অন্ধকারের আবরণই যখন বাংলাদেশে প্রবেশের অবলম্বন

Send
মিছবাহ পাটওয়ারী
প্রকাশিত : ১৯:১২, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৮, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭

সবুজ ধানক্ষেত, বন জঙ্গল আর বিপজ্জনকভাবে উঁচু খাড়া পাহাড়ি এলাকা পাড়ি দিয়ে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন মিয়ানমারের বিপন্ন রোহিঙ্গারা। জীবন বাঁচাতে দলে দলে সীমান্তের দিকে ছুটছেন তারা। পেছনে ফেলে এসেছেন পূর্বপ্রজন্মের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর, ক্ষেতভরা ফসল আর বহু কষ্টে গড়ে তোলা ব্যবসা বাণিজ্য। যে যেভাবে পেরেছেন দৌড়ে পালিয়েছেন। এই পালিয়ে যাবার পথে স্মৃতিকাতর হয়ে পেছনে তাকাতেই দেখছেন নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে এখনও উড়ছে আগুনের লেলিহান শিখা। সেনাদের লাগিয়ে দেওয়া সে আগুন যেন তাদের হৃদয়কে আরও ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে। যেন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে তাদের পূর্বপ্রজন্মের স্মৃতি আর ঐতিহ্যকে।

ঝুঁকিপূর্ণ এই দীর্ঘ যাত্রায় কারও সঙ্গী তাদের বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা। কারও সঙ্গে হয়তো নবজাতক বা ছোট্ট শিশুরা। আছেন গর্ভবতী নারীরাও। এতোটা পথ পাড়ি দেওয়ার শক্তি হয়তো তাদের নেই। তাই কয়েকজন মিলে কাঁধে বাঁশ নিয়ে সেই বাঁশের সঙ্গে ঝুড়ি বা চেয়ার বেঁধে তাতে করে মা-বাবাকে নিয়ে আসছেন অনেকে। কেউবা আবার বৃদ্ধদের পিঠে নিয়েই পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ পথ। শিশুদের নিয়ে আসছেন বেতের ঝুড়িতে। পানিপথে কোথাও বুক সমান আবার কোথাও প্রায় নাক পর্যন্ত পানিতে শিশুদের উঁচুতে তুলে ধরে পালিয়ে আসছেন অনেকে।

এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার অনেকটাই সম্পন্ন হয় রাতের বেলায়। বর্মী সেনাবাহিনী আর উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের চোখের অন্তরালে। তবে রাতের আঁধারও তাদের পুরোপুরি নিস্তার দেয় না। রোহিঙ্গাদের পালানোর পথও বন্ধ করে দিতে সীমান্তজুড়ে মাইন পেতে রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এসব মাইনের ইতোমধ্যে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এতোগুলো ধাপ নিরাপদে অতিক্রমে সক্ষম হলে মাছ ধরার নৌকায় করে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন রোহিঙ্গারা।

বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় এক হাজার ডলার। আর নাফ নদী পাড়ি দিয়ে সেই দেশে আসতে বিপন্ন রোহিঙ্গাদের জনপ্রতি ভাড়া গুণতে হয় ২৫০ ডলার ২০ হাজার ৫০০ টাকা। তবে সবাই যে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পেরেছেন-এমন নয়। মিয়ানমারের মংডুর জঙ্গলে অনেক রোহিঙ্গা নারী ও শিশু লুকিয়ে আছেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন শাহপরীর দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তিনি জানান, জঙ্গল থেকে বের হলে প্রাণ হারাতে পারেন- এই ভয়ে নাফ নদীর দিকে তারা অগ্রসর হতে পারছে না। তাই বাধ্য হয়েই বিপন্ন এই মানুষগুলো জঙ্গলে লুকিয়ে আছে।

বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে কখনোই বাংলাদেশে আসতে চাননি ৯৭ বছরের নাজির হোসেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে তিন ছেলে আগেই বাংলাদেশে এসেছেন। শুধু একাই বাড়িতে রয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কারণ সেখানে তার দাদা-দাদি থেকে শুরু বাবা-মা ও স্ত্রীর কবর। সেই জন্মভূমিতেই প্রিয়জনদের পাশে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হওয়ার শেষ ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এবারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ তাকে নিজের ভিটেমাটিতে থাকতে দেয়নি। বাধ্য করেছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হতে দেখছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হতে দেখছি। আমার  ৯৭ বছর বয়সে এমন বর্বরতা দেখিনি।’

নাজির হোসেন সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষ রাইখাইনের বাসিন্দা। আমরা খুব ধনী ছিলাম। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার আগে ভারতের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। মিয়ানমারের বলিবাজার থানার নাগপুরায় থাকতাম। ওই এলাকায় ১৬ কানি আবাদি জমি আছে।’ ২৭ আগস্ট রাতে সেনাবাহিনী তার গ্রামে আগুন দেয়। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসেন বাংলাদেশে।

এই নাজির হোসেন একজন নয়। জীবন বাঁচাতে স্রোতের মতো রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। গত ২৫ আগস্ট নতুন করে রোহিঙ্গাবিরোধী সহিংসতা শুরুর পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা এরইমধ্যে তিন লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের এ সংখ্যার কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা।

নূর মোহাম্মদ নামের একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী সিএনএন-কে বলেন, ‘তারা আমার ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। মেয়ের জামাইকে তুলে নিয়ে গেছে। রাখাইনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তারা সব শেষ করে দিয়েছে। সিএনএন-এর হাতে পৌঁছানো ভিডিও-তে দেখা গেছে, কিভাবে রাতের আঁধারে কাঠের নৌকায় করে কোনও রকমে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য মরিয়া হয়ে আছে রোহিঙ্গারা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ-আল হুসেইন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ হতে পারে।

সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স।

/বিএ/

লাইভ

টপ