এরশাদের শোকে কাতর বাল্যভিটে দিনহাটা, স্মরণসভা সোমবার

Send
দিল্লি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২২:২৯, জুলাই ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৫, জুলাই ১৪, ২০১৯

দিনহাটা হাইস্কুলে আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় বন্ধু সুধীর সাহার সঙ্গে এরশাদ। (ফাইল ছবি)

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ভারতের একটি প্রত্যন্ত মফস্বল। আর এই জায়গাটি হলো কোচবিহার জেলার মহকুমা শহর দিনহাটা, এরশাদের বাল্যভিটা।

দেশভাগের আগে স্থানীয় দিনহাটা হাইস্কুলেই পড়তেন এরশাদ। দশম শ্রেণি পর্যন্ত তার পড়াশোনা ওই স্কুলেই। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কোচবিহার যখন ভারতের দিকে পড়লো, তখন তার বাবা মুহাম্মদ মকবুল হোসেন দিনহাটার পৈতৃক ভিটে ছেড়ে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের রংপুরে পাড়ি দেন। এরশাদ ভর্তি হন সেখানকার কারমাইকেল কলেজে।

দিনহাটায় বন্ধু কমল গুহের আত্মীয়া একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী এরশাদকে আশীর্বাদ করছেন।  তাকে এরশাদ মামিমা বলে ডাকতেন।(ফাইল ছবি)

কিন্তু দিনহাটাজুড়ে আজও ছড়িয়ে আছে তার বাল্য ও কৈশোরের অজস্র স্মৃতি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, দিনহাটাকে এরশাদ কখনও ভুলে যাননি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ও পরে বহুবার সেখানে ঘুরে গেছেন।

‘স্কুলে আমাদের চেয়ে দু-তিন ক্লাস উঁচুতে পড়তেন। কিন্তু আমরা কখনও উনাকে এরশাদ নামে চিনতাম না, উনি ছিলেন আমাদের সবার প্রিয় পেয়ারাদা। ছোট গঞ্জের রূপসীদের মন ভোলাতে কী কী করা লাগে, আমাদের জীবনে সেই প্রথম পাঠ কিন্তু পেয়ারাদার হাত ধরেই’—স্মৃতিকথায় লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কবি, প্রয়াত উৎপলকুমার বসু।

উৎপলকুমার বছর চারেক হলো পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। একযুগ হলো চলে গেছেন এরশাদের আর এক স্কুলমেট, দিনহাটার বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা কমল গুহ। আরেক বাল্যবন্ধু অসিত চক্রবর্তীও বেঁচে নেই।

শুধু স্মৃতির বিরাট ভাণ্ডার আগলে আজও বেঁচে আছেন আর এক বন্ধু সুধীর সাহা।

২০১৭ সালে এরশাদ শেষবার যখন দিনহাটা সফরে আসেন। তখন তাকে রিসিভ করে নিয়ে আসতে চ্যাংরাবান্ধা সীমান্তেও গিয়েছিলেন সুধীর বাবু। এরশাদ তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘শুধু তোর জন্যই এবার এলাম’।

দিনহাটা স্কুলের সেই অনুষ্ঠানে আরেক বাল্যবন্ধু অসিত চক্রবর্তী এলে তাকে সহযোগিতার জন্য মঞ্চ থেকে সিঁড়ির ধারে গিয়ে দাঁড়ান এরশাদ। (ফাইল ছবি)

বর্ষীয়ান সুধীর বাবু বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘রবিবার সকালে ওর মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই মনটা ভীষণ ভার হয়ে আছে। সেই যুগের দিনহাটার গল্প করবো, এমন আর কেউই তো রইলো না!’

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের আর এক দিনহাটা সফরে স্থানীয় হাইস্কুল প্রাঙ্গণে তাদের প্রাক্তন ছাত্রের সম্মানে আয়োজন করা হয়েছিল বিশেষ সংবর্ধনা সভার। এরশাদের পাশেই সেদিন মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বাল্যবন্ধু সুধীর সাহা, অসিত চক্রবর্তীরা।

আগামীকাল (সোমবার) সেই দিনহাটা হাইস্কুলেই আয়োজন করা হয়েছে এরশাদের স্মরণসভার।

স্কুলের এক শিক্ষক জানালেন, ‘আজ (রবিবার) ছুটির দিন ছিল বলে আমরা স্কুলে কিছু করে উঠতে পারিনি। কিন্তু কালকেই আমরা ওঁনার স্মরণে অনুষ্ঠান করছি, আমাদের স্কুলের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাক্তন ছাত্রকে নিয়ে সেখানে সবাই বলবেন।’

দিনহাটায় এক বন্ধুর বাড়িতে পারিবারিক আবহে নাতির সঙ্গে এরশাদ।নহাটায় এরশাদের পৈতৃক ভিটেতে এখন বসবাস করেন তার চাচাতো ভাই মোসাব্বির হোসেন। কোচবিহার জেলার পাবলিক প্রসিকিউটরের (সরকারি কৌঁসুলি) পদ থেকে রিটায়ার করে এখন অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।

তিনিও বলছিলেন, ‘বাংলাদেশে চলে গেলে কী হবে, তিনি ছিলেন দুই দেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের গোটা পরিবারের মুরুব্বি। আমাদের বংশের গৌরব তিনি, দিনহাটা তাকে কখনও ভুলতে পারবে না।’

দিনহাটাকেও কখনও ভুলতে পারেননি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

তার বন্ধু কমল গুহর ছেলে উদয়ন গুহ এখন তৃণমূলের স্থানীয় বিধায়ক (এমএলএ)। উদয়ন বাবু টেলিফোনে এ প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘যেভাবে ঘন ঘন তিনি দিনহাটা আসতে ভালোবাসতেন, সেটা ভাবাই যায় না।’

‘আর এসেই পুরনো বন্ধুদের খোঁজ-খবর নিতেন, এর ছেলে কী করছে, ওর মেয়ের কোথায় বিয়ে হলো এসব জিজ্ঞেস করতেন– মনেই হতো না শহরটা ছেড়ে উনি এত বছর আগে চলে গেছেন।’

দিনহাটাতে অধুনা বিজেপি নেতা ও ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের সাবেক নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্তর বাড়ি এরশাদের পৈতৃক ভিটে যেখানে, সেই পাড়াতেই।

সেই দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বলছিলেন, ‘এরশাদ চাচার প্রয়াণ মানে দিনহাটা শহরের বুক থেকে দেশভাগের একটা স্মৃতি মুছে যাওয়া। তার বাবা ও আমার দাদামশায় দুজনেই কোচবিহারের রাজার অধীনে কাজ করতেন। একজন ছিলেন রাজার আইনজীবী, আর একজন রাজ কবিরাজ। আজ বহু স্মৃতি ভিড় করে আসছে।’

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইদানীং তৃণমূল ও বিজেপির সম্পর্ক যে কতটা তিক্ত, তা সবারই জানা। কিন্তু ‘ঘরের ছেলে’ জেনারেল এরশাদের প্রয়াণ শোকস্তব্ধ দিনহাটাতে আজ সেই সংঘাতকেও আপাতত ভুলিয়ে দিয়েছে।

 

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ