ফিলিস্তিনকে বিভাজনে জাতিসংঘের পরিকল্পনার অজানা ইতিহাস

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১১:২৭, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩০, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেজুলেশন-১৮১ এর আওতায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে ভাগ করে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ও একটি আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন করার প্রস্তাব করা হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। গ্লোবাল রিসার্চ একটি প্রতিবেদনে এই প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার কিছু অজানা তথ্য বিস্তারিত তুলে ধরেছেন জেরোমি এস সেগাল।

১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিনকে বিভাজনে জাতিসংঘ রেজুলেশন-১৮১ গ্রহণ করে

কয়েকদিন আগে ইসরায়েল ও তার বিশ্বব্যাপী সমর্থকরা ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের  বিভাজন প্রস্তাবের ৭০ বছর পূর্তি উৎসব পালন করেছে। যেখানে বলা হয়েছে ফিলিস্তিনিকে ভাগ করে একটি  ইহুদিবাদী ও আরেকটি আরব রাষ্ট্র হবে। তবে প্রস্তাবটিতে ফিলিস্তিনিদের না বলাটার কারণও খুব সহজ। তারা বিশ্বাস করে এটা অবিচার কারণ ফিলিস্তিনের সব ভূখণ্ডের অধিকার তাদের। এছাড়া তারা মনে করে যুদ্ধ হবেই আর এতে শক্তিশালী আরব সেনাদের বিরুদ্ধে মাত্র ৬ লাখ অধিবাসীর ইসরায়েল জয়লাভ করতে পারবে না।

এদিকে ইসরায়েলের সমর্থকদের উদযাপনের মধ্যে তারা একটি বিষয় খেয়াল করেনি। তা হলো দুই সপ্তাহ আগে ১৫ নভেম্বর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণার ২৯ বছর পূর্তি হয়েছে। ১৯৯৮  সালে ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন– পিএলও এটা ঘোষণা করে। ফিলিস্তিনের এই ঘোষণা না বুঝলে বিভাজন প্রস্তাবটি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। এই ঘোষণায় তারা ১৯৬৪ সালে ঘোষিত ফিলিস্তিনি জাতীয় চুক্তিতে বলা ঐতিহাসিক অবস্থানই নিয়েছে। ফিলিস্তিনের বিভাজন ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সব সময়ের জন্য পুরোপুরিভাবে অবৈধ। কারণ এটা ফিলিস্তিনি জনগণ ও মাতৃভূমির প্রতি তাদের অধিকারের বিপরীত। এছাড়া এটা যেকোনও জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিষয়ে জাতিসংঘের দলিলবিরোধী। মজার ব্যাপার হলো, এ বিভাজনকে ‘সব সময়ের জন্য পুরোপুরিভাবে অবৈধ’ দাবি করে ১৯৬৪ সালের ঘোষিত চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ঠিক আছে। এরপর বিভাজন ঘোষণার প্রায় ৪১ বছর পরে ফিলিন্তিনের স্বাধীনতা বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা দাবি। এখন পিএলও বিভাজন প্রস্তাবের বৈধতা স্বীকার করে এটাকে অবৈধ বলার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার উপর জোর দিয়েছে। তারা এটাও বুঝেছে, বিষয়টি ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে গেলেও তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গড়ার ডাক দিতে পারবে।

জনগণের উপর ঐতিহাসিক অত্যাচার নির্যাতনের পরও জাতিসংঘের ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বিভাজন প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক আইন মেনে করা  হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। ওই সময় পিএলও বিভাজন প্রস্তাবটি বাতিলের দাবি জানিয়েছিল। ইয়াসির আরাফাতের আইন উপদেষ্টা তাকে প্রথমে স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন তাতে বিভাজনের ফলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভিত্তিতে তৈরি ছিল না। সেটাতে শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। এ ঘোষণায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বৈধতা না দিলেও ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এজন্য আরাফাত খসড়াটি বাদ দিয়ে ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশকে মূল ঘোষণাটি লিখতে বলেন।

অনেকেই, এমনকি যারা সংঘাতের বিষয়টি খুব কাছ থেকে দেখছেন তারাও বিষয়টি জানেন না। যাই হোক, ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে  ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণাটি শুধু একতরফা ঘোষণাই ছিল না, ‘একতরফা শান্তি স্থাপন’ও ছিল। তারা এখানকার সংঘাতের মূল বিষয়গুলোতে একতরফা ঘোষণার সঙ্গে একতরফা ছাড়ের বিষয়টি সমন্বয় করেন।

গত ডিসেম্বরে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির শেষ বক্তব্যে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণাটির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের  স্বীকৃতি দেওয়ার দাবির বিষয়টি নতুনভাবে প্রস্তাব করেন কেরি। এজন্য তিনি দুই পক্ষকেই সমঝোতার মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রেজুলেশন-১৮১ মেনে নিয়ে দুটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন। কারণ ইসরায়েল ও পিএলও উভয়ই রেজুলেশন-১৮১ এর আলোকে তাদের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে।

দেরিতে হলেও ইহুদি রাষ্ট্রের প্রস্তাব বা সব সমস্যার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের এই ঘোষণার গুরুত্ব বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিন এখন তাড়াতাড়ি জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার চেষ্টা করছে। এজন্য তাদের এটা পরিস্কার করতে হবে, তারা ১৯৯৮ সালের ঘোষণা অনুসারেই সদস্য হতে চায়। এখন যদি তারা নিজেদের বৈধতার সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের বৈধতার বিষয়টি যোগ করতে পারে তাহলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও তাদের জাতিসংঘের সদস্য পদ পেতে সমর্থন করবে।

 

/আরএ/এএ/

লাইভ

টপ