ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ ফাঁস

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৩:৫৯, মে ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১১, মে ০৮, ২০১৯

ফিলিস্তিন ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েল ঘেঁষা শান্তি পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নানা সময়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রমজানের পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা রয়েছে। তবে তার আগেই মঙ্গলবার ইসরায়েলের একটি সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমে ওই পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওই চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছেন। দুই দেশের পক্ষ থেকে এর নাম দেওয়া হয়েছে ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি বা শতাব্দীর সেরা চুক্তি।

চুক্তিটি এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে চুক্তিটি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তরফে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চুক্তিটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। নিচে ট্রাম্পের কথিত ওই শান্তি পরিকল্পনার কয়েকটি মৌলিক বিষয় তুলে ধরা হলো।

০১. চুক্তি

ইসরায়েল, পিএলও এবং হামাসের মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ফিলিস্তিন নামে কোনও দেশ থাকবে না। চুক্তি অনুযায়ী, নতুন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের নাম হবে নিউ প্যালেস্টাইন। গাজা উপত্যকা, যিহূদিয়া পার্বত্য এলাকা এবং পশ্চিম তীরের সামারিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত হবে নিউ প্যালেস্টাইন। তবে পশ্চিম  তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোর ওপর তার কোনও সার্বভৌমত্ব থাকবে না। এসব বসতির সার্বভৌমত্ব থাকবে ইসরায়েলের হাতে।

০২. জেরুজালেম

জেরুজালেম নগরী নিয়ে কোনও ভাগাভাগি হবে না। বরং এটি হবে নিউ প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েল উভয় দেশের রাজধানী। নগরীর আরব বাসিন্দারা নিউ প্যালেস্টাইনের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। আর ইহুদিরা ইসরায়েলি নাগরিক হিসেবে সেখানে বসবাস করবেন। ইহুদিরা আরবদের ঘরবাড়ি কিনতে পারবে না। আরবরাও ইহুদিদের বাড়িঘর কিনতে পারবে না। জেরুজালেমে নতুন আর কোনও এলাকা দখল করা হবে না। পবিত্র স্থানগুলোর বিদ্যমান অবস্থা বজায় থাকবে।

০৩. জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ

উভয় দেশের অখণ্ড রাজধানী জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরায়েলের জেরুজালেম পৌরসভার হাতে। তবে সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে। ইসরায়েলের জেরুজালেম পৌরসভার কাছে ট্যাক্স ও পানির বিল সরবরাহ করবে নিউ প্যালেস্টাইন।

০৪. গাজা

ফিলিস্তিনে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য মিসর নতুন জমি দেবে। কলকারখানা নির্মাণ, বাণিজ্যিক ও কৃষি খাতে ব্যবহারের জন্যও নতুন ভূখণ্ড দেবে মিসর। তবে ফিলিস্তিনিরা এখানে বসবাসের সুযোগ পাবে না। লিজ বাবদ মিসরকে মূল্য পরিশোধ করবে নিউ ফিলিস্তিন। লিজ বাবদ ঠিক কী পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হবে তা নির্ধারণ করে দেবে মধ্যস্থতাকারী ও সহযোগী দেশগুলো।

০৫. আন্তর্জাতিক সহযোগী

চুক্তি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। নিউ প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন প্রকল্পে পাঁচ বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে তারা। এর আওতায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে থাকা ইহুদি বসতিগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগীরা যে অর্থ সহায়তা দেবে তার ২০ শতাংশ দেবে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেবে ১০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ তহবিলের যোগান দেবে। তেল বিক্রির অর্থ থেকে তারা এ সহায়তা দেবে। চুক্তি বাস্তবায়নের আর্থিক বোঝা তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোকেই বইতে হবে। কেননা, এ চুক্তিতে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

০৬. সামরিক বাহিনী

নিউ প্যালেস্টাইনকে কোনও সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হবে না। একমাত্র পুলিশকে হালকা অস্ত্র বহনের সুযোগ দেওয়া হবে। নিউ প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সুরক্ষা চুক্তি সম্পাদিত হবে। এর আওতায় বিদেশি আগ্রাসন থেকে দেশ রক্ষায় ইসরায়েলকে অর্থ দেবে ফিলিস্তিন। মধ্যস্থতাকারী সহযোগী দেশগুলোকে নিয়ে এ অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।

০৭. হামাস

চুক্তি স্বাক্ষরকালে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাস তার সব অস্ত্র মিসরের কাছে জমা দেবে। ব্যক্তিগত অস্ত্রও এর আওতায় পড়বে। সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত হামাসের নেতাকর্মীরা সহযোগী দেশগুলোর কাছ থেকে বেতন পাবে।

০৮. নিউ প্যালেস্টাইনে নির্বাচন

রাষ্ট্র গঠনের এক বছরের মাথায় নিউ প্যালেস্টাইনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের প্রত্যেক নাগরিক এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে।

০৯. উন্মুক্ত সীমান্ত

বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে নিউ প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েলের সীমান্ত জনগণের চলাচল ও পণ্য পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

১০. পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে সংযোগ স্থাপন

নিউ প্যালেস্টাইনের পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে একটি মহাসড়ক নির্মাণ করা হবে। এর অর্ধেক খরচ বহন করবে চীন। ১০ শতাংশ করে বাকি ৫০ শতাংশ অর্থের যোগান দেবে দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

১১. ফিলিস্তিনকে হুঁশিয়ারি

ফিলিস্তিনের হামাস এবং পিএলও যদি এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দেশটিকে দেওয়া সব মার্কিন সহায়তা বাতিল করা হবে। একইসঙ্গে এটিও নিশ্চিত করা হবে যেন অন্য কোনও দেশও তাদের অর্থ সহায়তা দিতে না পারে।

১২. যুদ্ধে ইসরায়েলের পক্ষ নেবে যুক্তরাষ্ট্র

ফিলিস্তিনের ক্ষমতাসীন দল পিএলও যদি এ চুক্তি মেনে নেয় এবং হামাস ও ইসলামিক জিহাদ যদি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে দল দুটির নেতারাই এর জন্য দায়ী থাকবে। এই নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে গাজা উপত্যকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে ইসরায়েল। এই যুদ্ধে ইসরায়েলের পক্ষ নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

এমন সময়ে ট্রাম্পের কথিত এ শান্তি পরিকল্পনা ফাঁস হলো যখন ওই চুক্তি মেনে নিতে ফিলিস্তিনকে সৌদি আরব চাপ দিচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটরের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে নিতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে ১০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে তার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিন।

মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, এর আগে ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে নিতে না পারলে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হাওম ডেইলি জানিয়েছে, সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের চারটি দেশ ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামের ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছে। বাকি দেশগুলো হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও জর্ডান। চার দেশের কর্মকর্তারাই হাওম ডেইলি’কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরব, আমিরাত, মিসর ও জর্ডান ট্রাম্পের জামাতা ইহুদি ধর্মাবলম্বী জ্যারেড কুশনার’কে এই পরিকল্পনার প্রতি তাদের সমর্থনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ কুশনার হোয়াইট হাউসের সিনিয়র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দূত হিসেবে নিয়োজিত জেসন গ্রিনব্লাটের কাছে নিজেদের অবস্থানের জানান দিয়েছে চার আরব দেশ। জ্যারেড কুশনার এবং জেসন গ্রিনব্লাট কাতারের সঙ্গেও এ ইস্যুতে আলোচনা করেছেন। তবে দেশটি থেকে তারা দৃশ্যত কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনীহারও সমালোচনা করেন চার আরব দেশের কর্মকর্তারা। হামাসের পলিটব্যুরোর সদস্য ওসামা হামদান আল জাজিরা’কে বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফিলিস্তিনকে চাপ দিতে আরব দেশগুলোকে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা যে সমাধানের কথা বলছে সেটা আসলে ইসরায়েলের স্বার্থ সংরক্ষণ করে।

ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইসরায়েল-ঘেঁষা। তবে ওবামা প্রশাসন পর্যন্ত তারা দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিল। বিগত মার্কিন প্রশাসনগুলো চাইতো, দুই দেশের মধ্যকার সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান হোক। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধের পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের প্রস্তাবিত সীমানা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষেই অবস্থান ছিল তাদের। তবে ট্রাম্প সমগ্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে সেই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেন। নির্বাচনি প্রচারণার সময় থেকেই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নীতির সমালোচনা করে আসা ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরপরই নতুন শান্তি প্রস্তাব তৈরির কথা জানান। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, মিডল ইস্ট মনিটর।

/এমপি/

লাইভ

টপ