behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ৩০১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, নেপথ্যে মানুষ

মিছবাহ পাটওয়ারী২৩:১৫, অক্টোবর ১৯, ২০১৬

বিলুপ্তির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ৩০১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর মধ্যে বানর থেকে শুরু করে জলহস্তি কিংবা বাদুড়ও রয়েছে। রয়েল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স সাময়িকীর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের খাদ্যাভাসের কারণেই মূলত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে ওই প্রজাতির স্তন্যপায়ী।

রয়েল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স সাময়িকীর ওই গবেষণা প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এসব কথা জানিয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মাংসের ব্যাপক চাহিদা থাকায় তা শিকারীদের উৎসাহিত করছে। আর এতেই ঝুঁকিতে পড়ছে তাদের অস্তিত্ব। প্রাথমিকভাবে এমন ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতির সংখ্যা অন্তত ৩০১টি। মানুষের শিকার প্রবণতার ওপর প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

দীর্ঘ সময় ধরেই ঐতিহ্যগতভাবে মানুষের খাবারের একটা সাধারণ উৎস ছিল বন্যপ্রাণীর মাংস। এর ওপরই ভরসা করে এসেছে গ্রামের মানুষ। কিন্তু এক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটলো। সেখানকার  বাসিন্দারাও বন্যপ্রাণী শিকারীদের সম্ভাব্য ক্রেতায় পরিণত হলেন। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বনেবাদাড়ে ব্যাপক পরিসরে শিকার চালানো হলো। এভাবে ক্রমেই বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল খালি হতে শুরু করলো।

প্রকৃতির ওপর মানুষের অপশাসন, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দেশে গত দুইশ বছরে বিলুপ্ত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রজাতির প্রাণী। নতুন এই সমীক্ষার সঙ্গে যেসব বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আরও শতাধিক স্তন্যপায়ী প্রাণী হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এভাবে হারিয়ে যাওয়াটা আদতে মানুষের জন্যই সমস্যা তৈরি করবে। কয়েকশ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ভেঙে পড়বে। বিপাকে পড়বেন বেঁচে থাকার জন্য বুশমিট বা বন্যপ্রাণীর মাংসের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা।

এক সময় দুনিয়ার মাটিতে দাপিয়ে বেড়াত বিশালকার প্রাণী ডাইনোসর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়। সে ধারা সেখানেই থেমে যায়নি। বনাঞ্চলে মানুষের অব্যাহত দখল ও ধ্বংস সাধন এবং শিকার প্রবণতার ফলে দ্রুতলয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে বহু প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।

এ গবেষণাকর্মে খাবার সংগ্রহের জন্য শিকারের কারণে বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্র (আইইউসিএন)-এর রেড লিস্টের সাহায্য নিয়েছেন গবেষকরা। এতে তারা ৩০১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন যেগুলো সামগ্রিকভাবে বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের এক চতুর্থাংশ। অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীরা আবাস্থল হারানো কিংবা শিকারে পরিণত হওয়ার মতো ঝুঁকিতে রয়েছে।

এখানে উদাহরণস্বরূপ বিশালদেহী হাতির কথা উল্লেখ করা যায়। হাতির দাঁত বেচা-কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞার ২৫ বছর পরেও আইভরির লোভে চোরাগোপ্তা হাতি শিকার চলেছে। আইভরিকে এশিয়ায় ‘হোয়াইট গোল্ড’ বা সাদা সোনা বলা হয়। এরই মধ্যে এশিয়ার কিছু দেশে এখন আর হাতির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আফ্রিকার হাতিও। এভাবে চলতে থাকলে একদিন পৃথিবী থেকে হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বিভিন্ন রকমের স্তন্যপায়ীদের নিয়ে গঠিত উন্নত হাত, পা ও বড় মস্তিষ্কবিশিষ্ট একটি বর্গকে বলা হয় প্রাইমেট। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ৩০১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে নিম্নভূমির গরিলা ও মানড্রিলের মতো ১৬৮টি প্রাইমেটও রয়েছে। এছাড়া বুনো চমরী গাই এবং উটের মতো ৭৩ প্রজাতির ক্ষুরযুক্ত প্রাণী, ২৭ রকমের বাদুড় এবং মেঘলা চিতা ও ভালুকের মতো ১২ রকমের মাংসাশী প্রাণীও রয়েছে।

মাংসের খোঁজে মানুষের তৎপরতার কারণে হুমকিতে আছে ২৬ প্রজাতির শাবকবাহী জীব (পেটের তলায় থলিতে শাবক বহন করে এমন প্রাণী)। এরমধ্যে গাছে উঠা ক্যাঙ্গারু এবং দৈত্যাকায় সুলাওয়েসি কাঠবিড়াল এবং আলপাইন পশমসদৃশ ইঁদুরের মতো ২১ প্রজাতির করালও রয়েছে।

পৃথিবীতে আট প্রজাতির প্যাঙ্গোলিন রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তালিকায় আছে প্যাঙ্গোলিন-এর আটটি প্রজাতির সবগুলোই। কিছু মানুষ কোনও কিছু না ভেবে চমৎকার চামড়া আর মাংসের জন্য এই নিরীহ প্রাণীগুলোকে যথেচ্ছ শিকারে পরিণত করছে।

এই গবেষণাকর্মে যুক্ত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড-এর অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকডোনাল্ড। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী প্রভাবিত করার মতো প্রচুর বাজে জিনিস আছে। এর পুরোভাগে রয়েছে তাদের আবাসস্থল হারানোর বিষয়টি। তবে অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে মাংস সংগ্রহের জন্য শিকারের একটা বড় নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আপনি হয়তো এটা ভেবে আনন্দিত হতে পারেন যে, কিছু আবাস এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। কিন্তু এভাবে শিকার অব্যাহত থাকলে এক সময় এটি একটি খালি আলমারি বা মিটসেফে পরিণত হবে।

অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকডোনাল্ড বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেখানে আর তাদের আশ্রয়ের জন্য অবশিষ্ট কোনও জায়গা নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবাদে সেখানে অর্থের জন্য খরগোশ বাণিজ্যও অসম্ভব কিছু নয়।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড-এর এই অধ্যাপক বলেন, ক্যামেরুনের মতো দেশ যেখানে আমি কাজ করেছিলাম সেখানে আপনি এর একটা চিত্র দেখতে পারেন। আপনি দেখবেন সকালে ট্যাক্সির বহরগুলো সকালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকে যাত্রা করে। সেখান থেকে ট্যাক্সিতে বুশমিট বা বন্যপ্রাণীর মাংস ভর্তি করে তারা শহরে ফেরে।

দুনিয়াজুড়ে ঠিক কি মাত্রায় বন্যপ্রাণীর মাংসের বিকিকিনি হয়- সেটা পরিমাপ করা বেশ কঠিন। তবে ২০১১ সালে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফরেস্ট্রি রিসার্চ এ সম্পর্কে কিছু তথ্য উপস্থাপন করে। সংস্থাটি বলছে, প্রতিবছর আনুমানিক ৬০ লাখ টন প্রাণী এ বাজারের পণ্যে পরিণত হয়।

অন্য এক হিসাবে বলা হয়েছে, শুধু ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গল থেকেই বছরে ৮৯ হাজার টন বন্যপ্রাণীর মাংস সংগৃহীত হয়। যার বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২০০ কোটি ডলার। এই মাংস দেশের বাইরেও পাচার হয়। শুধু ফ্রান্সের চার্লস ডে গলে বিমানবন্দরেই ব্যক্তিগত ব্যাগে লুকিয়ে বহন করা হয় ২৬০ টন বন্যপ্রাণীর মাংস।

বন্যপ্রাণীর মাংস সংগ্রহের জন্য অনেক সময় ফাঁদ পেতে প্রাণীদের নির্বিচারে শিকারে পরিণত করা হয়। জিম্বাবুয়ের হুয়ানজে ন্যাশনাল পার্কেও এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে সেসিল সিংহের বাস।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, স্তন্যপায়ী প্রাণীরা হারিয়ে গেলে সেটা বিশ্বজুড়ে কয়েকশ কোটি গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড-এর অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকডোনাল্ড বলেন, যারা বিলাসিতা হিসেবে বন্যপ্রাণীর মাংস খায়; আর যারা অন্য কোনও বিকল্প না পেয়ে এটা খেয়ে জীবনধারণ করে তাদের উভয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে।

গবেষকরা বলছেন, ব্যাপক মাত্রায় শিকারের সমাধানে বৃহত্তর আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া স্থানীয়দের ক্ষমতায়ন, অধিকতর ভালো শিক্ষা, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা থেকে তাদের মুনাফার বিষয়টি নিশ্চিত করা, বিকল্প খাবার প্রদান করা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধকল্পে পরিবার পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।

সর্বশেষ এ গবেষণায় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিলুপ্তির ঝুঁকির জন্য মূলত মানুষের শিকারের প্রবণতাকে দায়ী করা হলেও এটিই বিপদের একমাত্র কারণ নয়। ২০১৫ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে তৃণভোজী বড় আকারের প্রাণীদের প্রায় ৬০ শতাংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এসবের মধ্যে গণ্ডার, হাতি ও গরিলা উল্লেখযোগ্য। তৃণভোজী ৭৪টি প্রজাতির অবস্থা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বহু প্রজাতি বিপর্যস্ত হতে পারে। এমনকি প্রাণীশূন্য হয়ে পড়তে পারে অনেক এলাকা। নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এখনই ব্যবস্থা না নিলে প্রতি ছয়টি প্রজাতির মধ্যে একটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।

/বিএ/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ