রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে জাতিসংঘের ‘রূপরেখা’

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২০:৪৮, মার্চ ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫০, মার্চ ২৩, ২০১৯

কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করেছে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’ (ডব্লিউএফপি)। কীভাবে রোহিঙ্গাদের সেখানে নেওয়া হবে এবং নিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে তাদেরকে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে সে সংক্রান্ত রূপরেখাটির নথি পৌঁছেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে। ডব্লিউএফপি স্থানান্তরের রূপরেখা তৈরি করলেও নথিতে উল্লেখ করেছে, রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর ‘স্বেচ্ছাপ্রসূত’ হওয়া উচিত এবং রূপরেখাটি ‘ভাসানচরের বর্তমান অবস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়ন ব্যতিরেকে প্রস্তুত।’২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এমন বাস্তবতায় রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। আগে থেকে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে।
বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ভাসানচরে স্থানান্তরের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের থাকার ব্যবস্থাটি আরও বেশি গুছিয়ে আনা যাবে। কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরগুলো যে আশ্রয় প্রার্থীদের ভিড়ে উপচে পড়ছে, সে সংকটের সমাধান হতে পারে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে গেলে। কিন্তু মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, ভাসানচর পানিতে ডুবে যায়, এটি ঘূর্ণিঝড়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হলে তলিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু সম্প্রতি রয়টার্সের কাছে ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের’ (ডব্লিউএফপি) একটি নথি এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, খাদ্য সহায়তা সংক্রান্ত জাতিসংঘের এই সংস্থাটি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে একটি রূপরেখা তুলে ধরেছে। সংস্থাটি পরিকল্পনার পাশাপাশি সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় অর্থের তথ্যও উল্লেখ করেছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, তাদের ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কাছে স্থানান্তরের বিষয়টি উত্থাপন, তাদেরকে নিয়ে যাওয়া এবং ভাসান চড়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দাতাদের কাছে প্রাথমিকভাবে এক কোটি ৯০ লাখ ডলারের অনুদানচাওয়া উচিত।
রয়টার্স লিখেছে,ডব্লিউএফপি পরিকল্পনার রূপরেখা দিলেও এ পরিকল্পনাটিকে তারা ‘অল্প সময়ে তৈরি এবং ভাসানচরের বর্তমান অবস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়ন ব্যতিরেকে প্রস্তুত’ আখ্যা দিয়েছে। ‘কনসেপ্ট অব অপারেশন’ শীর্ষক ১২ মার্চের নিথিটিতে সংস্থাটির লিখেছে, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়টি যেমন রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছাপ্রসূত হওয়া উচিত, তেমনি স্থানান্তর বাস্তবায়নে মেনে চলা উচিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধি ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ডব্লিউএফপির কক্সবাজারে নিয়োজিত কমিউনিকেশন অফিসার জেমা স্নোডন বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের এই রূপরেখা সরকারের সঙ্গে তাদের ‘চলমান আলোচনার’ অংশ। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ভসানচরে স্থানান্তরের জন্য পরিকল্পনার গভীর মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান এবং খাদ্য, টেলিকমিউনিকেশনের মতো অন্যান্য কিছু বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
গত বছর জানুয়ারিতে সম্পাদিত ঢাকা-নেপিদো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তাছাড়া, জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, রাখাইন এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গাদের একাংশকে ভাসানচরে স্থানান্তরে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মাত্র ২০ বছর আগেই সাগর থেকে ভাসানচর দ্বীপটির উৎপত্তি। নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে এক ঘণ্টা নৌকাপথ অতিক্রম যেতে হয় দ্বীপটিতে। সেখানে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য ২৮ কোটি ডলার ব্যয় করছে বাংলাদেশ। ভাসানচরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করতে চায় সরকার। তবে বৈরি বৈরী আবহাওয়ার শিকার হয়েদ্বীপটিতে বিগত বছরগুলোতে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারাও দ্বীপটিতে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। ভাসানচর নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি গত জানুয়ারিতে বলেছিলেন, ‘সরকার এই দ্বীপ তৈরিতে প্রচুর পরিশ্রম করেছে। তারপরও জনমানবপূর্ণ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে।’

/এএমএ/

লাইভ

টপ