ব্রিটেনের ট্রাম্প হবেন বরিস জনসন?

Send
মুনজের আহমদ চৌধুরী, লন্ডন
প্রকাশিত : ২০:০৭, জুন ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৮, জুন ২৫, ২০১৯

ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে থাকা বরিস জনসন যা বলছেন তা আসলে ব্রেক্সিট পার্টির নাইজেল ফারাজের বক্তব্য। নাইজেল ব্রিটেনের রাজনীতিতে প্রবল বর্ণবাদী, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী একটি চরিত্রের নাম। একথা নিশ্চিতেই বলা যায় যে, ব্রিটেনের রাজনীতি এবার সরাসরি নাইজেল ফারাজদের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে। নাইজেল সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, তারা যে ধরনের ব্রেক্সিট চান, বরিস নির্বাচিত হলে ঠিক সেই রকম ব্রেক্সিট সম্ভব। কিন্তু কীভাবে সেই ব্রেক্সিটটি সম্ভব অথবা কী থাকবে 'নো ডিল'  চুক্তিতে কিছুই বরিস জনসন বা নাইজেল ফারাজ খোলাসা করেননি।

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আপাত অবসান ঘটিয়ে আমেরিকার ট্রাম্প, ভারতের মোদি, রাশিয়ার পুতিনদের মতো গণতান্ত্রিক একনায়কের হাতে যাচ্ছে ব্রিটেন। বরিস জনসনই হবেন ব্রিটেনের ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ব্রেক্সিট হলেও ব্রিটেনের অর্থনীতি বড় কোনও চাপে পড়বে না। ইউরোর বিপরীতে পাউন্ডের দামের ব্যবধান আস্তে আস্তে কমে এসেছে। পাউন্ডের দাম কমে গেছে। বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হলে সেটা কিছুদিনের জন্য নব্বই টাকা পর্যন্ত নামতে পারে। মুদ্রার অবমূল্যায়নে জিনিসপত্রের দাম গত দুই বছরের মধ্যে আরেকদফা বাড়বে। কিন্তু, ব্রিটেনের অর্থনীতি খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে না যাওয়ার বড় কারণ হলো, ১৯৭৩ সালের পর এখন দেশে বেকারত্বের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বেনিফিট ব্যবস্থায় ব্যাপক কাটছাঁট, নাগরিক সুবিধা কমিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রটি। কল্যাণ রাষ্ট্রের শত বছরের রূপ বদলাচ্ছে দেশটির। পুলিশ থেকে সেবাখাত; সব ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে বাজেট কমিয়েছে সরকার। আর যেখানকার মূল অর্থনীতি মধ্যস্বত্ব ব্যবসায়, সেই অর্থনীতির অবনতি হওয়া ঠেকাতে পারে রাষ্ট্র। কিন্তু দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয় সাধারণ জনগণকে।

এবারের ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে সাধারণ জনগণ ভোট দেবেন না। কারণ ইতোমধ্যেই ক্ষমতায় রয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। এবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন দলটির সদস্যদের পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে। কনজারভেটিভ পার্টির প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সদস্যের মধ্যে ৬৬ বছরের বেশি বয়স্ক সদস্য ৩৮ শতাংশ, আর ৫৬-৬৫ বছর বয়স্ক সদস্য ১৮ শতাংশ। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়স্ক সদস্য মাত্র ১৭ শতাংশ। দলটিতে তরুণ সদস্যদের সংখ্যা কম হলেও ৮৬ শতাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। যারা সমাজের উচ্চ শ্রেণির মধ্যেই পড়েন। কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যদের ৬৮ শতাংশ ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ, যাদের নিজের বাড়ি আছে। যারা ত্রিশ বা পয়ত্রিশ বছর আগে বাড়িটি কিনেছিলেন হয়ত ত্রিশ হাজার পাউন্ডে। এখন সে বাড়ির দাম এক কোটি পাউন্ড। তারা কয়েক বছর পরপর বাড়ি রি-মর্টগেজ করেন। পেনশনের টাকার সঙ্গে রি-মর্টগেজে পাওয়া টাকা মিলিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটান।

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনে বাড়ির দাম কমবে, আবার এলাকাভেদে বাড়বেও। ফলে সামগ্রিকভাবে দাম কমবে না খুব বেশি। তাতে করে, বরিস জনসন বা নাইজেল ফারাজের সমর্থক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা হবে।

বিপরীতে জনগণের বড় অংশের জীবনযাপন আরেকটু কঠিন হয়ে পড়বে। ব্রিটিশ জনগণের তরুণ অংশটিই মূলত এ দুর্ভোগ পোহাবে। কারণ এ ভোটের ভোটার ব্রিটেনের বৃদ্ধ মানুষজনের একটি গোষ্ঠী যাদের বয়স ৬৬ বছরের বেশি। আর তরুণদের চিন্তার প্রভাব দেখা যায়, এমন রাষ্ট্রের সংখ্যা বিশ্বজুড়েই কমছে। রাষ্ট্রগুলো কম গণতান্ত্রিক হচ্ছে বিশ্বজুড়ে, বাড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন। ব্রিটেনের ৮০০ বছরের লিখিত সংবিধানহীনতার সুযোগ নিয়েই দেশটির নিয়ন্ত্রকরা খুব সহজেই রাষ্ট্রটিকে তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে টেনে নিতে পেরেছেন।

বরিস জনসন প্রতিদ্বন্দ্বী জেরেমি হান্টের সঙ্গে কোনও টিভি বিতর্কে অংশ নিতে রাজি হচ্ছেন না। ২০১৭ সালের নির্বাচনেও তাই ঘটেছিল। অতীতে রাজনীতিবিদরা কীভাবে দেশটা চালাবেন ভোটের আগে ব্রিটিনের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীরা জনগণকে তা জানাতেন। এটাই রীতি ছিল। এখন থেকে আর বলবেন না।

ব্রিটেনে এখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা নাইজেল ফারাজদের সৃষ্টি করা। বরিস গণমাধ্যমকে বলছেন, ‌ক্লিন একটা ব্রেক্সিট হওয়া সম্ভব। ‘নো ডিল’ চুক্তি হবে কিন্তু জনগণের বড় কোনও ক্ষতি হবে না।

তিন মাসের মধ্যেই সেটা তিনি করতে পারবেন অবশ্যই। কিন্তু, কীভাবে পারবেন তা বলছেন না। অবশ্য ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনগণের মধ্যে থাকা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বরিস প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন।

পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে বরিস জনসনের কথাবার্তা একেবারেই রাজনৈতিক স্লোগানমুখী। এখন তিনি যা বলছেন, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ তাহলে তারা জনগণের কাছে ব্রেক্সিট পরিকল্পনা খোলাসা করার সাহস হারাতেন না।

/এএ/

লাইভ

টপ