জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি সমাধিতেও জীবন্ত কার্ল মার্ক্স

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:৪৭, মে ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৫, মে ০৫, ২০১৯

এইতো গেলো ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। উত্তর লন্ডনে কারা যেন মার্ক্সের স্মৃতিস্তম্ভে লাল রঙে ‘বিদ্বেষের প্রচারক’ ও ‘গণহত্যার স্রষ্টা’ লিখে গেছে; সংবাদকর্মী হিসেবে সে ঘটনার নিউজ করতে গিয়ে মনে হলো; এখনও মার্ক্সকে ভয়!...ভয়তো অমূলক নয়। কারণ আপনি পছন্দ করেন আর না করেন, মার্ক্স যে পুঁজিবাদ নামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাকে চিনতেন, সেটা প্রতিদিন আরও বেশি বেশি করে স্পষ্ট হচ্ছে। নব্য উদারবাদী বাজারের রমরমা যুগের অবসান হয়েছে, খসে পড়েছে তার উদারতার পোশাক, নগ্ন পুঁজির যুগটাকে মানুষ চিনছে প্রতিদিন বেশি বেশি করে। কমিউনিস্ট আর বামপন্থীরা নয় কেবল, মোটামোটি উদারবাদী ধারার একাডেমিও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, বিকশিত পুঁজিবাদের এই যুগপর্ব অর্থনৈতিক ব্যর্থতার এক জ্বলজ্যান্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে। সংরক্ষণশীল নীতির পক্ষের প্রচারণা জয়ী হয়েছে খোদ মার্কিন মুলুকে, আর যুক্তরাজ্য ব্রেক্সিট নিয়ে মাতোয়ারা। রিগ্যান-থ্যাচারের আমেরিকা-ব্রিটেন এখন কিন্তু থেরেসা মে আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তাই বুঝিবা ভয়। এই বোধহয় সমাজতন্ত্র এলো। এই বোধহয় এলো।

ভয়ের কথা তো ডোনাল্ড ট্রাম্প গোপন করেননি। ফেব্রুয়ারিতেই ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলাবাসীর পবিত্র গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় আমরা তাদের পাশে আছি। একই সঙ্গে আমরা মাদুরো সরকারের নির্মমতার নিন্দা জানাচ্ছি, যার সমাজতান্ত্রিক নীতি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধনী দেশের অবস্থান থেকে দেশটিকে দারিদ্র্য ও হতাশার ভূমিতে পরিণত করেছে। আমরা শঙ্কিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্রেও আমরা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের ডাক শুনতে পাচ্ছি'। সমাজতন্ত্রের কারণে নাকি ট্রাম্পের দেশের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর ধারাবাহিক শত্রুতায় ভেনেজুয়েলা বিপন্ন আজ, সেটা আরেক আলাপ। তবে ট্রাম্পের ভীতির প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ঘটনা বটে!

মার্ক্সবাদ অব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে তা নয়। মার্ক্স-এঙ্গেলস-এর দ্বান্দ্বিক আর ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দার্শনিক ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে হুবহু সঙ্গতি রেখে এগোয়নি মানব সমাজ; দ্বন্দ্বের ভিন্ন-ভিন্ন বহুমাত্রিক চেহারা আমরা দেখেছি। তবে আজও আমাদের অর্থশাস্ত্রের অভ্যন্তরে পুঁজিবাদ বিশ্লেষণ করতে গেলে কিংবা রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মার্ক্সীয় অর্থনীতি আমাদের সহায় হয়।  দার্শনিক-সমাজবিজ্ঞানী-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে মার্ক্স মানুষকে তার সব কাজের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। পুঁজির যুগের উৎপাদন সম্পর্ক কী করে মানুষকে প্রথমত তার শ্রমিকতা কিংবা কাজ থেকে, দ্বিতীয়ত তার নিজের থেকে এবং শেষাবধি গিয়ে তার মানবিক স্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে; তা আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন তিনি।

আজ (৫ মে) মার্ক্সের জন্মবার্ষিকী। সমাধিতে শায়িত মার্ক্সকে দুনিয়াজুড়ে স্মরণ করছে তার অনুসারী কিংবা মতপার্থক্য সত্ত্বেও তার চিন্তাধারায় আলোকিত মানুষেরা। ফেব্রুয়ারিতে তার সমাধিসৌধ আক্রান্ত হওয়ার পর নিউ ইয়র্কভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজবাদী ধ্যানধারণার ত্রৈমাসিক পত্রিকা জ্যাকোবিনে ‘কার্ল মার্ক্স ইজ নট বারিড’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও মার্ক্সবাদী লেখক স্যাম মিলার। সেই রচনার আলোকে ‘সমাধিতেও জীবন্ত কার্ল মার্ক্স’ নামের এই নিবন্ধ হাজির করেছেন ফাহমিদা উর্ণি। [ভূমিকা: বাধন অধিকারী]


মৃত্যুর এক শতাব্দী পরও কার্ল মার্ক্স মানুষের হৃদয়ে অমলিন। তার রাজনৈতিক উত্তরসূরীদেরকে যারা ভয় পান ও ঘৃণা করেন; তাদের জন্য কথাটা আরও বেশি সত্য। দশকের পর দশক ধরে মার্ক্স-এর সমাধিতে বেশ কয়েকটি বিদ্বেষী হামলা হয়েছে: দড়ি দিয়ে টেনে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছে তার আবক্ষ মূর্তি, সমাধিতে শায়িত-চির-ঘুমন্ত মার্ক্স-এর ওপর বোমাও ফেলা হয়েছে। ৪০ বছর আগে একটি পাইপ বোমার বিস্ফোরণে মূর্তির সামনের দিকটা বিকৃত হয়ে যায়। বিদ্বেষী স্লোগান লেখার ঘটনা তো অহরহই ঘটছে। তবে দ্য ফ্রেন্ডস অব হাইগেট সিমেট্রি ট্রাস্টের প্রধান আয়ান দুনগাভেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির সবশেষ হামলার পর মার্ক্সের সমাধিসৌধকে ‘আগের চেহারায় আর ফেরানোর’ সুযোগ নেই। যেভাবেই সংস্কার করা হোক না কেন, ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন মুছে ফেলা সম্ভব হবে না।    

খুব কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত দুইটি ঘটনার একটি ৪ ফেব্রুয়ারির। ১৮৮৩ সালে মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি মূল সমাধি ফলককে এদিন হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়।  ১৫ ফেব্রুয়ারি সমাধিতে উজ্জ্বল লাল রঙে লেখা কিছু স্লোগান দেখা গিয়েছিলো। ওইসব স্লোগানে লেখা হয়: ‘গণহত্যার স্থপতি’, ‘ঘৃণার মতবাদ’ ‘বলশেভিক হলোকাস্টের স্মৃতিসৌধ’। দ্য কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে লেখা ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ এবং থিসেস অন ফয়েরবাখ এ লেখা ‘দার্শনিকরা পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন শুধু। কিন্তু আসল কাজ হলো একে বদলানো’- মার্ক্সের এ দুই উক্তি তার সমাধি সৌধে লেখা ছিল। সেগুলো গ্রাফিতি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

বৈশ্বিক ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকায় বুঝতে বাকি থাকলো না যে উগ্র ডানপন্থী আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মার্ক্সের সমাধি ভাঙচুর করা হয়েছে। ফ্রান্সে ফ্যাসিবাদীদের দ্বারা সমাধি কলুষিত করার আরও কয়েকটি ঘটনা রয়েছে। হিটলারের নাৎসি দলের প্রতীকে (স্বস্তিকা) নির্মিত হাতিয়ার দিয়ে ইহুদি সমাধিগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ১৯৬০ সালে মার্ক্সের সমাধিও স্বস্তিকা দিয়ে ভাঙচুর করা হয়।

১৯৬০ সালের ৫ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী: হাইগেট সিমেট্রিতে কার্ল মার্ক্সের সমাধির উপরে থাকা স্মৃতিস্তম্ভে হলুদ রঙ মাখানো দুইটি স্বস্তিকা পাওয়া গেছে। সেখানে জার্মান ভাষায় লেখা স্লোগানে বলা হয়েছে, এর লেখক ইসরায়েলে নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা নাৎসি নেতা এডল্ফ আইচম্যানকে ভালোবাসেন। ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ও সমাধি অপবিত্রকরণের যোগসূত্র কেন? ফ্যাসিবাদ ও মৃত্যুর আন্ত:সংযোগ নিয়ে গবেষণায় মার্ক নিউক্লিয়াস উল্লেখ করেছেন, এটি নিছক কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। এক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেনর, ফ্যাসিবাদীরা তাদের মৃত শত্রুদের অমর ভেবে আতঙ্কিত হতে থাকেন। যেন, মৃতরা খানিকটা রহস্যজনকভাবে নতুন জীবনে ফিরে আসতে পারে।

মার্ক নিউক্লিয়াস মনে করেন, সমাধিতে হানা দেওয়া আর ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসবাদ এ দুইটি জিনিস পারস্পরিক। মার্ক্সের সমাধিতে এসব হামলার অর্থ হলো মার্ক্স যেন আবার ফিরে না আসেন; মানে দুনিয়ার উৎপাদন সম্পর্কে বদল আসার মধ্য দিয়ে যেন আবার সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণার পুনরুত্থান না ঘটে। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন একবার বলেছিলেন, মৃতরাও ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত নয়। মার্ক্সের সমাধিরও তাই নিরাপদ থাকার কথা নয়।

ফ্যাসিবাদীদের কাছে মার্ক্সের সমাধি কোনও মৃতের পরিসর নয়, বরং পুনরুত্থানের হুমকি। তাদের কল্পনার চিরন্তন শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয় মার্ক্সবাদ। তারা মনে করে না সমাধিতে মার্ক্স নিশ্চল, বরং মার্ক্সের ধ্যানধারণার সচলতার ভীতিতে সন্ত্রস্ত থাকতে হয় তাদের। তাদের আশঙ্কা, মার্ক্স সমাধির ভেতরে থেকেও এখনও বিশ্ব ইতিহাসকে প্রভাবিত করছেন। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বিস্মৃত অতীত থেকে মার্ক্সকে পুনরুজ্জীবিত করছে। যদি একদিন পুঁজিবাদ উচ্ছেদ হয়ে যায় এবং মানবতা যদি এর প্রাগৌতিহাসিকতা থেকে বাস্তব ইতিহাসের দিকে এগোয়, তবে তখন মার্ক্স ভূতের চেয়েও বেশি কিছু হবেন। তিনি হবেন অমর।

ব্রঙ্কাইটিসে ভুগে ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ মার্ক্সের প্রয়াণ হয়। কয়েকদিন পর উত্তর লন্ডনে ইস্টার্ন সিমেট্রি অব হাইগেটে স্ত্রী জেনির সমাধির পাশে সমাহিত করা হয় তাকে। ফিলিপ এস. ফনার রচিত ‘হোয়েন মার্ক্স ডায়েড: কমেন্টস ইন এইটিন এইটি থ্রি’ বই থেকে জানা গেছে, মার্ক্সের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, এলিনর মার্ক্স, পল লাফার্জ ও উইলহেম লিবনেৎস-সহ গুটিকয়েক বন্ধু-স্বজন উপস্থিত ছিলেন। এঙ্গেলস শোকস্তুতি উপস্থাপন করেছিলেন, তার প্রয়াত বন্ধুকে মহা বিজ্ঞানী ও বিপ্লবী উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন।

শোকস্তুতিতে বলা হয়: ‘ডারউইন যেমন জৈব-প্রকৃতিতে বিবর্তনধারাকে শনাক্ত করেছিলেন, তেমনি করে মানুষের সামাজিক ইতিহাসের বিবর্তন ধারাকে শনাক্ত করেছিলেন মার্ক্স। তবে ‘বিজ্ঞানের মানুষ’ তার অর্ধেক পরিচয়ও নয়। মার্ক্সের বিজ্ঞান ঐতিহাসিক গতিশীলতার, অফুরান বৈপ্লবিক প্রাণশক্তির। তবে সবার আগে মার্ক্স একজন বিপ্লবী।’  

হাইগেটে এক খণ্ড জমির ওপর শুয়ে আছেন মার্ক্স। তবে আরও উপযুক্ত কোনও জায়গায় মার্ক্সের সমাধি সৌধ করতে চেয়েছিল জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এসপিডি)। মার্ক্স মারা যাওয়ার পরপরই অগুস্ত বেবেল প্রস্তাব করেছিলেন, এসপিডি কংগ্রেসে তাদের প্রয়াত নেতার নতুন স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করার জন্য। তবে সম্মতি ছিল না মার্ক্সের জীবনের সবথেকে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস-এর। এ ব্যাপারে বেবেলকে তিনি লিখেছিলেন: ‘মার্ক্সের সমাধি সৌধের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত তা আমার জানা নেই। পরিবার এর বিরুদ্ধে। সাদাসিধে ধরনের সমাধি ফলকটি তিনি তার স্ত্রীর জন্য তৈরি করেছিলেন, এখন সেখানে তার নিজের ও নাতির নাম আছে। এটিকে স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করা হলে তা তাদের দৃষ্টিতে অসম্মানের।’ লিবনেৎসও এঙ্গেলসের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করেছেন। তিনি লিখেছেন: ‘স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হোক মার্ক্স নিজেও তা চাইতেন না। দ্য কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ও ক্যাপিটালের স্রষ্টা নিজে যেটি তৈরি করেছেন তা পাল্টে অন্য কোনও স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে চাওয়াটাই তার জন্য অসম্মানের।’

লাখ লাখ শ্রমিক যারা কিনা তার ডাকে একত্রিত হয়েছিল তাদের মস্তিষ্ক ও মননে তিনি কেবল ব্রোঞ্জের চেয়েও টেকসই কোনও স্মৃতিস্তম্ভই নয় একইসঙ্গে ভবিষ্যতের সমাজ বিনির্মাণের প্রেরণাও।

মার্ক্সের সমাধি হয়ে উঠেছিল সেই ঐতিহাসিক সম্মিলনের উৎসভূমি, যেখান থেকে প্যারি-কমিউনের (১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত প্যারিস পরিচালনাকারী বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক সরকার) সূচনা হয়েছিল। ১৯০৩ সালে লন্ডন কংগ্রেস শেষ করার পর ওই সমাধি এলাকাতেই জড়ো হয়েছিলেন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা। পরবর্তী ২০ বছর ওই সমাধিক্ষেত্র পড়ে থাকে অবহেলায়, ছেয়ে যেতে থাকে ঘাস আর আগাছায়। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি কার্ল মার্ক্সের অবহেলিত সমাধি পুনঃসংরক্ষণের জন্য আবেদন জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্কার্স (কমিউনিস্ট) পার্টির অঙ্গ সংগঠন দ্য ওয়ার্কার আবেদনের পক্ষে যুক্তি হাজির করে, সাদাসিধে ও অসৃজনশীল সমাধির চেয়ে আরও ভালো কিছুর দাবি রাখেন মার্ক্স। তাদের ভাষ্য ছিল এরকম: ‘আমরা মনে করি শ্রমিক শ্রেণির মানুষের কাছে মহাদার্শনিক বলে বিবেচিত এ মানুষটির সমাধিতে সামান্য প্রস্তর খণ্ডের বদলে আরও মানানসই কিছু প্রয়োজন। পুঁজিবাদ তার নিজের যত্ন নিয়ে থাকে। নেপোলিয়নের সমাধি প্যারিসকে গৌরবোজ্জ্বল করেছে। জেনারেল গ্রান্টের সমাধি নিউ ইয়র্ক সিটির রিভারসাইড ড্রাইভকে মহিমান্বিত করেছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে আব্রাহাম লিংকনের একটি সম্প্রসারিত সমাধি সৌধ করা হয়েছে। একইভাবে অন্যত্রও ঘটেছে। যারা শ্রমিকদের জন্য লড়াই করেছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের অন্তিম স্থানগুলোকে সম্মান জানাতে শ্রমিকরা কিছু কেন করবে না। প্রতি বছর হাজার হাজার ভক্ত মার্ক্সের সমাধি পরিদর্শনে আসে। মার্ক্সের সমাধি দেখে এ হাজার হাজার মানুষের মন যেন তৃপ্তি নিয়ে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা করা উচিত।’

১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি সমাধির জন্য নতুন একটি জায়গা খুঁজে পায়। সেখানেই এলিনর মার্ক্সের দেহভস্মের পাশাপাশি অন্তিম শয্যায় শায়িত হয়ে আছে মার্ক্সের পরিবার। ব্রোঞ্জের তৈরি মার্ক্সের আবক্ষ একটি মূর্তি গ্রানাইটের একটি স্তম্ভের ওপর বসে আছে। লরাঁ ব্রাডশ মূর্তিটির নকশা করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, এটি যেন শুধুই একটি মানুষের স্মৃতি সৌধ না হয় বরং এটি হবে এক বিশাল মনের মানুষ ও এক মহাদার্শনিকের স্মৃতি সৌধ। মানুষের উচ্চতর কোনও কিছু তৈরি করার বদলে ব্রাডশ চেয়েছিলেন মার্ক্সের মনের ‘গতিশীল শক্তি’কে উপস্থাপন করতে। তিনি আবক্ষ মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন যেন মানুষ চোখাচুখি হয়ে (আইলেভেল) এর সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া করতে পারে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীরা সমাধিটি পরিদর্শন করেছেন। প্রতি বছর লাখো মানুষ সেখানে যায়। ১৯৯৯ সালে কার্ল মার্ক্সের সমাধিটিকে গ্রেড ওয়ান কাঠামোর তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ‘ব্যতিক্রমী আগ্রহ’ নিয়ে তৈরি ভবন ও কাঠামোগুলোকে এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।

 

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ