‘পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ভারতের যুক্ত থাকার কোনও কারণই ছিল না’

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০৭:৫০, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০১, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী দশ বছর আগে ঢাকায় তদানীন্তন বিডিআরের সদর দফতর পিলখানায় যে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহু কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন, সেই ঘটনায় কোনও কোনও মহল থেকে প্রতিবেশী ভারতের দিকে আঙুল তোলার চেষ্টা হয়ে আসছে অনেক দিন ধরেই। তবে সেসময় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ওই অভিযোগ নস্যাৎ করে বলেন, ওই হামলায় ভারতের জড়িত থাকার কোনও প্রশ্নই নেই– কারণ সব দিক থেকেই ওই ঘটনা ছিল ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী।

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক ভারতীয় এই কূটনীতিবিদ আরও দাবি করেন, তখন সদ্য ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা সরকারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকেই বিডিআর বিদ্রোহে মদত দেওয়া হয়েছিল, এবং এমনটি মনে করার যথেষ্ঠ কারণ আছে।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানাতে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের হাতে বাহিনীর মহাপরিচালক শাকিল আহমেদসহ শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন। মেরে ফেলা হয়েছিল তাদের পরিবারের অনেক সদস্যকেও। ওই ঘটনার  পর বিএনপি ও জামায়াত বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এ ট্র্যাজেডির জন্য সরাসরি ভারতকে দায়ী করে বিবৃতি দেন। পুরানো সংবাদ পত্রে দেখা যায়, বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা জামায়াতের আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো অনেক নেতাই তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে চিরতরে দুর্বল করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই ভারত এই পিলখানার কাণ্ড ঘটিয়েছে। তখন ওই দুই নেতাই জেলের বাইরে, পরে অবশ্য একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাদের দুজনেরই ফাঁসি হয়েছে। তবে বিএনপি বা জামায়াতপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলোতে বরাবরই পিলখানা ট্র্যাজেডির জন্য ভারতকেই দায়ী করে আসছে। আর সেই প্রবণতা আজও অক্ষুণ্ন আছে।

এই পটভূমিতেই বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয়েছে সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর, যিনি ওই ঘটনার সময় ঢাকাতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো—

বাংলা ট্রিবিউন: পিলখানার ঘটনার ব্যাপারে আপনাদের কাছে কি কোনও গোয়েন্দা পূর্বাভাস ছিল? আপনারা কীভাবে ওই ঘটনার খবর পেয়েছিলেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী: না, এরকম কোনও গোয়েন্দা তথ্য একেবারেই ছিল না। আমরা পিলখানার খবর পেয়েছিলাম স্থানীয় টিভি চ্যানেল, রেডিও, নিউজ পোর্টাল ও খবরের কাগজগুলোর ওয়েবসাইট থেকেই। গণমাধ্যমগুলো তখন প্রতি মিনিটে ঘটনার আপডেট দিচ্ছিল। আর আমাদের হাইকমিশন তখন ছিল ধানমন্ডিতে, বেশ কিছু কর্মী যারা ওই এলাকায় ছিলেন, তারা কিন্তু পিলখানার ভেতর থেকে গোলাগুলির শব্দও শুনতে পেয়েছিলেন। ফলে প্রাথমিক খবরটা আমরা ওভাবেই পাই, আর ভেতরে যে কী সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেছে, সেটা বুঝতে কিন্তু অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। পরে শুনলাম, বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দরবারে কী সব নিয়ে কথা কাটাকাটি আর রাগারাগি হয়েছে, তারপর উত্তেজিত জওয়ানরা সোজা গুলি চালাতে শুরু করে দিয়েছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: এই ধরনের ঘটনার পর যা সাধারণত হয়ে থাকে– নানা রকমের ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ বা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব বেরিয়ে আসে। পিলখানার পরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর তার অনেকগুলোতেই ঘটনার জন্য ভারতকে দায়ী করা হচ্ছিল। আপনি সেটা নিয়ে কী বলবেন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী: দেখুন, বাংলাদেশে যারা চিরকাল ভারত বিরোধীতা করে এসেছেন, তারাই এসব আজগুবি কথা বলছিলেন, বেসিক্যালি এসব থিওরিও তারাই ছড়াচ্ছিলেন। কিন্তু একটা কথা বুঝতে হবে, এসব করিয়ে ভারতের তো কোনও লাভ ছিল না। শেখ হাসিনা সরকারকে ভারত কেনইবা খামোখা ঝামেলায় ফেলতে চাইবে? সোজা কথায়, আমাদের ওসবে যাওয়ার কোনও কারণই ছিল না। বিদ্রোহটা ছিল বিডিআরের ইন্টারনাল বা অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, জওয়ানদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও আরও নানা কারণে সেদিন অত সাংঘাতিক রক্তপাত হয়েছিল। তখন আবার এ রকমও খবর পেয়েছিলাম, বিএনপি-জামায়াত আমলে বিডিআরে তারা বহু লোককে ঢুকিয়েছিল। আর তারাই নাকি শেখ হাসিনা সরকারকে ডিস্টেবিলাইজ করার লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের সেই অনুগত লোকজনদের দিয়ে বিদ্রোহ করায়। এ রকম একটা থিওরিও কিন্তু তখন আমরা শুনেছিলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, ভারত বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দিতে চেয়েছিল, শোনা যাওয়া এ ধরনের  কনস্পিরেসি থিওরি একেবারেই ভিত্তিহীন?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী: অফ কোর্স, হান্ড্রেড পার্সেন্ট। এগুলো সম্পূর্ণ বাজে কথা। আসলে কি, আমি তো তখন ওখানে সশরীরে ছিলাম। আর এটাও খুব ভালো করেই জানতাম, আমাদের কেউ কেউ দোষারোপও করবে। কারণ, বাংলাদেশে এটা মাঝে-মাঝেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশের পলিটিক্সের ধরণটা এ রকম। ওই ঘটনার কিছুদিন আগেই বিএনপি-জামায়াতের জোট নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে হেরে যায়... ফলে ন্যাচারালি ভারতকে আক্রমণ করে তারা ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে, এটা খুবই স্বাভাবিক।

বাংলা ট্রিবিউন: যেকোনও অভিযান যারাই চালাক না-কেন, বলা হয় তার পেছনে একটা ‘মোটিভ’ বা উদ্দেশ্য অবশ্যই থাকবে। ভারতের কে এ ক্ষেত্রে কোনও মোটিভ ছিল না?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী: মোটিভ তো ছিলই না। আসলে আমি বারবার যেটা বলতে চাচ্ছি, এ ধরনের কাজ করিয়ে ভারতের কোনও স্বার্থসিদ্ধি হবে না। এটা তো যে কেউ বুঝতে পারবে। তারপরও নিছক রাজনৈতিক কারণে কেউ কেউ ভারতকে দায়ী করতে চেয়েছেন। পরে তো বোধহয় তদন্ত রিপোর্টেও পরিষ্কার হয়ে গেছে, বিডিআরের জওয়ানরা নানা কারণে ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেই ক্ষোভই তারা বুলেট ফায়ার করে উগরে দিয়েছিলেন, এটা তো সম্ভবত এতদিনে পুরোপুরি স্পষ্ট।

বাংলা ট্রিবিউন: পিলখানা ট্র্যাজেডির মাত্র মাস দেড়েক আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার শপথ নিয়েছিল। সেই নতুন সরকারকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই কি এ ঘটনা ঘটানো হয়? ভারত তখন কীভাবে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেছিল?

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী: দেখুন, সরকার তো তখন স্ট্যাবলই ছিল, শেখ হাসিনা সরকারও গড়েছিলেন বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে। কিন্তু তবু কেন আচমকা ওই ধরনের একটা কাণ্ড ঘটলো, এ প্রশ্নটা তখন অনেকেই তুলেছিলেন। এটা সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত কি না, সেই প্রশ্নটা যথারীতি উঠছিল। আর তা উঠছিল সঙ্গত কারণেই। আর একটা ব্যাপার হলো, পিলখানায় যারা মারা গিয়েছিলেন, তারা প্রায় সবাই ছিলেন আর্মি অফিসার। কাজেই সেনাবাহিনীকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে যদি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু একটা করা যেতে পারে, এমন ষড়যন্ত্র হয়তো ছিল। সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড খুবই সংবেদনশীল একটা ব্যাপার, তার রিঅ্যাকশনও সহজ হবে না— এমনটাই সম্ভবত ধারণা ছিল। পুরো ব্যাপারটা ছিল সম্ভবত দুটোরই মিশেল। একদিকে বিডিআরের ভেতরের ডিসগ্রান্টলমেন্ট বা অসন্তোষ, অন্যদিকে সেটাকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে আর্মিকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেওয়া— এ রকম কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের কেউ হয়তো পিলখানার ঘটনা ঘটিয়েছিল। এমনটি মনে করারও যথেষ্ঠ কারণ ছিল। 

/আইএ/এনআই/

লাইভ

টপ