নরওয়েতে পাওয়া তিমিটি রুশ গুপ্তচর, নাকি থেরাপিস্ট?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৬:৩৭, মে ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, মে ১০, ২০১৯

মার্টিন ভিকিবি যখন নরওয়ে উপকূলে একটি রাশিয়ার ‘গুপ্তচর তিমি’ আটকের খবর দেখলেন, তখন দ্রুত তিনি তার পুরনো সংবাদপত্র ফিসকেরিব্লাদেত-এ একটি খবর দিতে ফোন করলেন। কোনও গুপ্তচরের কথা নয়, সাদা রঙের তিমিটি তাকে মনে করিয়ে দিলো একটি ‘থেরাপি তিমি’র কথা। এক দশক আগে উত্তর রাশিয়ার একটি ডাইভিং সেন্টারে এমন তিমির দেখা পেয়েছিলেন তিনি। সেমিয়ন নামের তিমিটি রাশিয়ার মুরমানস্ক অঞ্চলের একটি পানিপূর্ণ স্থাপনায় থাকতো। আর মাঝে মধ্যে পর্যটকদের গ্রুপের মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দ দিতো। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, নরওয়ের উপকূলে পাওয়া এই তিমিটির পরিচয় নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে।

নরওয়ে উপকূলে পাওয়া যায় বেল্ট লাগানো এই তিমিটি

মুরমানস্ক শহরের নরওয়ের সাবেক উপদেষ্টা ভিকিবি গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘হয়তো এটা সেই একই তিমি নয়, তবে একই ধরনের আচরণ করে’। টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ভিকিবি বলেন, ‘তিমিটির বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। এটাকেই তিমিটির পক্ষে দাঁড়ানোয় আমার বড় উদ্দেশ্য হিসেবে দেখছি’।

নরওয়ের ইনগোয়া দ্বীপে পাওয়া যায় সাদা রঙের তিমিটি। এরপরই স্থানীয়ভাবে সেলিব্রেটি হয়ে ওঠে তিমিটি। স্থানীয়রা তাকে ‘ভালভ্লামিদির’ নামে ডাকতে শুরু করে। তিমির নরওয়ের প্রতিশব্দ ভাল আর রাশিয়ার জনপ্রিয় নাম ভ্লামিদির থেকে ওই নামকরণ করা হয়। উপকূলীয় শহর হ্যামারফেস্টের সমুদ্র অঞ্চলে ছিল তিমিটি। এই সপ্তাহের শুরুতে এক নারী সমুদ্রে তার আইফোন হারিয়ে ফেললে তিমিটি তা উদ্ধার করে দেয়। তবে তিমিটিকে যখন পাওয়া যায় তখন তার গলায় পাওয়া বেল্টটিতে ‘সেন্ট পিটার্সবার্গের সরঞ্জাম’ সিল দেখা যায়। কুকুরের গলায় থাকা বেল্টের মতো ওই বেল্টটি নিয়ে ধারণা শুরু হয়, তিমিটি হয়তো রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে পালিয়েছে। তবে যে-ই তিমির গলায় বেল্ট পরিয়ে দিক না কেন, তার হয়তো উদ্দেশ্য ছিল কোনও ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা। তবে তিমিটি উদ্ধারের পর কেউই প্রকাশ্যে এটি হারানোর কথা স্বীকার করেনি।

রুশ বিজ্ঞানী ও বেলুগা সাদা তিমি কর্মসূচির উপপ্রধান দিমিত্রি গ্লাজোভ জানিয়েছেন, মুরমানস্কের কাছে অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা বিভিন্ন কারণে তিমিদের প্রশিক্ষণ দেয়। সামরিক প্রয়োজনে নয়, বেসামরিক প্রয়োজনেও বেলুগাসহ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের প্রশিক্ষণ দেয়। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে কোনও জিনিস বা সমস্যায় পড়া ডাইভারদের খুঁজে পাওয়া।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষই ডলফিনদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে। তবে বেলাগু তিমিও মনোযোগ কাড়ে। গ্লাজোভের মতে, ২০১৪ সালে সোচি অলিম্পিকের সময় সমুদ্রপথের সুরক্ষায় বেলাগু তিমি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও শোনা গিয়েছিল। তবে তাতে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে তিনি বলেন, শুধু কোনও বেল্টের উপস্থিতির মাধ্যমে ভালভ্লাদিমিরের সাথে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর যোগাযোগের সম্পর্ক নিশ্চিত করে না। তিনি বলেন, এ ধরনের বেল্ট সারা রাশিয়াতেই বিক্রি হয়।

ভিকিবি ২০০৮ সালে রাশিয়ায় যে তিমি দেখেছিলেন তার সাথে ভালভ্লাদিমিরের মিল রয়েছে। রাশিয়ার আর্কটিক সার্কেল ডাইভ সেন্টারের প্রধান মিখাইল সাফোনোভ বলেন, গত আড়াই বছর ধরে আমাদের এখানে কোনও তিমি নেই। বেলোমোরস্ক ইকোলজিক্যাল সেন্টার নামে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠানে তিমি রয়েছে বলে জানান সাফোনোভ। তিনি জানান, তার ধারণা ২০১৬ সালে তারা তাদের সর্বশেষ তিমিটি সেন্ট পিটার্সবাগ ওসেনেরিয়ামের (সামুদ্রিক প্রাণী রাখার অ্যাকুইরিয়াম) কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার রাশিয়ার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রতিষ্ঠান বা সেন্ট পিটার্সবাগ ওসেনেরিয়ামের কোনও প্রতিনিধির মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাফানোভ বলেন, বেলাগু তিমিদের কখনোই গলায় বেল্ট পরা দেখেননি। এমনকি স্থাপনার বাইরে খোলা সমুদ্রে কোনও কাজ বা প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয়নি, যেখান থেকে তারা পালাতে পারে।

যেখান থেকে এসব তিমি ওসেনেরিয়ামে বিক্রি করা হয়েছে সেখান থেকে অনেক পূর্বে ভালভ্লামিদিরকে পাওয়া গেছে। ওসেনেরিয়ামে তিমিদের মানুষের জন্য বিনোদন বা রাশিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

তবে এ বছরের শুরুতে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে তিমিদের কারাগার থাকার খবর সামনে আসার পর অনেকেই চমকে উঠেছিলেন। ওই কারাগারে ১১টি ওরকাস ও ৮৭টি বেলাগু তিমি আটক রাখা হয়েছিল। কয়েকটি সংবাদপত্র এই স্থাপনাটিকে নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে আখ্যা দেয়। পরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেন। তারপর আবার একটি তিমি হারানোর কথা স্বীকার করে নিলে হয়তো সংবাদমাধ্যমে অযাচিত মনোযোগ কাড়তো বলে মনে করেন অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাশিয়ার এক গবেষক বলেন, ‘একটি তিমি হারানোর জন্য এটা একটা খারাপ সময়’। গ্লাজোভ বলেন, তিমি হারানোর কথা প্রকাশ্যে না বলার মতো বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। তিনি বলেন, বসের ভয়, জনগনের মনোযোগ বা তারা যা করছে তা নিয়ে জনগণের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয় থাকতে পারে।

/জেজে/এমওএফ/

লাইভ

টপ