৭১-এর গণহত্যার ছবি ব্যবহার করে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

বিদেশ ডেস্ক
৩১ আগস্ট ২০১৮, ১২:৪০আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৪৫
image

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের ওপর সংঘটিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার ছবিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা কর্তৃক বৌদ্ধ নিধনের ছবি হিসেবে প্রচার করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। নতুন করে রচিত একটি বইতে ছবিটিকে এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটিতে ব্যবহৃত আটটি ঐতিহাসিক ছবি বিশ্লেষণ করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এগুলোর মধ্যে তিনটি ছবি ভুয়া। ছবি বিকৃত করে ও ভুয়া ক্যাপশন দিয়ে এগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। রোহিঙ্গা নিধনকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের চেষ্টায় ভুয়া ছবি আর বানোয়াট তথ্য দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বইটি রচনা করেছে বলে মনে করছে আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

গত বছরের আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই অভিযানে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আলামত পেয়েছে। তবে শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। উল্টো রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে তাদের। এবার মিয়ানমার সেনাবাহিনী প্রকাশিত নতুন একটি বইতেও সে প্রচেষ্টা দেখা গেছে। 

একাত্তরের গণহত্যার ছবিকে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণায় মিয়ানমার ‘মিয়ানমার পলিটিক্স অ্যান্ড টাটমাডো: পার্ট ওয়ান’ নামের ১১৭ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশিত হয়েছে গত জুলাইয়ে। মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের বুক স্টোরগুলোতে বইটি বিক্রি হচ্ছে। বইয়ে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গেছে, এক ব্যক্তি কৃষিকাজে ব্যবহৃত একটি সরঞ্জাম নিয়ে দুইটি মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্যাপশনে এটিকে রাখাইনের ছবি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবি করা হয়, ১৯৪০ এর দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় রোহিঙ্গা কর্তৃক বৌদ্ধদের হত্যার ছবি এটি। বরাবরের মতোই রোহিঙ্গাদেরকে এখানে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ১৯৪০ এর দশকে মিয়ানমারে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে লেখা অংশে ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে। তবে ছবিটি বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, সাদা-কালো এ ছবিটি বাংলাদেশের। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার ছবি এটি।

আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, অসংখ্য মানুষ লং মার্চ করে করে যাচ্ছে। ওই ছবির বর্ণনায় বলা হয়েছে: মিয়ানমারের নিম্নাঞ্চলীয় এলাকা ব্রিটিশ উপনিবেশের দখলে যাওয়ার পর বাঙালিরা মিয়ানমারে অনুপ্রবেশ করে। মূলত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টায় ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে। তবে ছবি বিশ্লেষণ করে রয়টার্স বলছে, ১৯৯৬ সালে রুয়ান্ডা গণহত্যা থেকে বাঁচতে তানজানিয়ায় পালাতে থাকা শরণার্থীদের ছবি এটি। রঙিন ছবিটিকে সাদা-কালো রূপ দেওয়া হয়েছে সেখানে। মূল ছবিটি তুলেছিলেন মারথা রিয়াল। পিটসবার্গ পোস্ট গেজেট পত্রিকার জন্য ছবিটি তুলেছিলেন তিনি।

রুয়ান্ডার ছবির রঙ পরিবর্তন করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ছবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে
ওই বইয়ে সাদা-কালো আরও একটি ভুয়া ছবি শনাক্ত করেছে রয়টার্স। ওই ছবিতে দেখা গেছে, একটি নৌকাভর্তি মানুষ। এর ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, পানি পথ দিয়ে বাঙালিরা মিয়ানমারে প্রবেশ করছে। তবে রয়টার্স বলছে, মূল ছবিটি প্রবেশের নয়, বের হওয়ার। ২০১৫ সালে বাংলাদেশি অভিবাসী ও রোহিঙ্গারা নৌপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় ইয়াঙ্গুনের কাছে দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল থেকে নৌকাটি আটক করেছিল মিয়ানমারের নৌবাহিনী। মূল রঙিন ছবিটিকে উল্টে দিয়ে এবং রঙ পরিবর্তন করে এমন করা হয়েছে।

২০১৫ সালে মিয়ানমার থেকে নৌকায় করে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের ছবিটিকে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশের ছবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে
বইটিতে সব মিলিয়ে ৮০টি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যার মধ্যে আটটি ঐতিহাসিক ছবি। রয়টার্স কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ ও টিন আই টুল ব্যবহার করে ছবিগুলো পরীক্ষা করেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ছবিগুলোর ব্যাপারে কথা বলতে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হতে ও সেনা মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। আর তথ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব উ মিয়ো মিন্ত মং বইটি পড়েননি দাবি করে এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বইটির লেখক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিয়াও ও বইয়ের ভূমিকায় বলেছেন, ‘বাঙালিদের ইতিহাস প্রকাশ’ করার লক্ষ্যে এটিতে কিছু ডকুমেন্টারি ছবি যুক্ত করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদেরকে বাঙালি উল্লেখ করে সেখানে লেখা হয়, ‘মিয়ানমারে যখনই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয় কিংবা জাতিগত সশস্ত্র সংঘাত হয় তখনই এ বাঙালিরা একে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে।’

লেখক কিয়াও ও এর সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

/এফইউ/
সম্পর্কিত
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
সর্বশেষ খবর
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী