behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

আশিকী: হিট না ফ্লপ?

শেরিফ আল সায়ার॥১৫:২২, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৫

আশিকীসিনেমা মুক্তির আগেই ‘হিট'। এমন ঘটনা আগে কম দেখা গেলেও বর্তমান সময়ে অহরহ ঘটছে।  তবে এখন সিনেমা কাহিনীর ওপর ভর করে হিট হয় না। এই ‘হিট’ বিষয়টা নির্ভর করছে সিনেমার নায়ক কিংবা নায়িকার ওপর কিংবা ওই সিনেমা নিয়ে কেমন আলোচনা হচ্ছে তার ওপর। সুতরাং এ বছর কোরবানির ঈদের ‘আশিকী’ ছবিকে মুক্তির আগেই ‘হিট সিনেমা’ বলা যেতে পারে। কারণ কত-কত আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এই ‘আশিকী’! জাজ মাল্টিমিডিয়ার নতুন অবিষ্কার নুসরাত ফারিয়ার গ্ল্যামার, তার সিনেমায় পদার্পণ, বলিউডে সিনেমা করার আমন্ত্রণসহ কত কী!

দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন এক নুসরাত ফারিয়া এবং দ্বিতীয়ত তার পাশে ক্ষীণ আলোয় ছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মৌসুমী।

এত সব আলোচনা যখন চলছে তখনই মনে প্রশ্ন জাগে, আসলে নায়ক-নায়িকার ওপর ভর না করে যদি কাহিনীর ওপর ভর করে ‘হিট’ বিশ্লেষণ করতে হয়? তখন কি 'আশিকী'কে হিট বলা যাবে? যাই হোক, জেনে নেওয়া যাক- কেমন ছিল ‘আশিকী’?

বিনোদন সিনেমা মানেই কি বলিউডের ছোঁয়া:
আমাদের দেশে ‘ব্যবসায়িক সিনেমা’ বলতেই আমরা বুঝি নাচে-গানে ভরপুর। সঙ্গে গ্ল্যামার মাখা নায়িকা তো থাকছেই। আসলে ব্যবসায়িক এই ধারণাটি বলিউড থেকে ধার করা। ষাট কিংবা সত্তর দশকে এমন ধারণা বাংলাদেশে ছিল না। তখন গল্পের ওপরই নির্ভর করতে হতো। গল্পের সঙ্গে মিল রেখে মসলা গান কিংবা নায়িকাদের রঙঢঙ কদাচিৎ থাকতো। সেখানে কারও কোনও আপত্তি ছিল না। তবে ইদানীং কাহিনীর ওপর জোর দেওয়াটা কিঞ্চিত কমে গেছে। কাহিনীনির্ভরের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে সিনেমার গান এবং রঙচঙা বিষয়গুলোর ওপর। ‘আশিকী’ও এর ব্যাতিক্রম নয়।

আশিকী

ছবির শুরু থেকেই দর্শক বুঝে যাবে- বলিউডের থেকে ধার করা গল্প থেকেই এগুচ্ছে সিনেমা। নব্বই দশকের জনপ্রিয় ছবি ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ গল্পের মতোই নায়ক-নায়িকার সাক্ষাত হয় ট্রেনে। তবে পরিচালক এ ক্ষেত্রে কিছুটা চালাকির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি অকপটেই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ছবির সঙ্গে তালমিলিয়ে নায়ককে দিয়েই স্বীকার করিয়ে নিচ্ছেন, তাদের ঘটনা মিলে যাচ্ছে শাহরুখ খান-কাজলের ওই বিখ্যাত সিনেমার সঙ্গে।

‘আশিকী’ ছবিটি- প্রেমের। নায়ক চরিত্রের নাম রাহুল, অভিনয় করেছেন ওপার বাংলার অঙ্কুশ হাজরা। নায়িকা চরিত্রের নাম শ্রুতি, অভিনয়ে আমাদের দেশের মেয়ে নুসরাত ফারিয়া। ছবির প্রথমার্ধ পর্যন্ত গল্প এগিয়েছে খুব দ্রুত গতিতে। দুজনের প্রেম হওয়ার জন্য পরিচালক সময় নিয়েছেন খুব অল্প। এই প্রেম হওয়ার জন্য পরিচালক কিংবা ছবির গল্পকার দারস্থ হয়েছেন বলিউডের দুটি সিনেমার। প্রথমত বলেছি, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’। দ্বিতীয়ত তিনি কিছুটা নিয়েছেন, ‘জাব উই মেট’ ছবি থেকে। এটাকে অবশ্য মডিফাইড ভার্সন বলা চলে। সেটার ব্যাখ্যাও পরিচালক নায়িকাকে দিয়ে বলে দিয়েছেন। নায়ক রাহুল যখন বলে, সব কিছু ওই হিন্দি ছবির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, তখন নায়িকা শ্রুতি উত্তরে বলে, ওটা ছিল ১৯৯৫ সাল আর এটা ২০১৫ সাল।

তার অর্থ ১৯৯৫ সালের গল্পের মডিফিকেশনে এগিয়ে যাচ্ছে ‘আশিকী’। ছবির প্রথমার্ধ যেমন 'কপি-পেস্ট' অন্যদিকে সংলাপও খুব দুর্বল। প্রেমের সংলাপগুলোকে নিছক ন্যাকামি মনে হয়েছে। আশিকী নামটার মধ্যে এক গভীর প্রেম অনুভূতি রয়েছে। কিন্তু সংলাপের ভেতর তেমন প্রেম নেই, নেই গভীর অনুভূতি। একসময় দর্শকই বলে উঠছিল, ‘বোরিং’ সিনেমা।

তবে ‘কপি-পেস্ট’ গল্প থেকে পুরো সিনেমা ঘুরে দাঁড়ায় দ্বিতীয়ার্ধে। অর্থাৎ বিরতির পরই মনে হয়েছে, একটু ভিন্ন গল্প দেখছি। রাহুল-শ্রুতির প্রেম হওয়ার পর তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় শ্রুতির বড় ভাই। এই পুরো অধ্যায়টিতেই রাহুলের বোন, শ্রুতির বড় ভাই-বাবা-মার ভূমিকা আসতে শুরু করে। রাহুলের সঙ্গে শ্রুতির ভাইয়ের এক পুরনো হিসাব-কিতাব আছে। সেটা দেখার জন্য অবশ্য দর্শককে সিনেমা হলে যেতে হবে।

তো, শ্রুতির বড় ভাই কোনওভাবেই রাহুলের সঙ্গে তার বোনের বিয়ে দেবে না। আর রাহুলের তখন নানান কাণ্ডকীর্তি ছবিতে অন্যরকম বিনোদন যোগ করতে থাকে। ছবিতে হাস্যরস তৈরি হয়। দর্শক বিনোদন পায়। হেসে ওঠে, হাততালি দিয়ে ওঠে।

অভিনয়ের পারদর্শিতা:
ছবির গল্প যেমনই হোক অভিনয়ের জন্য সবাইকে সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া যাবে। বাংলাদেশের নতুন নায়িকা নুসরাত ফারিয়া আগেই মাতিয়েছেন ‘আশিকী’র গান প্রকাশের মধ্য দিয়ে। গানগুলোর মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশের পর থেকেই তার গ্ল্যামার নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল অনেকের। শুধু অপেক্ষায় ছিল, তার অভিনয় দক্ষতা দেখার জন্য। নুসরাত কাউকেই নিরাশ করেনি। অভিনয়েও সে ১০০তে ১০০ পাওয়ার যোগ্য। জাজ মাল্টিমিডিয়াকে ধন্যবাদ জানাতে হবে এজন্য যে, বহু বছর পর বাংলা সিনেমায় একমাত্র তারাই যোগ্য নায়িকা নিয়ে আসছেন। এর আগে মাহিয়া মাহিকে নিয়ে এসেছিলেন। মাহির গ্ল্যামার যথেষ্ট প্রশংসাযোগ্য হলেও অভিনয়ে কিছুটা ঘাটতি ছিল তার। যদিও মাহি দিনদিন পরিপক্ক হয়ে উঠছেন। কিন্তু নুসরাত সে জায়গায় নেই। বলে দেওয়া যায়, যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রে পা রেখেছেন নুসরাত ফারিয়া। তাকে বাংলা সিনেমায় স্বাগতম।

তবে জাজ মাল্টিমিডিয়া যেভাবে নায়িকা তৈরিতে প্রশংসা কামাচ্ছেন, সেভাবে নায়কপ্রতিভা বের করে আনতে তাদের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। তারা খুব শিগগিরই নিশ্চয়ই বাংলা সিনেমায় নতুন 'যোগ্য নায়ক' নিয়ে আসবেন। কারণ বাংলা সিনেমায় নায়কেরও অভাব রয়েছে। আর তাই তো নুসরাত বাংলাদেশি হলেও অঙ্কুশকে আনতে হয়েছে ওপার বাংলা থেকে। অঙ্কুশের অভিনয়ও পুরো ছবিতে দুর্দান্ত। তার অভিনয়ের পারদর্শিতা ছবিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

আশিকী

অন্যদিকে শ্রুতির দাদা (বড় ভাই) চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তিনি অনেকটা খলনায়কের মতোই। তবে তাকে বলতে হবে শক্তিধর অভিনেতা। পাশাপাশি শ্রুতির বাবা চরিত্রে ছিলেন রজতাভ দত্ত, রাহুলের বোনের চরিত্রে ছিলেন মৌসুমী। তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অংশগ্রহণ অনেক কম। তাছাড়া নারী চরিত্রগুলোকে খুব বেশি বাড়তে দেননি পরিচালক। নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই রেখে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে শ্রুতির মা এবং তার ভাবী চরিত্র দুটি পুরোই ম্লান।

সিনেমেটোগ্রাফি:
ছবির সিনেমেটোগ্রাফি সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার নেই। কোনও দেখার মতো কারুকাজ নেই। শটগুলো স্বাভাবিক ছিল। তবে ট্রেনের ছুটে যাওয়ার কিছু দৃশ্য যোগ হয়েছে ছবিতে। যা খুব দুর্বল মনে হয়েছে। ফাস্ট ফরওয়ার্ডে ট্রেনের ছুটে যাওয়ার দৃশ্যটি সিনেমার মধ্যে ছিল বেখাপ্পা। প্রশংসাযোগ্য ছিল, প্রতিটি গানের ক্যামেরার কাজ। গানগুলোতে নুসরাত এবং অঙ্কুশকে অসাধারণ লেগেছে। দুজনের এক্সপ্রেশন, গানের লোকেশন, কস্টিউম, নাচ, ক্যামেরার কাজ মিলে সত্যিই দেখার মতো ছিল।

শেষ বিবেচনা:
বাংলা ছবিতে নিজের গল্প দেখার জন্যই অপেক্ষা করে দর্শক। এ শহরের অলিগলিতে, এ দেশের গ্রামে-গঞ্জে কত অজানা গল্প তৈরি হয়ে আবার হারিয়ে যায়। দর্শক সে গল্পই ভালোবেসে দেখবে, মনে রাখবে চিরকাল। ‘আশিকী’ ছবি সাময়িক বিনোদনের জন্য খারাপ নয়। তবে চিরকাল মনে রাখার মতো ছবিও নয়।

জাজ মাল্টিমিডিয়া এবং এসকে মুভিজের যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘আশিকী’ পরিচালনা করেছেন আব্দুল আজিজ এবং অশোক পাতি। এই দুই প্রযোজনা সংস্থার অর্থের অভাব নেই। বিশেষ করে আমাদের দেশে জাজ মাল্টিমিডিয়ার নিত্যনতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ সবাইকেই মুগ্ধ করছে। তাদের নির্মাণ কৌশল, মার্কেটিং পলিসি, নায়ক-নায়িকা সবকিছুতেই থাকে আধুনিকতার ছোঁয়া। এই আধুনিকতার মধ্যে বলিউডের মিশ্র মসলা যেন সব কিছুকে ম্লান করে দেয়। সবাই আশা করে, জাজ মাল্টিমিডিয়া যেন নিজেদের গল্প নিয়ে আধুনিক ছবি নির্মাণ করে একদিন দর্শকের হৃদয়ে চিরকালের জন্য ঠাই করে নেবে। কারণ ওই ছবিই হিট যে ছবি মানুষ মনে রাখবে চিরকাল। আর ফ্লপ ছবি কে-ই বা বানাতে চায়? তাই শেষ বিবেচনার জন্য অপেক্ষা করছে দর্শক।

আশিকী

/এম/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ