Vision  ad on bangla Tribune

'আমি শামসুন্নাহার, পিতা অজ্ঞাত'

বিনোদন রিপোর্ট১৩:৪৩, মার্চ ২৩, ২০১৬

বীরাঙ্গণাআদালতে দাঁড়িয়ে সজল চোখে এক নারী স্পষ্ট করে বলছেন, জানতে চাইছেন- নিজের পরিচয়। বিচার চাইতে এসেছেন, মহান একাত্তরে নির্যাতিত-ধর্ষিত নিজ মায়ের।
নিজের পরিচয় জানাতে তিনি বলে উঠেন, 'আমি শামসুন্নাহার, পিতা অজ্ঞাত'।
শামসুন্নাহার, যাকে আমরা বলে থাকি ‌'যুদ্ধশিশু'। না, শুরুটা এভাবে নয়।
পর্দায় ভেসে উঠল ৪৩ বছর বয়সী এ নারীর কেক কাটার দৃশ্য। বাবা পরম আদরে মেয়ের মুখে কেক তুলে দিচ্ছেন। বাবাকে সে নারীর প্রশ্ন , ‘আচ্ছা, আমার জন্ম তো ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। কোথায় হয়েছিলাম আমি?’
বাবা হেসে জানালেন, রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। তার মেয়ে বিজয়শিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে। সেদিন হাসপাতালে ১৩-১৪টি শিশুর জন্ম হয়।
সেখানেই সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রশ্নটি উঠে আসে। ৭১' পরবর্তী সেসময় অনেক ধর্ষিত নারীর বাচ্চা হয়েছিল। বাবার তথ্য মতে, সেদিন জন্মগ্রহণ করা ৩-৪ জন ছিল যুদ্ধশিশু। সেদিনের বাবা-মা'রা অন্য বাচ্চাদের নিয়ে গেলেও যুদ্ধশিশুদের কী হয়েছিল তার জানা নেই।

আকুল হয়ে নারী জানতে চান, তাহলে তাদের কী হলো? তারা এখন কোথায়? আসলেই তারা কি বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকলে রাষ্ট্র তাদের কীভাবে গ্রহণ করেছে? আমরা তো একসঙ্গেই জন্মেছিলাম, তাহলে তাদের নাম কেনই-বা যুদ্ধশিশু?

গল্পের সূত্রপাত মূলত এভাবেই। আর নিজ বাবাকে প্রশ্ন করা সে নারীই নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী। মূলত ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই তিনি ছুটে বেড়ান তার জন্মসাথীদের খোঁজে।

গিয়ে দাঁড়ান হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। যেখানে তাদের জন্ম। কিন্তু হতাশ হন। ময়মনসিংহ, মাদার তেরেসা গির্জা- এগুলোতেও একই অভিজ্ঞতা। অবশেষে তিনি দেখা পান জন্মসাথীর। নাম- সুধীর।

মা টেপরী বর্মণ যাকে জন্মের পর বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। নিজ নানা প্রতিবেশীদের রোষানল থেকে তাকে বাঁচিয়েছিলেন।
এখন সুধীরের বয়স ৪৩। বিয়ে করেছেন। জনতা বর্মণ নামে তাদের ঘরে এক কন্যাসন্তান আছে। পেশায় ভ্যানচালক।

তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেমন লাগে এ জীবন? তিনি কোনও উত্তর দিতে পারেননি। বার বার শুধু বলছেন, এ জীবন... এ জীবন...। থেমে গিয়েছেন।
মেলাতে পারেননি কারও সঙ্গে। সবাই তাকে ‘পাঞ্জাবি-পুত’ বলে গালিও দেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, সে ‘পাঞ্জাবি-পুত’-এর মোবাইলের রিংটোন হিসেবে আছে ‌'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে' দেশাত্মবোধক গানটি!

অপরদিকে খোঁজ মেলে শামসুন্নাহারেরও। যিনি কিনা মৃত্যুর হুমকি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বীরাঙ্গনা মা মাজেদার সঙ্গে। তার আত্মপরিচয় জানতে মানবতাবিরোধী অপরাধের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। তারও বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামী থাকেননি। ঘর নেই, সংসার নেই, নিজের পরিচয়ও নেই। তিনি এখন অন্যদেশে গিয়ে বাঁচতে চান। যেখানে কেউ তাকে চিনবে না। বাবার নাম তাকে বলতে হবে না!

পরিচালক পান আরেক জন্মসাথীকে। যার ভাগ্য কিছুটা প্রসন্ন। জন্মের পর কানাডীয় এ দম্পতি তার দত্তক নিয়েছিল। নাম তার মনোয়ারা ক্লার্ক। তিনি চান, শুধু তার পরিচয়, জন্ম সার্টিফিকেট। এ জন্য বাংলাদেশে এসেও ঘুরে গেছেন।

এদের নিয়েই পরিচালক তৈরি করেছেন ৯০ মিনিটের অসাধারণ প্রামাণ্যচিত্র ‌‌'বর্ন টুগেদার', বাংলায় ‌'জন্মসাথী'।


মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে এর প্রিমিয়ার হয়। ছবিটি দেখতে উপস্থিত হন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
দুজনই অনুষ্ঠান শেষে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। সে সময় মঞ্চে এসেছিলেন পরিচালকসহ যুদ্ধশিশু সুধীর ও তার কন্যা জনতা বর্মণ। আরও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সদস্য সচিব ও ট্রাস্টি তারিক আলী, একাত্তর টেলিভিশনের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী সামিয়া জামানসহ অনেকে।
সবার বক্তব্যের মধ্যে একটি কথা বার বার ঘুরে ফিরেছে। পরিচালক যখন বলেন, ‌'আমরা তো একসঙ্গে জন্মেছি। তবে তাদের কেন যুদ্ধশিশু বলা হবে? আর আমাকে কেন বিজয়শিশু? হিসেবে তারাই তো সম্মানের প্রাপ্য। কারণ তাদের বড় ত্যাগের বিনিময়েই তো এ দেশ। তারাই তো বিজয়শিশু!'

এ প্রামাণ্যচিত্রটির যৌথ প্রযোজক একাত্তর টেলিভিশন ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোরডটকম এবং স্টার সিনেপ্লেক্স যথাক্রমে প্রামাণ্যচিত্রটির গণমাধ্যম ও প্রদর্শনী সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে। এটি দেখানো হবে একাত্তর টেলিভিশনে ২৫ মার্চ রাত ৮টা ২৫ মিনিটে।

/এম/

লাইভ

টপ