সু চি’র মুখ রক্ষায় রয়টার্স সাংবাদিকদের মুক্তি?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২০:২৯, মে ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৩, মে ১১, ২০১৯

মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে কারাবন্দি দুই রয়টার্স সাংবাদিকের মুক্তির সিদ্ধান্তকে ‘আকস্মিক’ বলা হলেও ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, অবিরাম কূটনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক ক্ষোভের মুখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ৭ মে তাদেরকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমার আওতায় তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। কূটনৈতিক সূত্র ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, খুব সুচিন্তিতভাবেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক সমালোচনার পাশাপাশি এক্ষেত্রে নেপথ্য কূটনীতিও ভূমিকা রেখেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আকস্মিকভাবে দুই রয়টার্স সাংবাদিককে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। জোরালো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশের বেসামরিক নেতা অং সান সু চি'র মুখ রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।  

অং সান সু চি
মিয়ানমারে সাধারণত এপ্রিলে নতুন বছর উদযাপনের সময় রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়ে থাকে। এ বছর দেশটিতে ২৩ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ মে) তৃতীয় দফায় ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় পড়েন ৩৩ বছর বয়সী ওয়া লোন ও ২৯ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ে। মিয়ানমার সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একের পর এক বার্তা আসতে থাকে। হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে জাতিসংঘ মহাসচিব পর্যন্ত স্বাগত বার্তা দিয়েছেন।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যায় পুলিশ সদস্যদের আমন্ত্রণে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন মিয়ানমারে কর্মরত রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ে ও। পরে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাফতরিক গোপনীয়তা আইন ভঙ্গের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার দেখায়। রাখাইনের ইন দিন গ্রামে সেনা অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যার ওপর অনুসন্ধান চালাতে গিয়েই মামলার কবলে পড়েন তারা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের বিরুদ্ধে সাত বছর করে কারাদণ্ড ঘোষণা করে ইয়াঙ্গুনের একটি জেলা আদালত। নভেম্বরের শুরুতে ইয়াঙ্গুনের হাইকোর্টে দুই সাংবাদিকের পক্ষে আপিল করেন তাদের আইনজীবীরা। ১১ জানুয়ারি আপিল খারিজ করে দিয়ে নিম্ন আদালতের সাজা বহাল রাখা হয়। তবে নতুন বছর উপলক্ষে দেশটির প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমার আদেশে ৫০০ দিনের বেশি কারাভোগের পর মুক্তি পান তারা।

রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর চালানো জাতিগত নিধনযজ্ঞ নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকা পালনের জন্য অনেকের কাছে  মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চি একজন অবাঞ্ছিত মানুষ। উল্টো রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনায় হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি, ‘আইনের শাসন’ অনুসরণ করার উপর বার বার জোর দেওয়া নিয়ে তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অনেকে। আর রয়টার্স সাংবাদিকদের কারাবন্দি করার ঘটনায় তার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। রয়টার্স সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিকভাবে শুরু হওয়া প্রচারণায় আইনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমাল ক্লুনি। দুই সাংবাদিকের ছবি নিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল টাইম ম্যাগাজিন। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট সিপিজেসহ সাংবাদিকতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সম্মানজনক পুলিৎজারসহ বেশ কিছু পুরস্কারও পান তারা।

মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হটে জানিয়েছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের কথা চিন্তা করে আকস্মিকভাবে ওই সাংবাদিকদ্বয়কে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বতন্ত্র বিশ্লেষক রিচার্ড হোর্সি বলেন, আটককৃত রিপোর্টারদের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি দেশটির ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে তা সরকারের জন্য ‘সম্ভাব্য মূল্য চুকানো’র মতো ঘটনা হয়ে উঠেছিল। কূটনৈতিক সূত্রে এএফপি জানিয়েছে, এক্ষেত্রে যে শুধু আন্তর্জাতিক চাপই কাজ করেছে তা নয়, সুচিকে বোঝাতে নেপথ্য কূটনীতিও কাজ করেছে। তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী শেষ পর্যন্ত তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে এর ফল ভালো হবে না।

অবসরপ্রাপ্ত থাই কূটনীতিক কোবসাক চুতিকুল সু চি’র সরকারে উপদেষ্টা মর্যাদার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এএফপিকে তিনি বলেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানতেন যেকোনোভাবে হোক তাদেরকে (রয়টার্স সাংবাদিক) ক্ষমা করতে হবে। তবে এ নিয়ে তাকে (সু চি) বোঝানো যাবে বলে কেউ মনে করতেন না। তবে সে কাজটি করতে সক্ষম হয়েছেন সু চি’র সহযোগী ব্রিটিশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরা দারজি। ইয়াঙ্গুনের কুখ্যাত ইনসেইন কারাগার থেকে দুই রয়টার্স সাংবাদিকের মুক্তির দিন গেটের বাইরে অপেক্ষারতদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।  গত দুই বছর ধরে রাখাইন স্টেট কমিশনে উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করছেন সু চি’র ওই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মিয়ানমারে নিয়মিত আসা যাওয়া রয়েছে তার। সু চির সঙ্গে অনেক বছর ধরেই তার পরিচয়। এমনকি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে লন্ডনে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন।

দারজির সঙ্গে মিয়ানমারের অন্য এক সরকারি কমিশনে কাজ করেছেন কোবসাক। তাকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানিয়েছে, ওই দুই রয়টার্স সাংবাদিককে মুক্তি দিতে দারজিই সুচিকে বুঝিয়েছিলেন। কোবসাক বলেন, ‘আমি যা শুনেছি, তিনি (দারজি) শেষ পর্যন্ত সুচিকে বোঝাতে পেরেছেন যে এ জিনিস (রয়টার্স সাংবাদিকদের কারাবন্দি করে রাখা) তাদের গলার কাঁটা হয়ে আছে।’ কোবসাক আরও জানান, সু চি’র বাড়িতে খুবই একান্তে আলোচনা হয়েছে। রয়টার্স সাংবাদিকরা মুক্তি পাওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে দারজিও এ ব্যাপারে তার ভূমিকা থাকার কথা ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘শিক্ষাটা খুব সাধারণ: সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতিতেও সংলাপ কাজ করে।’

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগামী বছর মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোবসাক বলেন, তার আগে আগে এ পথ থেকে বের হওয়ার এটাই সুযোগ ছিল। তা না হলে এ বিষয়টি নির্বাচনে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি ছিল। রয়টার্স সাংবাদিকদের মুক্তির ব্যাপারে সু চি’র মন পরিবর্তনকে ‘রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইয়াঙ্গুনভিত্তিক বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন। রয়টার্স সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়া হলেও মিয়ানমারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না পর্যবেক্ষকরা। অ্যাকটিভিস্ট চিরি জাহাউ বলেন, ‘এ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের সাংবাদিকদের পরিস্থিতি বদলে যাবে না।’

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ