উইকিলিকসের কোনও দোষ হয়নি: ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবির!

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৪২, অক্টোবর ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৬, অক্টোবর ১২, ২০১৮

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবিরের পক্ষ থেকে আদালতের নোটিশের জবাবে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ান হ্যাকারদের ফাঁস করা ইমেইলগুলো প্রকাশের জন্য উইকিলিকস ওয়েবসাইটকে দায়ী করা যায় না। কারণ উইকিলিকস গুগল-ফেসবুকের মতোই একটি ওয়েবসাইট যা অন্যের প্রকাশিত তথ্য উপস্থাপন করে। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ফাঁস হয়ে যাওয়া ইমেইলের বিষয়ে করা এক মামলার প্রেক্ষিতে আদালতের নোটিশের জবাব দিতে হলো তাদের। আর আইনি এই জবাবে উঠে এলো ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের গভীর পার্থক্যের চিত্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, রুশ সংশ্লিষ্টতার দায় এড়াতে নির্বাচনি প্রচারণা শিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উইকিলিকসকে নির্দোষ দাবি করার মধ্যে দিয়ে নিজেদেরও নির্দোষ প্রমাণের কৌশল গ্রহণ করেছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, কিন্তু এই কৌশল কাজ করবে কি না তা নিয়ে বিশ্লেষকরা সন্দিহান। পেন্টাগনের সঙ্গে কাজ করা একজন সাবেক কৌসুলি যুক্তি দিয়েছেন, উইকিলিকস যেহেতু চুরি হওয়া ইমেইল প্রকাশের সময় নির্ধারণ করেছিল, সেহেতু তারা ‘প্যাসিভ পাবলিশার’ হিসেবে আইনি সুরক্ষা নাও পেতে পারে।

রবার্ট মুলারের নেতৃত্বে যে তদন্ত চলছে তার মূল বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার কোনও গোপন আঁতাত হয়েছিল তা খতিয়ে দেখা। ওই নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। রাশিয়ার হ্যাকাররা তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ইমেইলগুলো চুরি করে। বিশ্বজুড়ে গোপন নথি ফাঁস করা আলোচিত বিকল্পধারার সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস সেই ইমেইলগুলোর কপি প্রকাশ করে।। উইকিলিকসের প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এখন যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ইকুয়েডরের দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন। তার ধারণা, সেখান থেকে বের হলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

হিলারি ক্লিনটনের দুইজন সমর্থক ও ডেমোক্র্যাট পার্টির একজন কর্মকর্তার করা মামলার প্রেক্ষিতে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবিরের পক্ষ থেকে আদালতকে দেওয়া জবাবে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবিরের সঙ্গে উইকিলিকসের কোনও সমঝোতা ছিল না হিলারি ক্লিনটনের ফাঁস হওয়া ইমেইলগুলো প্রকাশ করার বিষয়ে। উইকিলিকস যেখান থেকে পেয়েই সেগুলো প্রকাশ করুক না কেন তার জন্য ওয়েবসাইটটিকে দায়ী করা যায় না। কারণ তাদের কাজ বেআইনি নয়।

গার্ডিয়ান মনে করে, মামলার মুখে পড়ে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবিরের পক্ষ থেকে যে জবাব লিখে পাঠানো হয়েছে আদালতের কাছে, তা বিস্ময়কর। কারণ তা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থানের বিপরীত। বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন গোপন নথি ফাঁসের দায়ে উইকিলিকসের সমালোচনা করে আসছে। ট্রাম্পের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সিআইএর পরিচালক থাকাকালে উইকিলিকসকে ‘বেসরকারি শত্রুপক্ষীয় গোয়েন্দা সংস্থা’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে মার্কিন নাগরিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তার দাবি, উইকিলিকস রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবিরের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে এমন হলফনামা দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রুশ সংশ্লিষ্টতার দায় থেকে বাঁচতে হোয়াইট হাউজ বা প্রচারণা শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কীভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন তার একটা পূর্বাভাস পাওয়া যায় এ থেকে। তাদের মূল যুক্তিটি হবে এরকম: উইকিলিকস ফাঁস হওয়া ইমেইল প্রকাশ করে কোনও বেআইনি কাজ করেনি। সুতরাং তাদর সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটাও কোনও অপরাধ নয়!

আদালতকে পাঠানো জবাবটিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেছেন বিশ্লেষকরা। ওই জবাবে মার্কিন সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় থাকা সুরক্ষার দোহাই দেওয়া হয়েছে। ‘ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের’ কথা উল্লেখ করে তারা যুক্তি দিয়েছেন, যদি কোনও চুরি করা তথ্য ফাঁসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থেকেও থাকে তাহলেও তা প্রকাশ করা তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা নিজেরাই চুরির সঙ্গে জড়িত হয়। তাদের ভাষ্য, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি করা ইমেইলগুলো ‘জনস্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে গিয়ে তাদের আইনজীবী যুক্তরাষ্ট্রের ‘কমিউনিকেশন ডিফেন্স অ্যাক্টের’ প্রসঙ্গ তুলেছেন। ওই আইনের ধারায় বলা হয়েছে, গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবের মতো বড় ওয়েবসাইটগুলো ‘প্যাসিভ পাবলিশার’ হিসেবে স্বীকৃত হবে। অন্য কারও প্রকাশিত তথ্য সেখানে প্রকাশিত হলে তার জন্য তারা দায়ী থাকবে না। ট্রাম্পের আইনজীবীর দাবি, উইকিলিকসও সেরকম একটি ওয়েবসাইট। যারা একপক্ষের (হ্যাকারদের) চুরি করা অপরপক্ষের (হিলারি ক্লিনটনের) ইমেইলগুলো প্রকাশ করেছে মাত্র। এর জন্য তাদের দায়ী করা যায় না।

ট্রাম্পের সঙ্গে রুশ আঁতাতের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কাজ করে যাচ্ছেন বিশেষ তদন্তকারী রবার্ট মুলার। সর্বশেষ তার তদন্তে ১২ জন রুশ হ্যাকারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে হিলারি ক্লিনটনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার অভিযোগে। সেই তদন্ত থেকেই উইকিলিকসের বিষয়ে নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। মুলারের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত রুশ ‘ষড়যন্ত্রকারীরা’ ফাঁস করা ইমেইলগুলো ‘প্রতিষ্ঠান ১’ নামের কাউকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ‘প্রতিষ্ঠান এক’ বলতে তারা উইকিলিকসকেই বুঝিয়েছে। তারা চেয়েছিল, উইকিলিকসের মাধ্যমে ইমেইলগুলো ফাঁস করাতে, যাতে ২০১৬ সালের নির্বাচনে গভীর প্রভাব বিস্তার করা যায়।

কিন্তু আদৌ কি উইকিলিকস ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগের বদলে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবের মতো ‘প্যাসিভ পাবলিশারের’ স্বীকৃতি পেতে পারে? এ বিষয়ে মার্কিন সেনা সদর দপ্তর পেন্টাগনের সাবেক বিশেষ আইনজীবী রায়ান গুডম্যান বলেছেন, মুলারের তদন্তে থেকে এটা বেরিয়ে এসেছে যে উইকিলিকস ওই ইমেইলগুলো সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত ছিল। যেহেতু তারা ইমেইলগুলো ঠিক কখন প্রকাশ করা হবে তা নির্ধারণ করেছিল, সেহেতু ‘প্যাসিভ পাবলিশার’ হিসেবে কমিউনিকেশন অ্যাক্টের আওতায় তারা সুরক্ষা পেতে পারে কি না তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

/এএমএ/

লাইভ

টপ