Vision  ad on bangla Tribune

ভাষা সৈনিক আলতাফ মাহমুদ‘পলাশ ফুল হয়ে ফুটবেন, গাছ হয়ে বেঁচে থাকবেন’

জাকিয়া আহমেদ০০:০১, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৬

আলতাফ মাহমুদকে বছরের পর বছর মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাগানো হয়েছে একটি পলাশ গাছ। কারণ এই গাছ সাধারণত তিন শ’ বছর বাঁচে। আলতাফ মাহমুদ কন্যা শাওন মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এর মধ্যে দিয়ে শহীদ আলতাফ মাহমুদ বছরের পর বছর বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে। আমরা কেউ বেঁচে থাকবো না, একদিন সবাই মরে যাবো। তাই আমার চাওয়া তিন শ’ বছর পর যখন এই পলাশ গাছটি মরে যাবে তখন যেন আরেকটি পলাশ গাছ এখানে লাগানো হয়, সেটি মরে গেলে আরেকটি। কাউকে এই দায়িত্বটি নিতে হবে, আমি আশা করি, কেউ না কেউ দায়িত্বটি নেবেন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, বাঙালির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যতদিন থাকবে, ততদিন আলতাফ মাহমুদদের থাকতে হবে। আলতাফ মাহমুদ পলাশ ফুল হয়ে ফুটবেন, পলাশ গাছ হয়ে বেঁচে থাকবেন।’

আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি..ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া-এ ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি…’। অমর একুশের প্রথম প্রভাতে খালি পায়ে গানটি গাইতে গাইতে শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। অমর কালজয়ী এই গানটির সুরস্রষ্টা শহীদ আলতাফ মাহমুদ। ১৯৩৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর বরিশালের ছোট্ট একটি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে এই গানের মাধ্যমে হয়ে ওঠেন এক প্রতিবাদী নাম। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন ঢাকা ক্র্যাক প্লাটুনের সঙ্গে। আলতাফ মাহমুদ প্রতিবাদী সব গান রেকর্ড করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠাতেন। চুপি চুপি শোনা সেইসব গান উদ্বুদ্ধ করতো আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের। সেসময় আলতাফ মাহমুদের ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোডের সেই বাসাটি হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণকেন্দ্র।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ৩০ আগস্ট তার সেই বাসা থেকে আরও অনেকের সঙ্গে হানাদার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন জানা যায়, এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

হঠাৎ করেই ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পলাশ গাছটি লাগানো হয়। শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তখন ভালোবাসা দিবসে সবুজপাতা নামক একটি সংগঠনের কর্মশালা ছিল। তারা এই দিবসে সবাইকে গাছ উপহার দেবেন। তখন ওদের আমি বলি, তোমরা যদি ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জনকে গাছই দাও, তাহলে বাবার নামে সবাইকে পলাশ গাছ দাও, যেটি তিন শ’ বছর বাঁচে সেরকম একটি গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করো। তখন সবুজপাতার সংগঠক সাংবাদিক সাহেদ আলম আমাকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যারের বাসায় যান, কারণ জায়গাটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন। ভিসি স্যার আমাদের কথা শুনেই অনুমতি দিলেন, জায়গাটার কথাও বলে দিলেন সংশ্লিষ্টদের।’

‘তিনি আমাদের বলেন, গাছটা লাগিয়ে আসো, পরে দেখা যাবে ওটাকে কী করে সংরক্ষণ করা যায়। সেদিনই আরেফিন সিদ্দিক স্যার এবং আমার মা সারা আরা মাহমুদ গাছটি লাগালেন। এরপর থেকে প্রথম দিকে প্রতি দিনই আমরা ওখানে যেতাম, গাছে পানি দিতাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত গাছটির পরিচর্যা করেছেন, শহীদ মিনারে থাকা ছিন্নমূল শিশুরা গাছটিতে পানি দিয়েছে, পরিচর্যা করেছে, না হলে এ গাছ বাঁচতো না। ওদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই, কৃতজ্ঞতা আরেফিন স্যারের প্রতি এবং সবুজপাতা’র প্রতিও। কারণ, সবুজপাতাকে আমি একবার আমার আবেদনটি জানাতেই তারা সেটি গ্রহণ করেছে এবং গাছটি লাগিয়েছে।’

শহীদ আলতাফ মাহমুদ স্মরণে বৃক্ষ রোপন‘সবার পরিচর্যায় গাছটি বেঁচে যায়, শেকড় গজালো তার, আর আমি সেখানে খুঁজে পেতে থাকি অমর এই সুরস্রষ্টাকে, আমার বাবাকেও’- বলেন আলতাফ মাহমুদ কন্যা শাওন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শাওন সেখানে আবার যান গাছটিকে নতুন এক পরিমণ্ডলে আবদ্ধ করতে। শাওন বলেন,  ‘আমি সেখানে একটি নতুন ব্যানার দিয়েছি, কারণ একুশের পর সবাই আলতাফ মাহমুদকে ভুলে যান। আমি আসলে চাচ্ছি, ছোট্ট করে এখানে আলতাফ মাহমুদ চত্বর বানানো যায় কিনা। গাছটির চারপাশে মার্বেল পাথর দিয়ে বসার জায়গা থাকবে, যেখানে পথচারীরা এখানে বসে এই গাছের ছায়া নেবেন, গাছটির দিকে তাকাবেন, তাকাবেন শহীদ মিনারের দিকে। আমি এটা আরেফিন স্যারকেও বলেছি। আমার খুব চাওয়া এটি। তবে এখনও জানি না কতটুকু তার বাস্তবায়ন হবে কিংবা আমি এটা করতে গেলে অনুমতি পাবো কিনা।’

/এএইচ/এমএম/

লাইভ

টপ