হিন্দুত্ববাদীদের ভয়ে সন্ত্রস্ত জম্মু-কাশ্মিরের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা!

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:৩২, এপ্রিল ২১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩৩, এপ্রিল ২২, ২০১৭

খুব অল্প জায়গায় থাকতে হয় অনেক রোহিঙ্গাকেমিয়ানমার থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যাওয়া বহু রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার আশ্রয় নিয়েছেন ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে। কিন্তু সম্প্রতি ভারতজুড়ে হিন্দুত্ববাদের উত্থানে ওই রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। জম্মুর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শনের পর বিবিসি হিন্দির এক প্রতিনিধির লেখা বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা উঠে আসে।

ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই মূলত জম্মু অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলেছেন। সেখানে কেউ কাজ করেন রাজমিস্ত্রির, কেউ আপেল বা কমলা বাগানে।  

নিজ দেশে নাগরিকত্বের অধিকারটুকু না পেলেও এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৃত্যুভয়। বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জম্মুর নরওয়াল এলাকায় দু’টি আর ভগবতী নগরে একটি শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর পুরুষরা যেমন যেতে পারছেন না কাজে, তেমনই নারীরা রোজকার প্রয়োজনের জন্য দোকানে যেতেও ভয় পাচ্ছেন।

জম্মু অঞ্চলের কিছু হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক নেতা আর কয়েকটি ব্যবসায়িক সংগঠন অভিযোগ তুলেছে যে রোহিঙ্গারা জম্মু দখল করে নিচ্ছে, স্থানীয়দের কাজ নাকি রোহিঙ্গারা কেড়ে নিচ্ছেন!

কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর সামনে ওই উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ত্রিশূল আর তলোয়ার নিয়ে মিছিল করে হুমকি দিয়েছে, ‘জম্মু ছেড়ে না গেলে রোহিঙ্গাদের উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে।’

রোহিঙ্গাদের অনেকে পরিচয়পত্র পেয়েছেন

গত বছর নভেম্বর থেকে সেখানে রোহিঙ্গাবিরোধী আন্দোলন শুরু করে হিন্দুত্ববাদীরা। এরপর থেকে শরণার্থী শিবিরগুলোতে চারবার আগুন দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হয়, ওই হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীই তাদের ঘরে আগুন দিয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত হয়েছেন। পুড়ে গেছে শরণার্থী শিবিরের বহু ঘর।

গত শুক্রবারের অগ্নিকাণ্ডে ভগবতী নগর শরণার্থী শিবিরের দশ ঘরের মধ্যে সাতটি ঘরই আগুনে পুড়ে গেছে। এতে ঘরহারা হয়ে পড়েছে ১৯টি রোহিঙ্গা পরিবার।

ওই শিবিরেই থাকেন নূর ইসলাম। তিনি জানান, ‘বৃহস্পতিবারই ক্যাম্পের আশপাশে বেশ কয়েকজন অচেনা লোককে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিলাম। তবে গুরুত্ব দিইনি খুব একটা। কে জানে ওরা কারা! কিন্তু এখন সত্যিই ভয় করতে শুরু করেছে আমাদের। এরকম ঘটনা তো এই প্রথম হলো না! কোথায় যাব আমরা?’

কিছুটা দূরের নরওয়াল শরণার্থী শিবিরে ৭১টি রোহিঙ্গা পরিবার বাস করে। ওই শিবিরের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইয়াসিন জানান, ‘আমরা দিনমজুরের কাজ করি। কাজের জন্য বহু দূরে যেতে হয়। কিন্তু গত কিছুদিন যাবৎ কেউ কাজে বেরুচ্ছে না। কী করে যাব? যদি কেউ মেরে ফেলে! মনে হচ্ছে নিজেদের ঘরেই কেউ যেন আমাদের বন্দি করে রেখেছে।’

নরওয়াল শরণার্থী শিবিরেরই আরেক বাসিন্দা আবদুল শুকুর আর তার মেয়ে জানান তাদের আতঙ্কের কথা। তারা বলেন, ‘আমরা কি এখানে চিরকালের জন্য থাকতে এসেছি? আমরা তো আশ্রয় নিয়েছি এখানে। নিজের দেশে আমাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। দেশের পরিস্থিতি শান্ত হলেই তো আমরা ফিরে যাব!’

রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি-পিডিপি সরকারের প্রধান মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলছেন রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিষয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

প্রাণের ভয়ে দূর-দূরান্তে আশ্রয় নিয়েছেন রোহিঙ্গারা

জম্মু-কাশ্মির সরকারের অন্যতম অংশীদার ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) স্থানীয় নেতা ও বিধানসভার স্পিকার কবিন্দর গুপ্ত বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কয়েক দশক আগে যেসব হিন্দু পরিবার এখানে এসেছিল, তারা এখনও নাগরিকত্ব পায়নি। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমানদের এখানে রেশন কার্ড হয়ে গেছে, সরকারি নথিও হয়েছে। সেজন্যই কিছু মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। তবুও আমরা চাই মানবতার সঙ্গে বিষয়টা সমাধান করা হোক।’

জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের শরণার্থী পরিচয়পত্র দিয়েছে। কিন্তু এই ‘রোহিঙ্গা হঠাও’ অভিযানের ফলে তারা এখন প্রাণের ভয় পেতে শুরু করেছেন। তাদের ভয় পাওয়াটা অবশ্য অমূলক নয়।

সম্প্রতি জানা গেছে, জম্মুর ব্যবসায়িক সংগঠন ‘জম্মু চেম্বার অব কমার্স’-এর সভাপতি রাকেশ গুপ্ত রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘রোহিঙ্গাদের এক এক করে খুঁজে বের করে মেরে ফেলার সময় এসেছে।’ তবে রাকেশ গুপ্ত বিবিসির কাছে দাবি করেন, ‘এটা সংবাদমাধ্যমের ভুল। আমি বলেছিলাম এই সমস্যাগুলোকে খুঁজে বের করে শেষ করে দেওয়া হবে। কোনও মানুষকে মারার কথা বলিনি।’ তবে রাকেশ গুপ্তের ওই ‘সংশোধিত’ বক্তব্য জম্মু-কাশ্মিরের কোনও সংবাদমাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

/এসএ/

লাইভ

টপ