জয়নাবের মৃত্যু কি পাকিস্তানের অন্য শিশুদের সুরক্ষা দেবে?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২২:১১, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৫, জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

পাঞ্জাবে ৬ বছরের শিশু জয়নাবকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় পাকিস্তানিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠলেও দেশটিতে শিশু নির্যাতন বন্ধ কীভাবে বন্ধ হবে, আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে চলছে আলোচনা। এ বিষয়ে পাকিস্তানি লেখক ও কলামিস্ট রাফিয়া জাকারিয়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এ নিজের অভিমত তুলে ধরেছেন। বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য অভিমতটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো-

পাকিস্তানি লেখক রাফিয়া জাকারিয়া

পাঞ্জাবের কাসুরে ৬ বছরের শিশু জয়নাব আমিনকে ধর্ষণের পর হত্যার বিচারের দাবিতে এখন উত্তাল পাকিস্তান। ময়লার স্তূপে শিশুটির মরদেহ পাওয়ার এক সপ্তাহ পার হলেও এখনও পর্যন্ত এর প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদী জনতার দাবি  শুধু অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এ ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে কর্মকর্তাদের পদত্যাগও দাবি করছেন তারা। টেলিভিশনের টক শো থেকে শুরু করে রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একই সুর। প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর পাকিস্তানজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ‘জাস্টিস_ফর_জয়নাব’ হ্যাশট্যাগটি।

ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খুন হওয়ার আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ছয় বছরের শিশুটি। বিকৃত যৌন অত্যাচারের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে তাকে। তার জিহ্বা আটকে ছিল দাঁতের মধ্যে।

পুলিশের নথি বলছে, গত এক বছরে জয়নাবের বাড়ির দুই কিলোমিটারের মধ্যে এমন আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। জয়নাব ছিলো এমন ঘটনার ১২তম শিকার। এই ১২ জনের মধ্যে ১১ জনকেই হত্যা করা হয়েছে। বেঁচে গেছে একজন। সর্বশেষ এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাকিস্তানজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। কিন্তু জয়নাবের মতো অন্য শিশুরা যে যৌন সন্ত্রাস থেকে রেহাই পাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই।

এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত শিক্ষা তো দূরের কথা; পাকিস্তানের পাঠ্যক্রমে সামগ্রিকভাবেই যৌন শিক্ষার মতো কোনও বিষয় নেই।

জয়নাব হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামে শিশুরাও

২০০৯ সালের ইউনেসকো’র যৌন শিক্ষা বিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়, সঠিক জ্ঞান ছাড়া বিশেষ করে স্কুলের পাঠ্যক্রমে এ সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত না থাকলে তা কম বয়সীদের অরক্ষিত করে তুলবে। এমনকি পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরের বেসরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরাও অবাঞ্ছিত স্পর্শ থেকে নিজেকে রক্ষা করার শিক্ষা পায় না। শিক্ষকরাও অন্যের অবাঞ্ছিত শিকারে পরিণত হওয়ার আগাম ইঙ্গিত বা সংকেত বোঝার শিক্ষা দেন না। প্রকাশ্যে যৌন বিষয় নিয়ে কথা বলার ওপর বিধিনিষেধ, যৌন শিক্ষা ও শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের মতো ব্যাপারগুলোকে আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা ভুক্তভোগীর লজ্জার অনুভূতিকে জটিল করে তোলে। সংগত কারণেই এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জানানোর প্রবণতা কমে যায়।

পাকিস্তানে শিশুদের অধিকার ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করে থাকে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সাহিল। এই প্রতিষ্ঠানটিসহ অন্যরাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের উপর ভিত্তি করেই তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। কারণ দেশটিতে শিশু নির্যাতন বিষয়ে জাতীয়ভাবে কোনও তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। দেশটিতে সাধারণভাবে শিশু নির্যাতন আছে বলেই স্বীকার করা হয় না। তাই তা ঠেকাতেও কোনও অর্থ বা জনবল বরাদ্দ করা হয় না।

পাকিস্তানের শহর এলাকায় বিত্তশালী ভুক্তভোগীরা মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সেবা পেলেও গ্রামাঞ্চলের ৭৬ শতাংশ মামলায় পুনর্বাসনের কোনও সুযোগই নেই। জয়নাবকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে কিন্তু যারা বেঁচে যায় বা বেঁচে আছে তাদের চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা নেই।

জয়নাব হত্যাকাণ্ডের মতো বিশেষ মামলায় মনযোগ দিলেও সমাজ বা সরকারের কাছে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কোনও শিক্ষার মূল্য নেই। দেশটিতে শিশু, শিক্ষক বা চিকিৎসকদেরও এ ব্যাপারে কোনও শিক্ষা দেওয়া হয় না। পাকিস্তানে শুধু ২০১৬ সালেই শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের চার হাজারের বেশি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনাও রয়েছে। পাকিস্তানে এসব নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের লিপিবদ্ধকরণ বা পুনর্বাসনের কোনও উদ্যোগই নেই। এ কারণে নির্যাতনের ঘটনা থামছে না।

পাকিস্তানে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন অপরাধ হলেও বিষয়গুলো তদন্ত করার কোনও উপকরণ বা সফলভাবে বিচার করার উপায়ও নেই। এমনকি অভিযোগ দায়েরের পরও সবসময় অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করা যায় না। দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখানে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনসহ সব ধরনের নির্যাতনের ঘটনা বাড়িয়েছে।

পাকিস্তানে শিশু নির্যাতনের কোনও নতুন ঘটনা নয়। সেখানে ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা ঘটছে। ২০১৬ সালে দেশটিতে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ১৪১টি ঘটনা ঘটে। তার আগের বছর দেশটিতে দুইশ’র বেশি শিশুকে যৌন নির্যাতন করা হয়। এমনকি এসব ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা বিক্রি করার ঘটনাও ঘটেছে। জয়নাবের মতো অনেক ঘটনায় বিক্ষোভ হলেও জনগণ খুব দ্রুতই তা ভুলে গেছে।

পাকিস্তানে শিশুদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা সব সময়েই বেশি

যৌন শিক্ষার অনুপস্থিতি ছাড়াও যৌন সহিংসতার মামলাগুলোতে দোষীদের বিচারে আইনি সীমাবদ্ধতা থাকাও পাকিস্তানে অপরাধটি বন্ধে অন্যতম প্রতিবন্ধক। ২০১৬ সালে সংশোধিত দণ্ডবিধিতে শিশু নির্যাতনের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে শিশু পর্নোগ্রাফি ও ধর্ষণের মতো অপরাধও রয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কম বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় ডিএনএ পরীক্ষার মতো ফরেনসিক পদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে। এছাড়া ভুক্তভোগীর বয়স নির্ধারণের জন্যও বিষয়টির প্রয়োজন পড়ে। পাকিস্তানে বিশেষ করে সেখানকার গ্রামাঞ্চলে এই সুবিধাটি পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া এসব ঘটনায় অভিযুক্ত অপরাধীদের খুব কমই সাজা হয়।

লজ্জার সংস্কৃতি থাকায় পাকিস্তানে এসব ঘটনা নিয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলা হয় না। শিশু নির্যাতনকারীরা লোকজনের এমন অনীহার কারণে সুযোগ পেয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নীরবতা ও অবহেলার কারণে অপরাধীদের ব্যক্তিগতভাবেই দায়মুক্তি দেওয়া হয়।

জয়নাব আমিনের এমন নৃশংস ও হৃদয়বিদারক পরিণতি হয়তো আরও কয়েকদিন সবার মনযোগের কেন্দ্রে থাকবে। কিন্তু শিশুদের শিক্ষা দেওয়া ও জানানোর বিষয়ে অনীহা দূর না হলে, নির্যাতিতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা গেলে, হাজার হাজার মামলা তদন্তের জন্য উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে জয়নাবের মতো আরও অনেক শিশুর জীবন বিপন্ন হবে।

 

 

/এমপি/আরএ/এএ/

লাইভ

টপ