প্রসঙ্গ নারী অধিকারপ্রশ্ন: আমরা তৈরি হচ্ছি কি?

লোপা হোসেইন১৯:০৩, মার্চ ০৮, ২০১৬

নারী দিবস পালন নিয়ে আমার ভীষণ আপত্তি। নারীর অধিকার,লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আর কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের প্রয়োজন কেন হবে? তাহলে তো একটা ‘পুরুষ দিবস’ ও থাকা উচিত। তাই না? নারীর জন্য আলাদা দিবস আছে, পুরুষের নেই। কারণ পুরুষের তা প্রয়োজন নেই, নারীর আছে। কেন? কারণ নারী দুর্বল। তাই কি? নারী-পুরুষের অধিকার কেন সমান হবে? একজন পুরুষকে কি লেখাপড়া আর ক্যারিয়ার সাজানোর পাশাপাশি ঘর সাজানো আর বাড়ির সবার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ভাবতে হয়? একজন পুরুষকে কি প্রতিমাসে ৫-৭ দিন প্রাকৃতিক রক্তক্ষরণের অস্বস্তি আর তীব্র ব্যথা নিয়ে হাসিমুখে অভিনয় করে যেতে হয়? একজন পুরুষকে কি ৯ মাস নিজের শরীরে আরেকজন মানুষকে ধারণ করে ভয়ংকর প্রসব বেদনা সহ্য করে জন্ম দিতে হয়? একজন পুরুষকে কি সারাক্ষণ যৌন হয়রানি আর এসিড সন্ত্রাসের ভয়ে থাকতে হয়? একজন পুরুষকে কি ধর্ষিত হতে হয়? 

লোপা হোসেইন৮ মার্চ নারী দিবসে যে পুরুষটা নারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিচ্ছেন, তিনিই হয়ত ঘরে বৌ রেখে সরাসরি বা ইশারায় আপত্তিকর মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছেন, সাহায্যের প্রলোভন দেখিয়ে ভোগের জন্য মুখিয়ে আছেন। আর যাদের ফাঁদে ফেলতে পারছেন না, তাদের ‘অহংকারী’ বা ‘নষ্টা’ ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করছেন। যেসব পুরুষ নারীর ক্ষমতায়ন আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন নিয়ে কথা বলেন, তাদের মধ্যে কয়জন বাড়ি গিয়ে তাদের মা, বোন বা স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করেন? তাদের মধ্যে কয়জন তার গৃহিণী হিসেবে সংসার সামলে যাওয়া স্ত্রীর কাজকে আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করেন? তাদের মধ্যে কয়জন তাদের সহকর্মী বা অধীনে কাজ করা নারীকে সংসার, সন্তান সামলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করেন? এখনও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা তথাকথিত শিক্ষিত পুরুষের মুখে শোনা যায়- ‘মেয়েরা সংসারের নাম করে কাজে ফাঁকি দেয়’, ‘মেয়েরা বসদের সঙ্গে রঙ-ঢং করে সহজে প্রোমোশন পায়’। এমনকি একটা মেয়ে যখন গর্ভবতী হয়, তখন সে ঠিকমত কাজ করতে পারবেনা ভেবে বা তার কাজের মাঝে কিছু সময় বিশ্রাম নিতে হবে বলে কর্মক্ষেত্রে তাদের এড়িয়ে চলা শুরু হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও মেয়েদের ভালো ফলাফল নিয়ে ছেলেদের কটুক্তি করতে দেখা যায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে গৃহবন্দী করতে চাওয়া পুরুষ ভুলে যায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, আমাদের আদর্শ হজরত মোঃ সাঃ ভালোবেসে, সম্মান করে বিয়ে করেছিলেন এক ব্যবসায়ী নারীকে।

লোপা হোসেইনএবার আসি নারীদের প্রসঙ্গে। আমরা কি করছি? আমরা কি চাই? আমরা কি সমঅধিকার চাই? নাকি মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা চাই? আমরা কি সেজেগুজে ‘শোপিস’ হয়েই খুশী থাকতে চাই? নাকি সৃষ্টিশীলতা আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সম্মান অর্জন করতে চাই? আমরা কি ‘লোকে কি বলবে?’ ‘সমাজ মানবে না’– ভেবে অপমান সহ্য করেও বন্দী হয়ে থাকতে চাই? নাকি সমাজ বদলের জন্য হাতে হাত ধরে দৃপ্ত পায়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই? …বলতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এটি সত্য যে নারীর অনেক সমস্যা নারীরাই সৃষ্টি করে। নারীর এগিয়ে যাবার পথে অনেক ক্ষেত্রেই একজন নারী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এক নারীর নামে কুৎসা রটায় আরেক নারী। একজন নারীর সাফল্যকে অভিনন্দন না জানিয়ে তাতে কালি মাখানোর চেষ্টা করে আরেক নারী। যে নারী নিজে বাইরে গিয়ে কাজ করেছে, সেই কঠিন রক্ষণশীলতা দেখাচ্ছে তার পুত্রবধূর সঙ্গে। শিক্ষিত আর অধিকার সচেতন কোনও নারী অত্যাচার করছেন তার নারী গৃহকর্মীকে। কেবলই ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছেন তার সম্ভাবনাময়ী নারী সহকর্মীকে।

লোপা হোসেইনএকজন নারীকে যতক্ষণ ‘মানুষ’ হিসেবে ভাবতে শিখবো না আমরা, সমস্যা থেকেই যাবে। আর এই ভাবনা প্রথমে নারীদের মধ্যে আসতে হবে। একজন নারীকে তার ভেতরের শক্তিটুকু অনুভব করতে শিখতে হবে। নারীকে বুঝতে হবে তার কি করার ক্ষমতা আছে। পরগাছা হয়ে বাঁচার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলতে হবে। কোনও ধর্মগ্রন্থে লেখা নেই যে বাবা-মাকে দেখা আর সংসার চালানোর দায়িত্ব কেবল পুরুষের। বাবা-মায়ের প্রতি ছেলে এবং মেয়ের দায়িত্ব সমান। তাই লেখাপড়ার শুরু থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে নারীকে। মায়াবতী হবার পাশাপাশি কঠোর হতে জানতে হবে। ত্যাগের পাশাপাশি ‘না’ বলতে জানতে হবে। সুন্দর হবার পাশাপাশি শক্তিশালীও হতে হবে। সম্মান আর অধিকার কেউ হাতে তুলে দেবে না। নিজেকেই আদায় করে নিতে হবে ।

প্রশ্ন: আমরা তৈরি হচ্ছি কি? 

লেখক: কণ্ঠশিল্পী ও সংবাদ উপস্থাপক

/এমএম/

লাইভ

টপ