডেল নাই। এরমধ্যে এই দৌড়ের সঙ্গে পেছনে যুক্ত হয়েছে বাড়ির দুই তিনটা কুকুরও। শেষ সম্বল ইন্সট্রুমেন্টও ফেলে এসেছি।

মিউজিকের জন্য এই যে কষ্ট, এই যে বাঁচার দৌড়, সেই দৌড় প্রতিযোগিতায় আমার বন্ধুটি ফার্স্ট হয়ে গেল। এক বছর আগের এই দিনে আমাকে পেছনে ফেলে সে পৌঁছে গেলো আসল গন্তব্যে।

বাচ্চু ছাড়া আমি একা, বন্ধুহীন, পরাজিত একজন। থেমে গেল আমাদের দৌড় প্রতিযোগিতা।

অনুলিখন: মাহমুদ মানজুর

 

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ