নারীর হাতেই ইউরোপ-আমেরিকার বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর ভবিষ্যৎ?

Send
ফাহমিদা উর্ণি
প্রকাশিত : ২১:২৩, এপ্রিল ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৭, এপ্রিল ০৭, ২০১৯

যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্য; দুই দেশের রেস্তোরাঁতেই ভারতীয় খাবারের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে বাংলাদেশি খাবার। সেখানকার উপমহাদেশীয় খাবারের দোকানগুলোতে তাই বাংলাদেশি খাবার ভারতীয় ঐতিহ্য হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে আসছে। সাধারণত পুরুষরাই রান্না করে থাকে বাংলাদেশি খাবারগুলো। সেগুলো যেমন ভারতের কোনও বিশেষ অঞ্চলের খাবারের মতো হয় না, তেমনি বাংলাদেশি ঐতিহ্যের খাবারের সঙ্গেও স্বাদের বেশ খানিকটা তারতম্য ঘটে। তবে সম্প্রতি এই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে। ঘরের রান্নার মধ্যে নিমজ্জিত থাকার বদলে নারীরা এবার যুক্ত হতে শুরু করেছেন রন্ধন পেশায়। এতে বদলাতে শুরু করেছে বাস্তবতাও। রেস্তোরাঁগুলোতে এখন পাওয়া যাচ্ছে সত্যিকারের বাংলাদেশি খাবারের ঘ্রাণ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ রন্ধন বিশেষজ্ঞ দ্য ইন্ডিপেনডেন্টে লেখা এক নিবন্ধে তাই বলছেন, নারীর হাতেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর ভবিষ্যৎ। খাদ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক লেখক ময়ুখ সেন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ লেখা এক নিবন্ধে তুলে এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রে রন্ধন পেশায় নারী উদ্যোগের কথা। ওই নিবন্ধে উদ্ধৃত একজন খাদ্য বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ভারতীয় খাবারের আড়াল থেকে বাংলাদেশি খাবারের স্বাতন্ত্র্যের দিকটি বের করে আনতে হলে অবশ্যই সেই রান্নাকে বাড়ির রান্নাঘরের মতোই হতে হবে।

দিনা বেগম একইসঙ্গে একজন রন্ধনশিল্পী ও রান্নাবিষয়ক লেখক। দ্য ইন্ডিপেনডেন্টে লেখা নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে আছেন তিনি। দিনা জানান, একসময় ‘ভারতীয় রেস্তোরাঁ’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলো চালাতেন পুরুষরা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ‘ভারতীয় পরিচিতি পাওয়া’ অনেক খাবারের উদ্যোক্তাই বাংলাদেশিরা। বেশিরভাগ ভারতীয় রেস্তোরাঁর মালিকও তারাই। তবে ওইসব খাবার ভারতীয় ঐতিহ্যের নয়। আবার বাংলাদেশি রান্না থেকেও সেগুলো বেশ আলাদা।

‘একমাত্র বাড়ির রান্নাঘরেই সত্যিকারের বাংলাদেশি খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদ পাওয়া যেতো। তবে রেস্তোরাঁগুলো সেদিকে দৃষ্টি দিচ্ছিলো না। মা বাড়িতে যে সুস্বাদু খাবারগুলো রান্না করতেন তার তুলনায় রেস্তোরাঁগুলোর খাবারের কোনও স্বাদ ছিল না বললেই চলে’- নিবন্ধে লিখেছেন দিনা। জানিয়েছেন, একসময় পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনে বাংলাদেশিদের পরিচালিত প্রায় ৫০টি রেস্তোরাঁ ছিল। তবে সেগুলো দ্রুত হারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন ১২টির মতো রেস্তোরাঁ চালু আছে। ৭০ ও ৮০-এর দশকে শুরু হওয়া এ ব্যবসা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে গেছে। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার হাত থেকে ছেলে কিংবা চাচার হাত থেকে ভাতিজার হাতে ব্যবসার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তবে কখনও মেয়ে কিংবা ভাতিজিকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

রন্ধন পেশার নেতৃত্বে নারীদের অনুপস্থিতির বিষয়টিকে ‘লিঙ্গবৈষম্য’র ফলাফল মনে করেন দিনা। নিবন্ধে মন্তব্য করেন, বিষয়টি ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিবারের জন্য আশ্চর্যজনক নয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক রন্ধন পেশার বেলাতেও বাস্তবতা আলাদা কিছু নয়। এক্ষেত্রে পুরুষদের ‘শেফ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর প্রতিদিনের বাড়ির রান্নার কাজে নিয়োজিত থাকেন নারীরা।

তবে বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে বলে মনে করেন দিনা। বলেন, ‘সম্প্রতি পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানে বাংলাদেশি সুইট শপ কাম ক্যাফেতে নারীদের কাজ করতে দেখে আমি খুব আনন্দিত হয়েছি।’ তিনি মনে করেন, পুরুষরা যখন পরিবর্তন আনতে অনাগ্রহী তখন নারীরা বাংলাদেশি খাবারকে পরিচিত করাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। ‘এ যেন এক নীরব বিপ্লব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গৃহস্থালি কাজে জড়িত মা, খালা, দাদি-নানিসহ বিভিন্ন নারীদের রন্ধনপ্রণালির জয়ের প্রশ্ন এটি।’

হোয়াইট চ্যাপেলের সে রেস্তোরাঁর বর্ণনা দিতে গিয়ে দিনা বলেন, ‘গরম গরম ভাজা মোগলাই পরোটা ট্রেতে পরিবেশন করা হচ্ছিলো। এর সুঘ্রাণ নাকে আসতেই আমার কাছে মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশে ফিরে গেছি। সেখানে কর্মরত কয়েকজন নারীকে দেখলাম খুব উৎসাহ নিয়ে কিছু অপরিচিত মিষ্টির উৎপত্তিগত ইতিহাস বর্ণনা করছেন’- বলেন দিনা। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ধরনের ক্রেতাকে সামাল দিতে সেখানকার নারী বিক্রয়কর্মীরা কখনও ইংরেজিতে আবার কখনও বাংলায় কথা বলছিলেন।’

এদিকে গত বছর ডিসেম্বরে খাদ্যবিষযক লেখক ময়ুখ সেন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ তুলে আনেন নিউ জার্সির এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর কথা, যার পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছেন দুইজন নারী। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৬১ বছর বয়সী গুলশান তার ৩১ বছর বয়সী মেয়ে নুর-ই ফারহানাকে নিয়ে জার্সি সিটিতে কড়াই কিচেন নামের বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ চালু করেন। সব রান্না একাই করেন গুলশান। আর রেস্তোরাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রমগুলো দেখেন ফারহানা। নিউ আর্ক এভিনিউয়ে অবস্থিত ভারতীয় রেস্তোরাঁর সমাহার থেকে সামান্য দূরে ‘কড়াই কিচেন’র অবস্থান।

ময়ুখ তার নিবন্ধে লিখেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পরিচয়ের রেস্তোরাঁগুলোর মালিকানা আসলে বাংলাদেশি অভিবাসীদের হাতে। তবে সেখানকার খাবার বাংলাদেশি নয়। আবার ভারতের বিভিন্ন স্থানের বৈচিত্র্যময় রান্নার ঐতিহ্যের স্বাদও পাওয়া যায় না তাতে। নিউ ইয়র্ক সিটি এলাকায় অল্প কয়েকটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। সেগুলো জ্যাকসন হাইটস ও এস্তোরিয়ার আশপাশের এলাকায় অবস্থিত। আর কড়াই কিচেন হলো জার্সি সিটির প্রথম বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ। সেখানে ডিম, টমেটো ও আলু ভর্তা পাওয়া যায়। ইলিশ ও রুই মাছ, ভালোভাবে সিদ্ধ করা ডিম দিয়ে হালকা করে তরকারি রান্না করা হয়। মুরগি রান্না করা হয় নারিকেলের দুধ দিয়ে। ডেজার্ট হিসেবে সেখানে রাখা হয় মিষ্টি দই।

দিনা জানান, বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্পৃহা আছে তা তিনি টের পেয়েছিলেন আগেই। জানান, একদিন এক চাচাতো বোন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তার সামনে সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করায় খুব অবাক হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার পর তার বোন জানিয়েছিলেন, বাচ্চার স্কুলে পড়া অন্য এক বাচ্চার মায়ের কাছ থেকে হাতে তৈরি ওই খাবার কিনে নিয়েছেন। এ নারীরা বাচ্চাদের স্কুল ও অভিভাবক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাদের রান্নাকরা খাবারের ক্রেতা জোগাড় করেন। যাদের বাংলাদেশি খাবারের প্রতি খুব আগ্রহ রয়েছে তারাই মূলত এসব খাবার কিনে থাকেন। ‘বাংলাদেশি ফুড’-এর জনপ্রিয় ক্যাটারার নাসরিন বেগম। নিজের বিশাল পরিবারের জন্য প্রতিদিন রান্না করে আনন্দ পেতেন তিনি। একদিন খাবার প্রস্তুত করার প্রতি এ ঝোঁককে ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেন নাসরিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাসরিনের মতো করেই গৃহিণী ও মায়েরা কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়েছেন। যেসব ব্যস্ত পরিবার ও স্থানীয় অনুষ্ঠানে বাড়িতে তৈরি খাবারের চাহিদা রয়েছে সেখানে খাবার বিক্রি করে থাকেন এসব উদ্যোক্তা।

দিনা জানিয়েছেন, ইনস্টাগ্রামে আফেলিয়াস কিচেন-এর খাবারের ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের ইনস্টাগ্রামে অনুসরণ করছে ৬৮ হাজারেরও বেশি ভক্ত। সেখানে তারা রেসিপি নেওয়ার জন্য আফিয়াকে খোঁজে। সাতকড়া, নাগা মরিচ, গলদা, শুঁটকি ও সরিষার তেলের মতো অন্যান্য উপকরণ প্রতিদিনের খাবারকে করে তোলে আরও সুস্বাদু। কীভাবে বাংলাদেশি খাবার রান্না করা শিখতে হবে, কীভাবে রান্নার উপকরণগুলো কিনতে হবে এবং এর স্বাদ কেমন হবে তা নিয়ে মানুষ আগের চেয়ে আরও বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠেছে।

দিনা লিখেছেন, ‘আমি যখন আমার ব্রিক লেন কুকবুক বইটি লিখি এবং সাপার ক্লাব অনুষ্ঠান উপস্থাপনা শুরু করি, তখন আমি আমার মা, নানি-দাদিদের মতো নারীদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশি রেসিপিগুলো বেছে নিতাম। সেগুলোকে সামনে নিয়ে আসতাম।’ ইংল্যান্ডে বিজ্ঞানী থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত হওয়া শেলি নুরুজ্জাম ‘ব্যাং কারি কিটস’- এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। স্বতন্ত্র ঐতিহ্যকে সামনে আনতে বাংলাদেশি খাবারের যথার্থ রেসিপি তৈরি করেছেন তারা। বাংলাদেশি খাবার রান্নায় শিক্ষানবিসদের এ রেসিপি দ্রুত ও সহজ পথ দেখাবে বলে মনে করেন দিনা।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দু রায়ের আশা, স্বাতন্ত্র্যকে সামনে আনতে না পারার ব্যর্থতা থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশি খাবার। তবে এজন্য নারীকেই যে রন্ধন পেশার অগ্রভাগে থাকতে হবে, পরোক্ষে তা-ই বলেছেন তিনি। কৃষ্ণেন্দু বলেন, ‘নিখুঁত ঘরোয়া রান্না না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকান গ্রাহকরা ভারতীয় রেস্তোরাঁর খাবার ও বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর খাবারের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন না।’

/বিএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ