স্কাই নিউজের সাংবাদিকের বর্ণনায় রাখাইনের নিপীড়িত রোহিঙ্গারা

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৭:৩২, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৬, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে তার খানিক নমুনা প্রত্যক্ষ করার দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের সংবাদকর্মীরা। মিয়ানমার সংলগ্ন বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে ওই পারে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। স্কাই নিউজের প্রতিবেদক আশিষ জোশি এক প্রতিবেদনে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

এক রোহিঙ্গা শিশুর কোলে তার ৫ দিন বয়সী ভাই
ওই প্রতিবেদনে আশিষ লিখেছেন, তিনি, প্রযোজক নেভিলে লাজারাস ও ক্যামেরাপার্সন পিট মিলনেস রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কাজ করছিলেন। একদিন মিয়ানমার সংলগ্ন বাংলাদেশ সীমান্তে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তারা ছোট্ট একটি মুদি দোকানের সামনে থেমে যান। দেখতে পান ধোঁয়ার কুণ্ডলী। একটু ভালো করে দেখার পর তারা বুঝতে পারলেন যেখানে বাংলাদেশের সীমানা শেষ হয়েছে এবং মিয়ানমারের সীমানা শুরু হয়েছে সেখানে এ ধোঁয়া উড়ছে। আশিষ লিখেছেন, ‘আমি শুনেছিলাম মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জ্বালাও পোড়াও অব্যাহত রেখেছে কিন্তু দিনের বেলা এবং এতোটা প্রকাশ্যে ওরা এমনটা করছে তা ধারণা করিনি। আমি ভেবেছিলাম আন্তর্জাতিক ক্ষোভ আর নিন্দা এড়াতে হয়তো তারা রাতের অন্ধকারে এমন দমন-পীড়নমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তবে সত্যি কথা হলো বিশ্ব সম্প্রদায় কী ভাবছে তা মিয়ানমারের জেনারেলরা পরোয়া করেন না। জাতিগত নিধনযজ্ঞ আর গণহত্যার অভিযোগ উঠলো কি উঠলো না তা নিয়ে তারা মাথা ঘামান না।’

মোহাম্মদ সায়েম নামের এক প্রত্যক্ষদর্শীকে উদ্ধৃত করে আশিষ জানান, যে গ্রামটি জ্বলছিল সেখানে প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস। সায়েমের দাবি, দুই তিন আগে ওই আগুন জ্বলা শুরু হয়। আশিষ জানান, সায়েমের কাছ থেকে ওই কথা শোনার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি নিশ্চিত?’ অং সান সু চি দাবি করে আসছিলেন রোহিঙ্গাদের দমন-পীড়নের ইস্যুতে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, কতিপয় ‘মুসলিম সন্ত্রাসীর’ বিরুদ্ধে অভিযান চলছে বলেও দাবি করে আসছেন তিনি।  আর তাই সায়েমের কাছ থেকে জ্বালাও পোড়াও এর ব্যাপারে বার বার নিশ্চিত হতে চাইছিলেন বলে জানান আশিষ।

স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে তিনি আরও লিখেছেন, “আমি সায়েমকে আবারও জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি নিশ্চিত? জবাবে তিনি বললেন-হ্যাঁ। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম নিজ চোখে দেখেছেন? জবাবে সায়েম জানালেন তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। মোবাইলে তোলা বেশ কয়েকটি ছবিও দেখালেন। দেখা গেল অগ্নিশিখা। এরপর কালো ধোঁয়া বের হতে লাগলো। এরপর আবার ধূসর ধোঁয়া দেখা গেল। দিনের আলোও পাল্টাতে দেখা গেল। হঠাৎ আমরা কান্নার শব্দ পেলাম। ‘দেখ, রোহিঙ্গা! এখন আরও রোহিঙ্গা আসছে।’ বলে উঠলো সায়েম।

সারিবদ্ধ হয়ে রাখাইন রাজ্য থেকে পালাতে থাকা রোহিঙ্গারা
আশিষ জানান, একটু দূরে তাকিয়েই তারা দেখতে পেয়েছেন এক দল মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে আসছে। তাদের কাঁধে বাঁশ আর সেগুলোর মাথায় কাপড়ের পুঁটলি বাঁধা। পথেই তারা ওই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে আলাপ করতে শুরু করলেন।

আশিষ বলেন, ‘প্রথমেই আমরা কথা বললাম, নুর খালিম নামের এক নারীর সঙ্গে। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন খালিম। জানালেন, গণহারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগের প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। তার লম্বা পোশাকটা খানিক উঁচু করে নুর খালিম তার পা দেখালেন। দেখলাম সেগুলো গোলাপি রংয়ের হয়ে আছে, চামড়া যেন খুলে আসছে। ক্ষত থেকে তখনও রক্ত বের হচ্ছে। তার বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর এমনই পরিণতি হয়েছে। আর সেই জ্বলন্ত পা নিয়েই কয়েকদিন ধরে হাঁটার পর বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। সারিবদ্ধভাবে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬-৭ বছরের এক মেয়েকে লক্ষ্য করলাম। তার কোলে মুজাহিদ নামের ৫ দিন বয়সী এক শিশু। মুজাহিদ বিবর্ণ আর হলুদ রং হয়ে আছে। পুরোপুরি শুয়ে আছে সে। মুখ খোলা। মুখ দিয়ে ছোট ছোট করে শ্বাস নিচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলাম এ নবজাতক অসুস্থ। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মুজাহিদের মা রাবিয়াকে। সন্তানের মতো তার অবস্থাটাও করুণ। তার ঠোঁটগুলো বিবর্ণ হয়ে আছে, ফেটে গেছে এবং সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে। মাথা তুলতে যেন কষ্ট তার। তিনি জানালেন কিভাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছেচ সন্তান দেওয়ার পর ৫দিন ধরে হেঁটে কিভাবে তিনি এখানে এসেছেন।’

/এফইউ/

লাইভ

টপ