প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েই হামলা?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:০৫, এপ্রিল ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১২, এপ্রিল ২৩, ২০১৯

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব-সতর্কতা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার সিরিজ বিস্ফোরণের ঘটনায় সে দেশের সরকারের বিভিন্ন অংশের মধ্যকার সমন্বয়হীনতার খবরটি জোরালোভাবে প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে হামলা-পূর্ববর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার পূর্ব দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য বলছেন, প্রধানমন্ত্রী হামলার ব্যাপারে অন্ধকারে ছিলেন। সরকারের আরেক মুখপাত্রের বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অগ্রাহ্য করার অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা হামলার নেপথ্য কারণ হিসেবে সরকারের দুই অংশের এই বিভাজনকে দায়ী করছেন। তারা সতর্ক করেছেন, এই বাস্তবতা বিস্তৃত হলে দেশটির ভবিষ্যৎ শঙ্কার মধ্যে পড়বে।  

শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট
রবিবার (২১ এপ্রিল) খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ইস্টার সানডে উদযাপনকালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ও তার আশপাশের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলসহ আটটি স্থানে বিস্ফোরক দিয়ে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২১ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছে ৫০০ জনেরও বেশি। ওই হামলার একদিন পরই আবারও বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী কলম্বো। বোমার আঘাতে আহত হন এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ধারণা করা হচ্ছে এটি রিমোট কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রিত বোমা ছিল। বিস্ফোরণের পর স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে যায়। তবে পুলিশ এখনও ওই এলাকা খালি করে নিয়ন্ত্রণে নেয়নি। প্রশ্ন উঠেছে রবিবারের হামলার জন্য দায়ী কারা।

শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এপ্রিলের শুরুতে আগাম সতর্কতা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, শ্রীলঙ্কায় হামলা হতে পারে। ১১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজুথ জয়াসুনদারা দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এ সংক্রান্ত গোয়েন্দা সতর্কতা পাঠান। এতে বলা হয়, ‘একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) প্রখ্যাত চার্চ এবং কলম্বোয় ভারতীয় হাইকমিশন লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে।'

শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী হার্শা দে সিলভা অভিযোগ করেছেন, পূর্ব সতর্কতার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহেকে ‘অন্ধকারে রাখা’ হয়েছে। আর সোমবার (২২ এপ্রিল) সরকারের মুখপাত্র রাজিথা সেনারত্নে বলেছেন, অভ্যন্তরীণভাবে এবং ভারতীয় ও মার্কিন গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সতর্কতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শ্রীলঙ্কায় বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত একটি গির্জা
গত বছর একটি রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কায় বিভাজন দেখা গিয়েছিল। তখন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহেকে সরিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে স্থলাভিষিক্তের প্রচেষ্টা চালানোর পর ওই রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। অবশ্য, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরে বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী পদে পুনর্বহাল করা হয়। তবে তারপরও সরকারের ভেতরে যোগাযোগগত ব্যর্থতা থেকে যাওয়ার ইঙ্গিতই সামনে এসেছে। সোমবার (২২ এপ্রিল) সরকারের মুখপাত্র রাজিথা সেনারত্নে বলেছেন, বিক্রমাসিংহে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকার চেষ্টা করলেও বাকি সদস্যরা তা উপেক্ষা করেছেন। ‘আমি মনে করি এটি বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী আহ্বান করার পরও নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠকের ব্যাপারে রাজি হয় না’- বলেন সেনারত্নে।

কলম্বোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি অলটারনেটিভস-এর নির্বাহী পরিচালক পাইকিয়াসোথি সারাভানামুত্তু বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার মতবিরোধ ও উত্তেজনা খুব স্পষ্ট করেই এ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। যা-ই হোক না কেন তদন্তের মধ্য দিয়ে তা উন্মোচন করতে হবে। তবে স্পষ্ট করেই এগুলো সবকিছুকে একপাশে ঠেলে রেখে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে ও তদন্তের স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখা উচিত।’

মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) থেকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে শ্রীলঙ্কার সরকার। এদিন একদিনের জাতীয় শোকও পালন করা হচ্ছে। দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে নিহতদের সমাহিতকরণের বিভিন্ন রীতি। আশঙ্কা রয়েছে, শেষকৃত্য অনুষ্ঠান লক্ষ্য করে নতুন হামলা হতে পারে। সন্দেহভাজন হিসেবে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে কমপক্ষে ৪০ জনকে। আর তাতে হামলাকারী সংগঠনের আকার ঠিক কেমন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় নিহতদের স্মরণ
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম (আইসিএসভিই)-এর পরিচালক অ্যানে স্পেকহার্ড সিএনএন’কে বলেন, ইস্টার সানডে হলো খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন, বিপুল সংখ্যক মানুষ ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। আর একসঙ্গে অনেক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগকে কাজে লাগাতে গির্জাগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টানরা জানান, এই হামলা যেন ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত।’ এমন হামলার কোনও শঙ্কাই তাদের ছিল না। সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, এই হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম (আইসিএসভিই)-এর পরিচালক স্পেকহার্ড বলেন, হয়তো ইন্টারনেটের মাধ্যমে কেউ এই হামলার জন্য প্রভাবিত করছিলো। কেউ হয়তো ‘একটিমাত্র’ হামলার কথা বলছিলো, জবাবে অপেক্ষা ছিল ইস্টারের।

শ্রীলঙ্কায় বরাবরই সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। এরপর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সশস্ত্র বিদ্রোহী তামিল টাইগারকে পরাজিত করতে সমর্থ হয় সরকার। এরপর থেকে শান্তই ছিল পরিস্থিতি। কিন্তু আবারও সহিংসতা। স্পেকহার্ড ও অন্যরা বলেছেন, সরকার যখন নিজেদের সক্ষমতা ও গোয়েন্দা বিভাগ নিয়ে ভুল অবস্থানে এবং প্রসন্ন চিত্তে রয়েছে তখন খোদ অভিজ্ঞতাই একটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘একটি মেমো ছিল যার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ যে কোনও পশ্চিমা সরকারের ক্ষেত্রেই তা হতে পারতো এবং এভাবেই সরকার কাজ করে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি হবে না তা নিয়ে তারা আমলাতান্ত্রিক ও বিভাজিত থাকে। আর সে সময়ের মধ্যে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে ফেলে’- বলেন স্পেকহার্ড।

যা ঘটেছে তা নিয়ে যদি বিভাজিত অবস্থান অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকারের ভেতরকার বিভিন্ন অংশ এবং জনগণের মধ্যকার বিভাজন আরও বিস্তৃত হতে পারে, যা দেশটির অনেক কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে হুমকিতে ফেলতে পারে।

/এমএইচ/এফইউ/বিএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ