ভারতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করতে চায় সরকার

Send
আশিষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ০২:১১, জুলাই ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:১৫, জুলাই ১৪, ২০১৮

হঠাৎ করেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। আর এতে ভারতজুড়ে রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সবাই হঠাৎ করেই সহজ-সরল জীবনের সুখ ও আনন্দের বিষয়টি পুনরায় আবিষ্কার করছেন। অনেকে মনে করছেন, নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে সরকার ও রাজনীতিকদের এমন ভূমিকা নেওয়াটা স্বাভাবিক। তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে না।

সম্প্রতি ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত তার বাহিনীর কিছু অমিতব্যায়ী কর্মকাণ্ড ও অভ্যাসের সমালোচনা করেন। এটা তার জন্যই একটা বড় ধরনের বিস্ময়। সাধারণত প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জানার বাইরে থাকে। তবে এবার তা প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। আবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। এমনকি তিনি সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যয় কমানোর জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১১ সালে ক্ষমতা নেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এসে নিজের এমন কঠোর অবস্থানের কথা বললেন। উত্তরবঙ্গের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‌‘আমি আর একটি টাকাও অপচয় হতে দেবো না।’ ওই সময় তার সামনে বসে থাকা সরকারি কর্মকর্তারা মাথা নিচু করে বসেছিলেন।

সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করার জন্য কেন্দ্রের চাপের কারণেই মমতা এই কথা বলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ২০১১ সালে ক্ষমতা নেওয়ার সময় রাজ্য সরকার কেন্দ্র সরকারের কাছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি রুপি ঋণী ছিল যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি রুপি। মমতা সরকারিভাবে নিজের সফলতার বয়ান দিতেই কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন। সেই মমতার এমন উল্টোমুখী হয়ে ওঠার কারণেই বিষয়টি মানুষকে চিন্তা করতে বাধ্য করছে।

দিল্লি থেকে ঋণ শোধ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের ওপর তেমন কোনও চাপও দেওয়া হয় না।  তারা শুধু বিদ্যমান ঋণের সুদের অর্থ নিয়ে যায়। মমতার ক্ষমতার শুরুতে যা ছিল ২৬ হাজার কোটি রুপি আর এখন তা ৪০ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। মমতা কেন্দ্রের এই সুদকে ‘‌বাংলাকে কেন্দ্রের বঞ্চনা’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। তার দাবি, দিল্লিকে অবশ্যই এই ঋণ মওকুফ করতে হবে। ঋণ নিয়ে এতদিন ধরে চাপে থাকলেও মমতা কোনও কথা বলেননি। তাহলে এখন হঠাৎ এমন বলার কারণ খুঁজেছেন অনেকে।

 

সেনাপ্রধান জেনারেল রাওয়াতের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তিনি বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য অযথা ব্যয়ের দিকে খেয়াল রাখছেন। অভ্যন্তরীণ সেনা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সব ইউনিটকে জানানোও হয়েছে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যেই তিনি এই নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্নীতির বিষয়ে রাওয়াল বিপিন বলেছেন, ঘুষের মতো অপরাধগুলো কঠোর হস্তে দমন করা হবে। এছাড়া  খুব অল্পমাত্রায় অপচয়ের খবর পাওয়া গেলেও সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় স্টোর ডিপার্টমেন্ট থেকে পানীয় ও অন্যান্য পণ্যেরও কোনও অপচয় না করার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের সেনা প্রধান।

ভারতীয় সেনা বাহিনীর মধ্যে নৈতিক স্খলনের ঘটনা বাড়ায় তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চাতুরির আশ্রয় নেওয়া কর্মকর্তাদের তিনি ক্যারিয়ারের প্রতি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। ঘুষ বা এই জাতীয় অপরাধের জন্য কারও চাকরি গেলে পেনশনের অর্থও পরিশোধ করা হবে না বলে সতর্ক করে দেন তিনি।

সেনা প্রধানের এই বক্তব্যের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এমন সতর্কতা সেনাবাহিনীতে নতুন কিছু নয়। এর আগেও এই ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যামান আইনেই এসব সতর্কতার বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। তবে লোকজন বলছে, জেনারেল বিপিন রাওয়াতের এই কথা পুনর্ব্যক্ত করার অবশ্যই কোনও কারণ আছে। কারণ এ ধরনের পদক্ষেপের আশঙ্কা ছাড়া কেউ এটা বলতে যাবে না। এটাকে বিশ্বের যেকোনও প্রতিরক্ষা প্রশাসনের জন্য অবশ্যই একটি অনন্য পর্যবেক্ষণ।

বিপিনের এই বক্তব্য একেক এলাকার সেনা একেকভাবে নিয়েছেন। উত্তর ভারতীয় সেনারা ভেবেছেন তাদের পুরি ভাজি ও চিকেন পাকোরা খেতে নিষেধ করা হয়েছে। দক্ষিণের সেনা মনে করছেন, তারা মচমচে দোসা ও বাঙালি সেনারা রসগোল্লা খেতে পারবে না। এমনকি বিপিন রাওয়াত ২০১৮ সালে আর কোনও সেনা সমাবেশও করবেন না বলে চিন্তা করেছেন। তবে তা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।  

কলকাতাভিত্তিক একজন বিশ্লেষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, রাওয়াতের চিন্তাগুলো অবশ্যই সেনাদের মধ্যে একটি শুভ চেতনা জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু সম্ভবত যা করতে পারবেন তার চেয়ে বেশি বলে ফেলেছেন। সাবেক প্রধান আয়কর কমিশনার অরবিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, রাওয়াতের একটি বার্তা সামাজিক মাধমে ছড়িয়ে পড়েছে। বার্তাটি হলো, উচ্চ পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ চিহ্নিত করার জন্য ১৯৮৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর জন্য আয়কর বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

অরবিন্দ আরও বলেন, তবে ওই সময় সফলতার হার ছিল খুবই কম। দোষীদের কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। আর এক্ষেত্রে এক শতাংশেরই কম বিষয়ে সফল হওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, অবসরে পাঠানোদেরও কয়েকজন আবার বীরদর্পে ফিরে এসে দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার পাহাড় গড়া অব্যাহত রাখেন। ওই সময় কেন্দ্রীয় এক মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তদন্ত দলের প্রধানকে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। ২০০৪ সালের মারা যাওয়ার আগে ওই কর্মকর্তাকে বেশ কয়েকবার হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।

অরবিন্দ বলেন, ৭৬ বছর বয়সী সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে রাওয়াতের অভিযানের সফলতা কামনা করছি। তবে তিনি সতর্ক দিয়ে বলেন, ভারতীয়দের ডিএনএ’র মধ্যে দুর্নীতি রয়েছে। তাই এর বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে তা অনেক কষ্টসাধ্য হবে।

 

/আরএ/এআর/

লাইভ

টপ