behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পাইরেসি বন্ধে একাট্টা শিল্পী সমাজ‘আমরা এই ধ্বংস স্তূপ থেকে বের হতে চাই’

আমানুর রহমান রনি২১:০০, জানুয়ারি ১৩, ২০১৬

পাইরেসি বন্ধে আরও কঠোর শাস্তির আইন চেয়ে একাট্টা হয়েছেন দেশের জনপ্রিয় শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক ও কলাকুশলীরা। পাইরেসি বন্ধ না করতে পারলে এই শিল্প আর বেশিদিন টিকবে না বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাই এখনই এ বিষয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।

বামদিক থেকে পরিচালক কাজী হায়াত, কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী, গান প্রযোজক একেএম আরিফুর রহমান এবং চিত্রনায়িকা পপিবুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ক করপোরেশনের (বিএফডিসি) হলরুমে পাইরেসি প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারকে তারা এই অনুরোধ জানান। পাইরেসি প্রতিরোধ না হওয়ায় বাংলা ট্রিবিউনের কাছে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ এ পেশায় টিকে থাকা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

পরিচালক কাজী হায়াত বলেন, ‘গতমাসে আমার ছেলের (মারুফ) একটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। সিনেমা হলগুলো ছয়লাখ টাকা সেই ছবির জন্য বুকিংও দিয়েছিল। কিন্তু আমার ছেলের হাতে দুই হাজার টাকা এসে পৌঁছেছে। সে ঘরে ফিরে কান্না করেছে। এই হলো অবস্থা। পাইরেসির কারণে আজকে পুরো শিল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে শিগগিরই আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করব। আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখে আইন করতে হবে। যাতে অপরাধীরা কখনওই পাইরেসি করার সাহস না দেখায়।’

নাট্যব্যক্তিত্ব ও বীরমুক্তিযোদ্ধা হাসান ইমাম বলেন, ‘পাইরেসি করার জন্য সিডি যারা বিক্রি করছে তাদেরও গ্রেফতার করতে হবে। পাইরেসির কারণে আজকে দুটি বিষয় হুমকির সম্মুখিন হয়েছে। প্রথমত ব্যবসা এবং দ্বিতীয়ত সংস্কৃতি। দেশের সংস্কৃতি এভাবে শেষ হয়ে গেলে আর কি থাকবে আমাদের?’

তিনি আরও বলেন, ‘পাইরেসি প্রতিরোধে এখন যে আইন আছে তা আরও যুগোপযোগী করা দরকার। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখে আইন প্রণয়ন করা দরকার।’

সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অনেক বছর ধরে শিল্পীদের সম্মানী বৃদ্ধি করা হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে কিছুটা বৃদ্ধি করেছেন। তবে তাও পর্য‌াপ্ত নয়। কারণ তা দিয়ে একজন শিল্পীর দুই দিনেরও খাবার হবে না। তার মধ্যে তাদের সৃষ্টিকে নকল করে বাজারে ছেড়ে একটি চক্র লাভবান হচ্ছে। এটা কষ্টের।’

পাইরেসি বন্ধে দ্রুত আরও কার্য‌্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সবার একসঙ্গে এই অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিল্প সংস্কৃতি ও এ অঙ্গনের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই সবাইকে একসঙ্গে পাইরেসির বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।’

পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‘র‌্যাব পাইরেসির বিরুদ্ধে অনেক কাজ করেছে। ভবিষ্যতে আরও করবে। আমরা সেটা চাই। তবে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছে। তাই আরও কঠোর শাস্তি রেখে আইন করতে হবে।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর গুলিস্থানকেন্দ্রিক শক্তিশালী একটি চক্র পাইরেসিতে জড়িত। এরা ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন নাটক-গান-সিনেমার পাইরেটেড কপি কুরিয়ার বা বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। প্রতিটি এলাকায় তাদের লোকজন রয়েছে। এদেরসঙ্গে দু-একটি হারবাল কোম্পানিও জড়িত, যারা পাইরেসি চক্রকে অর্থ দিয়ে থাকে। বিনিময়ে তাদের হারবাল পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় ওইসব সিডিতে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কয়েকটি প্রভাবশালী মাল্টিমিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু মেশিন অপারেটর এবং কর্মচারীও পাইরেসির সঙ্গে যুক্ত। তারা বিশেষ চক্রের সঙ্গে মিলে গিয়ে সিনেমা-নাটকের সিডি-ডিভিডি পাইরেসি, হলপ্রিন্ট তৈরি করে। এরা অনেক সময় প্রযোজক-পরিচালকদের জিম্মি করে পাইরেসির হুমকি দিয়ে মোটা অংকের টাকাও আদায় করে।

চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলচ্চিত্র নকল করে বাজারজাত বন্ধ করতে ২০০৭ সালের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। প্রায় চার লাখ নকল ও অশ্লীল ভিডিও সিডি জব্দ করা হয়। পাইরেসি ও অশ্লীল ভিডিও চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ২ হাজার ৩০০ জনকে গ্রেফতারও করা হয়। এসব ঘটনায় প্রায় পৌনে ৮০০ মামলা হয়। কিন্তু গ্রেফতারকৃতরা জামিনে মুক্তি পেয়েই আবার সেই পাইরেসির কাজ শুরু করে। পরে টাস্কফোর্সের কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়ে। তার আবার চালু করার অনুরোধ করেছেন তারা।

মিউজিক ওনার্স এসাসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট একেএম আরিফুর রহমান বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকে পাইরেসির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অপরাধীরা ধরা পড়ছে। পাইরেসি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত এখন। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে অপরাধের ধরণও পরিবর্তন হচ্ছে। তাই নতুন করে আমাদেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘এটা এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। আমরা এটা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। পাইরেসি এই শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা এই ধ্বংস্তুপ থেকে বের হতে চাই। কোটি টাকার সিনেমা পাঁচ টাকায় পাওয়া যায়। পাঁচ টাকা দিলে আপনাকে মোবাইল ফোনে পুরো সিনেমাটি দিয়ে দিবে।’

শিল্পী সমিতির সভাপতি নায়ক শাকিব খান বলেন, ‘আমাদের শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এই পাইরেসি। আমরা সবাই পাইরেসি মুক্ত একটি শিল্প চাই।’

নায়িকা পরীমনি বলেন, ‘আমি অভিনয় করতে এসেছি। শেষ জীবন পর্যন্ত অভিনয় করতে চাই। আমরা বাংলাদেশে সেই পরিবেশ চাই। পাইরেসি মুক্ত সিনেমা চাই। আমরা আরও ভালো কাজ করতে চাই।’

নায়িকা পপি, কণ্ঠশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ, নায়ক ওমর সানি সহ আরও অনেকে পাইরেসি বন্ধে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য সরকারে প্রতি অনুরোধ করেন।

প্রসঙ্গত, পাইরেসি বন্ধে ২০০০ সালে কপিরাইট আইন করে সরকার। ২০০৫ সালে এ আইন সংশোধন করা হয়। আইন অনুযায়ী, নাটক, সাহিত্য, অডিও-ভিডিও, চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফি, ভাস্কর্য ও সম্প্রচার কর্মের স্বত্ব প্রণেতার মৃত্যুর ৬০ বছর পর্যন্ত বহাল থাকে। এ সময়ের মধ্যে কেউ কারও সৃষ্টিকর্ম নকল বা বিকৃত করলে পাইরেসি আইনের ৮২ ধারা মতে সর্বোচ্চ চার বছর কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের মেয়াদ পাঁচ বছর ও অর্থদণ্ড পাঁচ লাখ টাকার বিধান রয়েছে।

/এআরআর/এমএম/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ