‘জাস্টিস ফর জয়নাব’

‘জাস্টিস ফর জয়নাব’

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:০৫, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একটি ঘটনায় সোচ্চার হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের মানবিক সমাজ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গের পররাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্ককে ছাপিয়ে সেখানকার সংবাদমাধ্যমে এখন  পাঞ্জাব প্রদেশের সেই কন্যা শিশুর প্রাধান্য। জয়নাব আনসারি নামের ওই শিশুর জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে ব্লগার, সাংবাদিক আর রাজনীতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়েছেন। প্রতিবাদী বিক্ষোভে সামিল হয়ে এরইমধ্যে দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের ক্রিকেটার। রাস্তায় নেমেছেন অভিনয় শিল্পী। নিজের  শিশু কন্যাকে কোলে নিয়ে খবর পড়েছেন সংবাদপাঠিকা । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হ্যাশট্যাগে ’জাস্টিস ফর জয়নাব'। বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী পাকিস্তানীরাও সামিল হয়েছেন ন্যায়বিচারের দাবিতে।
সপ্তাহখানেক আগে সাত বছরের ছোট্ট জয়নাবকে পাকিস্তানের কাসুর থেকে অপহরণ করে দুষ্কৃতীরা

পুলিশ সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানায়, সপ্তাহখানেক আগে সাত বছরের ছোট্ট জয়নাবকে পাকিস্তানের কাসুর থেকে অপহরণ করে দুষ্কৃতীরা। ধারণা করা হচ্ছে, ৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) কোরআন ক্লাসে শেষে বাসায় ফেরার পথে জয়নাবকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ৯ জানুয়ারি এক পুলিশ সদস্য শাহবাজ খান রোডে আবর্জনার স্তূপ থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা পাকিস্তান। ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভকারীরা কাসুর শহরে পুলিশ প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। এতে দু'জন নিহত হয়। শুক্রবার দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ হয়েছে।

ভারতীয় নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী শিশু অধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী  তার টুইটার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘ছোট্ট জয়নাবের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমি পাকিস্তান সরকারকে শিশুদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও সীমিত সময়ে বিচার সম্পন্ন করতে বলিষ্ঠ কৌশল গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’

শিশু জয়নাবকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তান জুড়ে রাস্তায় নেমেছে মানুষ

হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে 'হ্যাশট্যাগ জাস্টিস ফর জয়নাব' লিখে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন চলচ্চিত্র ও ক্রিকেট তারকারা। এ ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা। পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশে এক টুইটে অভিনেত্রী মাহিরা খান লিখেছেন, খুনিকে খুঁজে বের করতে যা যা করা দরকার তাই করুন। আল্লাহর দোহাই লাগে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। এমন উদাহরণ তৈরি করুন যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করার সাহস কেউ না পায়। টুইটারে 'জাস্টিস ফর জয়নাব' হ্যাশট্যাগ দিয়ে ক্রিকেটার মোহাম্মদ আমির লেখেন, 'হৃদয় ভেঙে গেছে। নিঃসঙ্গ ও ঘৃণ্য মনে হচ্ছে। এটা ভেবে অবাক হচ্ছি যে, আমরা কোন সমাজে বাস করছি। শিশুটির মা-বাবার প্রতি সমবেদনা জানানোর ভাষা নেই আমার।

হীরা হাসান নামের এক পাকিস্তানি ব্লগার লিখেছেন, ‘‘ভুক্তভোগী বদলেছে! ধর্ষণকারী বদলেছে! কিন্তু শিরোনাম এখনও একই আছে, ‘আরেকটি শিশু ধর্ষিত…’ একবারের জন্য হলেও হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলানো হোক আর তাদের পুরুষাঙ্গ কেটে দেওয়া হোক। হ্যা, এটাই একমাত্র উপায়!!!’’  জয়নাবের কয়েকটি ছবি দিয়ে পাকিস্তানের সাংবাদিক ইহতেশাম উল হক তার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘আমি গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। আমি বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছি। এই ছবিগুলো আমাকে অনেক কষ্ট দেয়!’


বুধবার সামা টেলিভিশনের পর্দায় মেয়েকে নিয়ে হাজির হন উপস্থাপিকা

ইসলামাবাদের বাসিন্দা আব্দুল রেহমান লিখেছেন, ‘ধর্ষণ একমাত্র অপরাধ যেখানে ভুক্তভোগীকে অভিযুক্ত করা হয়। এটা চলতে দিয়ে আমরা সবাই নিজেদের হাত রক্তে রঞ্জিত করেছি। যদি শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা কর তাহলে তোমার মৃত্যুই প্রাপ্য!’  যুক্তরাষ্ট্রে মেরিল্যান্ড থেকে কাসিফ এন চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমি পাকিস্তানি আহমদিয়া মুসলিম। জয়নাবের বাবা আমার বিশ্বাসের জন্য আমাকে ঘৃণা করেন। কিন্তু আমি কোনও শর্ত ছাড়াই জয়নাবের জন্য দাঁড়িয়েছি। জয়নাব আমারও মেয়ে!’

করাচির বাসিন্দা ও তরুণ রাজনীতিক আয়েশা মিমোন জয়নাবে হাতের লেখা সম্বলিত একটি ছবি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জয়নাবের শেষ বাড়ির কাজ। এটা দেখার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না।’ শাহজায়িব আওয়ান নামের একজন লিখেছেন, ‘সবার মনযোগ কেড়েছে, পুরো জাতি কথা বলছে, সুপ্রিম কোর্ট ও সেনাপ্রধান যুক্ত হয়েছে, আমি নিশ্চিত জয়নাবের হত্যাকারী দ্রুতই ধরা পড়বে। আমরা সবাই মিলে কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি না যেখানে জাতীয় বিক্ষোভ ছাড়াও ভুক্তভোগী বিচার পাবে?


৯ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) শহরের এক আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার হয় জয়নাবের দেহ

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম থেকে শাজিয়া পারভীন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘এই ঘৃণ্য অমানবিক অবর্ণনীয় অসমর্থনযোগ্য অপরাধের কোনও জায়গা এই দুনিয়ায় নেই। নিজের  বেলায় না ঘটলে আপনি এর প্রতিবাদ করবেন না! এখন কেন আপনার এটার পক্ষে দাঁড়ানো উচিত? কারণ আপনি জয়নাব ও হারিয়ে যাওয়া প্রত্যেক নিষ্পাপ প্রাণের কাছে ঋণী। বিচারের জন্য এখনই সোচ্চার হন!’

ইসলামাবাদের আব্দুল হাদি লিখেছেন, ‘এই জঘন্য অপরাধের আসলেই বিচারের কোনও পথ আছে? না নেই। এমনকি ছোট্ট জয়নাবের সঙ্গে এমন অপরাধের জন্যও অপরাধীদের জন্য কোন বড় শাস্তি হবে না। মানুষ আনন্দের জন্য জীবন নিতে পারে এটা জেনে হয়তো তার নিষ্পাপ চোখ দুটি ভয় পেয়েছিল। পশুরাও এই বর্বরদের চেয়ে বেশি মানবিক।’
ব্লগার, সাংবাদিক রাজনৈতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়েছেন প্রতিবাদে

পাকিস্তানের চাকওয়াল থেকে ফারহান বশির লিখেছেন, ‘আমি মানুষ দেখি কিন্তু আর মানবতা দেখতে পাই না। আমি জয়নাবের বিচার দাবি করছি। শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে। আমাদের তার বিচার আদায় করতে হবে। এটা কাসুরে প্রথম শিশুধর্ষণের ঘটনা নয়। তার হত্যাকারীদের অবশ্যই প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে।’

 



/আরএ/বিএ/

লাইভ

টপ