বাবরি মসজিদের নিচে মন্দিরের নিদর্শন নেই: পর্যবেক্ষণকারী প্রত্নতত্ত্ববিদ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৩৭, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৮, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

ভারতের ডানপন্থী কট্টর হিন্দুদের দাবি, অযোধ্যায় দেবতা রামের জন্মস্থানে থাকা মন্দির ভেঙে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত হয় বাবরি মসজিদ। ২০০৩ সালের আগস্টে এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (এএসআই) ছয় মাস খনন শেষে ওই মতে সমর্থন দেয়। ওই সময়ে অযোধ্যা মামলার অন্যতম পক্ষ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের হয়ে খনন কাজ পর্যবেক্ষণকারী দুই প্রত্নতত্ত্ববিদ অবশ্য এই মতের বিরোধিতা করেছিলেন। আদালতে তারা বলেন, বাবরি মসজিদের নিচে মন্দির থাকার কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০১০ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে এএসআই’র ব্যবহৃত খনন পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করেন ওই দুই প্রত্নতাত্ত্বিক। বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ২৬তম বার্ষিকী উপলক্ষে হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এদেরই এক প্রত্নতাত্ত্বিক সুপ্রিয়া ভার্মা নিজেদের দাবির পক্ষে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নিয়ে কথা বলেছেন। এসব প্রমাণের ভিত্তিতেই তিনি মনে করেন, নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছিল এএসআই।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ডানপন্থী কট্টর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দিলে ভারতজুড়ে সৃষ্ট দাঙ্গায় প্রাণ হারায় কয়েক হাজার মানুষ। মসজিদ বিতর্ক নিয়ে মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ওই মামলা এখনও ভারতের আদালতে চলছে। এলাহাবাদ উচ্চ আদালতের নির্দেশে ওই স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালায় এএসআই। আর তা সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের হয়ে পর্যবেক্ষণ করেন দুই প্রত্নতত্ত্ববিদ জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুপ্রিয়া ভার্মা ও শিব নদর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান জয়া মেনন। এএসআই’র বিরুদ্ধে পূর্বকল্পিত খনন, নৈতিকতা ও কার্যপদ্ধতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। তারা বলছেন তৎকালীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স সরকারের অধীনে থাকা এএসআই ডানপন্থী হিন্দুদের বয়ান প্রতিষ্ঠার চাপে ছিল। ওই বয়ানে বলা হয়ে থাকে, মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মির বাকি হিন্দু দেবতা রামের জন্মস্থানে নির্মিত মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়ে মসজিদ স্থাপন করেন।

এছাড়াও সুপ্রিয়া ভার্মা বিআর মানির নেতৃত্বে পরিচালিত ওই খনন কাজের পদ্ধতিগত ঘাটতিও নিয়ে কথা বলেছেন। ওই সময়ে এলাহাবাদ উচ্চ আদালতের নির্দেশে পরে সরিয়ে দেওয়া হয় বিআর মানিকে। ২০১৬ সালে মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তাকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়ারে প্রশ্নের উত্তরে সুপ্রিয়া বলেন, আজ পর্যন্ত বাবরি মসজিদের নিচে মন্দির থাকার কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নেই। তাহলে কোন প্রমাণের ভিত্তিতে এএসআই সেখানে মন্দির থাকার দাবি করেছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনটি জিনিসের ওপর ভিত্তি করে তারা এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। প্রথমটি হচ্ছে পশ্চিমের দেওয়াল, দ্বিতীয়টি হচ্ছে ৫০ পিলারের ভিত্তি এবং তৃতীয়টি হচ্ছে স্থাপত্য নিদর্শন। তবে এগুলোর কোনোটিই মসজিদের নিচে মন্দির থাকার প্রমাণ দেয় না বলে মত দেন তিনি।

সুপ্রিয়া বলেন, পশ্চিমের দেওয়ালটি মসজিদের একটি অংশ। এটা এমন একটা দেওয়াল যার সামনে নামাজ পড়া যায়। এটা মন্দিরের অংশ হতে পারে না। মন্দিরের নকশা আলাদা হয়। বাবরি মসজিদের নিচে আসলে আরেকটি পুরাতন মসজিদ ছিল। এছাড়া এসব পিলার নিয়ে যে ধারণার কথা বলা হয়েছে তা মনগড়া আকারে তৈরি করা হয়েছে। আর আদালতে এ নিয়ে আমরা বহু অভিযোগ জানিয়েছি। আমাদের দাবি ছিল পিলারের ভিত হিসেবে যেগুলোকে বলা হচ্ছে তা আসলে ভাঙা ইট আর তার মধ্যে রয়েছে মাটি। এর ওপরে কোনও পিলার তৈরি হতে পারে না, তা খুবই ভঙ্গুর। এটা সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তারা চাইছিল প্রতিবেদনে বলা হোক এগুলো পিলারের ভিত্তি আর প্রতিবেদনে সেটাই বলা হলো। এসব পিলার ও মসজিদের বিভিন্ন স্তর ১২শ থেকে ১৫শ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন সুপ্রিয়া।

এছাড়া স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর বিষয়ে সুপ্রিয়া বলেন, এরকম চারশ’ থেকে পাঁচশ’ নিদর্শন পাওয়া গেছে। যা একটি স্থাপত্য ভবনের টুকরো। এসবের মধ্যে ১২টিকে তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছে। এই ১২টি নিদর্শনের কোনাটিই খননের সময়ে পাওয়া যায়নি। এগুলো মসজিদের চুনের স্তরের নিচে পাওয়া গিয়েছিল। এসব নিদর্শনের মধ্যে ছিল একটি বিশেষ মূর্তি, যা কোনও প্রতিকৃতির কাছাকাছি কিছু একটা। এটাকেই তারা ‘স্বর্গীয় যুগল’ আখ্যা দেয়। তবে সেটা শুধুই একটা পুরুষ ও নারীর আধভাঙ্গা মূর্তি। এছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের দাবি অনুযায়ী পাথরের তৈরি একটি মন্দির হলে সেখানে এর চেয়ে অনেক বেশি নিদর্শন পাওয়ার কথা। এই মূর্তির কোনও সময় নির্ণয় হয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিয়া বলেন, পাথরের সময় নির্ণয় করা যায় না। প্রত্নতত্ত্বে যার সময় নির্ণয় করা যায় তা হলো এটি কখন স্থাপন করা হয়েছিল। কোন স্তরে নিদর্শনটি পাওয়া গেছে তার ওপর ভিত্তি করেই এটি নির্ণয় করা হয়। এছাড়া জৈব নিদর্শনের সময় নির্ণয় করা সম্ভব। যেমন হাড়, খোলস বা কয়লা। তবু এএসআই বেশ কিছু জিনিসের সময় নির্ণয় করেছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট এই মূর্তিটি কোনও স্তরীকৃত এলাকায়ও পাওয়া যায়নি। এটা যেকোনও জায়গা থেকে আসতে পারে। এর সময় নির্ণয় সম্ভব না। অন্যভাবে বলা যায়, মন্দির থাকার কোনও প্রমাণ নেই।

সুপ্রিয়া বলেন, মসজিদের নিচে মন্দিরটি কখনো ছিল বলে দাবি করেছে এএসআই? এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিয়া বলেন, তারা এই প্রশ্নের কোনও জবাব দেয়নি। তারা শুধু বলেছে মসজিদের নিচে মন্দির ছিল। তবে কখন এটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা তারা জানায়নি।

ওই প্রতিবেদনে মন্দিরটি দশম শতাব্দীতে নির্মিত বলে যে দাবি উঠেছে তা কীভাবে হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিয়া বলেন, তাদের দাবি ৫০টি ভিত্তি পিলারের বিশাল এক মন্দির ছিল। তবে তাদের দাবি এটাও ছিল যে এসব ভিত্তি পিলারের নিচে নির্দিষ্ট একটি মন্দির ছিল। যেটি অনেক ছোট, মাত্র তিন থেকে চার মিটার ব্যাসের। এটাকেই দশম শতাব্দীতে নির্মিত বলে দাবি করছে তারা। তবে আমি এই বৃত্তাকার কাঠামোর বাইরের দেয়াল পরীক্ষা করে দেখেছি এবং ওই সাইটের নোটবুকে নির্দিষ্ট পরিখাটির বিষয়ে উল্লেখ আছে, যাতে বলা হয়েছে এসব দেওয়াল গুপ্ত আমলের। আর এ কারণেই বৃত্তাকার এই কাঠামোটি চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যকার গুপ্ত আমলের হতে পারে।

/জেজে/এমওএফ/

লাইভ

টপ