শাস্তি দিতে অ্যাসাঞ্জকে ‘সন্ত্রাসী’ বানানোর পাঁয়তারা চলছে?

Send
মাহাদী হাসান
প্রকাশিত : ২৩:৩৩, এপ্রিল ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৭, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

কারও অজানা নেই, ২০১০ সালের মার্চ মাসে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ব্র্যাডলি ম্যানিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দফতরের গোপন তথ্য উইকিলিকস-এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচেষ্টা নিয়েছিল বিগত ওবামা প্রশাসনও। তবে অ্যাসাঞ্জের ভূমিকাকে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করার রাস্তা না পেয়ে ওবামাকে থেমে যেতে হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালের মার্চে নতুন করে দায়ের করা অভিযোগে তাকে ‘হ্যাকিং’-এ অভিযুক্ত করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ ম্যানিংকে হ্যাকিং-এ সহায়তা দিয়েছিলেন বলেই ওইসব রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস সম্ভব হয়েছে। তবে হ্যাকিং-এর ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলে সাধারণভাবে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ৫ বছরের মধ্যে অভিযোগ দায়ের করার বিধান রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। আর হ্যাকিং-এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ আনা গেলে, সেক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ৮ বছরের মধ্যে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ থাকে। ২০১০ সালে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে কথিত অপরাধ সংঘটনের ঘটনায়, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালে অভিযোগ দায়ের করায় স্পষ্ট হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে।১১ এপ্রিল গ্রেফতারের পর যুক্তরাজ্য পুলিশের গাড়িতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
২০১২ সালের জুন থেকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ৪ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) উইকিলিকসের টুইটে বলা হয়, ইকুয়েডর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দুইটি সূত্র থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে অ্যাসাঞ্জকে দূতাবাস থেকে তাড়ানো হতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করে বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) তাকে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেয় ইকুয়েডর। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যার্পণের অনুরোধ সাপেক্ষেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তা জানা গিয়েছিল সেই গত বছর ডিসেম্বরেই। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়া জেলা আদালতে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ গঠনের নথি ভুল করে ফাঁস করে ফেলেন প্রসিকিউটররা। অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতারের পর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জানা যায়, নতুন অভিযোগটি আনা হয়েছে দুইটি ধারায়। একটি হলো ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা প্রতারণা’ সংক্রান্ত ধারা, অপরটি কম্পিউটার জালিয়াতির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র’ বিষয়ক ধারা ১০৩০।
অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযোগে বলা হয়, মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ম্যানিং ইরাকে ফরোয়ার্ড অপারেটিং ঘাঁটিতে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ‘অতি গোপনীয়’ তথ্যের দায়িত্বে ছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন যে তিনি এমন কোনও গোপন তথ্য প্রকাশ করবেন না যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবর্ণনীয় ক্ষতি হয় এবং বিদেশি রাষ্ট্র লাভবান হয়। নির্বাহী আদেশ ১৩৫২৬ অনুযায়ী ‘অতি গোপন’ তথ্য এমন কাউকে দেওয়া যাবে না যার সেটি দেখার অনুমোদন নেই। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জেরও সেই অনুমতি ছিলো না। তাকে তথ্য সরবরাহ করায় ওই ধারা ভঙ্গ করেছেন ম্যানিং। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের ৯০ হাজার, ইরাক যুদ্ধের ৪ লাখ, গুয়ানতানামো বে’র ৮০০ বন্দির জবানবন্দি ডাউনলোড করেন ম্যানিং। সেবছরই ৮ মার্চ প্রতিরক্ষা দফতরের কম্পিউটার পাসওয়ার্ড হ্যাক করতে তাকে সাহায্য করেন অ্যাসাঞ্জ। সেখান থেকেই উইকিলিকসকে তথ্য সরবরাহ করেন ম্যানিং।
যে কোনও দেশেই কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে (সুনির্দিষ্ট কিছু ইস্যু ছাড়া) নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে আর সেই অভিযোগে মামলা করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে ষড়যন্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ক জালিয়াতির মামলায় এই ‘স্ট্যাচু অব লিমিটেশন্স’ তথা আইনি সময়সীমা ৫ বছর। অ্যাসাঞ্জের ওই কথিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ২০১০ সালের ৮ মার্চ। সেই হিসেবে ২০১৫ সালের ৮ মার্চই মামলা দায়েরের শেষ সুযোগ ছিল। তবে মামলা দায়েরের এই আইনি সীমা ৮ বছর করা যায় যদি সংঘটিত অপরাধকর্মকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ দায়ের করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাকার বিষয়ক বিখ্যাত আইনজাবী টর একলেন্ড বলছেন, এই অপরাধে অ্যাসাঞ্জের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ‘স্ট্যাচু অব লিমিটেশন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে অ্যাসাঞ্জের ক্ষেত্রে সেটা আট বছর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের হ্যাকিংকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে চিহ্নিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিচারিক এই সুবিধা নেওয়ার জন্য হ্যাকিংকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
ন্যাশনাল রিভিউ ইনস্টিটিউটের ফেলো অ্যান্ড্রু ম্যাককার্থি বলেন, কম্পিউটার জালিয়াতির ষড়যন্ত্র, আর অ্যাসাঞ্জ নিশ্চিতভাবেই সেই ষড়যন্ত্রের ভয়াবহ পর্যায়ে অবস্থান করছেন, কেননা তিনি আমাদের সেনাসহ বহু মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছেন। কোনও সন্দেহ নাই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তবে ম্যানিংকে সহযোগিতা দেওয়ার সেই সময়টিতে অ্যাসাঞ্জ ছিলেন বাইরে। অনেক বড় অপরাধ এবং অ্যাসাঞ্জ প্রতিরক্ষা বিষয়ক গোপনীয় নথি ফাঁস করে সর্বোচ্চ অপরাধ করেছেন। কিন্তু তারপরও কি একে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলা যায়?
ন্যাশনাল রিভিউ জার্নালে লেখা এক কলামে তিনি বলেন, হয়তো যায়…অন্তত কাগুজে ভাষায়। সেকশন ২৩৩২বি তে একে ফেডারেল ক্রাইম অব টেরোরিজম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনের (জি)(৫) উপধারা অনুযায়ী দুটি বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে ‘ফেডারেল ক্রাইম অব টেরোরিজম’ বলা যায়। প্রথমত, সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ কিংবা সরকারের প্রতি হুমকি বা বলপ্রায়োগের মাত্রা যদি বেশি থাকে। দ্বিতীয়ত অনেকগুলো অপরাধ করলে যার মধ্যে ১০৩০(এ) (১) ধারাও থাকবে, যা কম্পিউটার নিরাপত্তা সম্পর্কিত।

/বিএ/

লাইভ

টপ