লিবিয়ায় হাফতারের বিমান ঘাঁটিতে হামলা সরকারি বাহিনীর

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:৪২, জুলাই ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৩৫, জুলাই ২৭, ২০১৯

লিবিয়ার সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা খলিফা হাফতারের বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে দেশটির সরকারি বাহিনী। শুক্রবার এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ সমর্থিত ত্রিপোলিভিত্তিক ন্যাশনাল অ্যাকর্ড গভর্নমেন্ট বা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার (জিএনএ)। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রণাধীন আল জুফরা বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় ড্রোন ও কার্গো বিমানের জন্য ব্যবহৃত একটি হ্যাঙ্গার ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
২০১৭ সালের জুনে এ বিমান ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় খলিফা হাফতারের বাহিনী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)। ২০১৯ সালের এপ্রিলে এ বাহিনী রাজধানী ত্রিপোলি দখলের লক্ষ্যে অভিযান শুরু করে। ওই অভিযান ব্যর্থ হলে সম্প্রতি ফের ত্রিপোলি দখলের হুমকি দেন খলিফা হাফতার। তার ওই হুমকির কয়েক দিনের মাথায় এ অভিযান পরিচালনা করে সরকারি বাহিনী।

জীবনযাপনের মানের দিকে থেকে তেল-সমৃদ্ধ লিবিয়া একসময় আফ্রিকার শীর্ষে ছিল। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ছিল পুরোপুরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ঐ ঐশ্বর্য নিশ্চিত করেছিল, সেটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় ২০১১ সালে যখন পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। তারপর থেকে লিবিয়ায় চলছে সীমাহীন সংঘাত। গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যার শিকার হওয়ার পর ত্রিপোলিতে জাতিসংঘ সমর্থিত একটি মনোনীত সরকার রয়েছে। ওই কর্তৃপক্ষকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বা জিএনএ নামে অভিহিত করা হয়। তবে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে রয়ে গেছে। পশ্চিমাঞ্চলে জিনএনএ’র কর্তৃত্ব থাকলেও পূর্ব ও দক্ষিণের বেশিরভাগ অঞ্চল হাফতার বাহিনী এলএনএ’র দখলে। গত এপ্রিল থেকে এ বাহিনী লিবিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে লিবিয়ায় দুটি সরকার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের মধ্যে একটি সরকারকে সমর্থন দিয়েছে জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশ। আরেকটি ফিল্ড মার্শাল হাফতারের নেতৃত্বাধীন। ত্রিপোলির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে জাতিসংঘ। তুরস্ক, ইতালি ও যুক্তরাজ্যও এ সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। আর হাফতার বাহিনীর সমর্থনে রয়েছে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ফ্রান্স। তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন স্পষ্ট নয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে (জিএনএ) সমর্থন করে এবং শান্তি আলোচনার আহ্বান জানায়। কিন্তু গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খলিফা হাফতারকে ফোন দিয়ে লিবিয়ার ব্যাপারে ‘যৌথ স্বপ্নের’ কথা বলেন।

কে এই খলিফা হাফতার

লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মর গাদ্দাফির এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা খলিফা হাফতার পরে হয়ে উঠেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র মদতপুষ্ট বিদ্রোহী। গত চার দশকে লিবিয়ার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন তিনি। এ সময়ের মধ্য তার অনেক উত্থান-পতন রয়েছে। কখনও ছিলেন লিবিয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছাকাছি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, কখনও তাকে ক্ষমতা থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছে। পরে আবার তার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে ক্ষমতার কেন্দ্রে।

খালিফা হাফতারের অধীনে থাকা বাহিনী এখন লিবিয়ার প্রধান তেল টার্মিনালগুলোর দখল নিয়েছে। তার নিয়ন্ত্রণাধীন পূর্বাঞ্চলীয় শহর টবরুকের পার্লামেন্টের হাতে (এই পার্লামেন্টকে স্বীকৃতি দেয়নি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়) দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।

১৯৪৩ সালে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর আজডাবিয়ায় খালিফা হাফতারের জন্ম। ১৯৬৯ সালে কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সেনা কর্মকর্তারা রাজা ইদ্রিসকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন, তিনি ছিলেন তাদের একজন।

পতন এবং নির্বাসন

গাদ্দাফির শাসনামলে খালিফা হাফতার বেশ দ্রুত উপরে দিকে উঠে যান। ১৯৮০-এর দশকে লিবিয়ার বাহিনী যখন প্রতিবেশী দেশে সংঘাতে লিপ্ত, তখন তাকে সেই লড়াইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে এটিই তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ফ্রান্সের সমর্থনপুষ্ট শাদের বাহিনীর হাতে তার বাহিনী পরাজিত হয়। খালিফা হাফতার এবং তার বাহিনীর ৩০০ সেনা ১৯৮৭ সালে শাদের সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। অন্যদিকে লিবিয়া যে শাদে যুদ্ধ করতে বাহিনী পাঠিয়েছে, গাদ্দাফি বরাবরই তা অস্বীকার করছিলেন। কাজেই যখন খালিফা হাফতার এবং তার বাহিনী সেখানে ধরা পড়লে তাদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান গাদ্দাফি। এ ঘটনা খলিফা হাফতারকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। পরবর্তী দুই দশক ধরে তার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ালো কিভাবে গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়, সেই চেষ্টা করা।

এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। সেখান থেকেই চলছিল তার গাদ্দাফি-বিরোধী তৎপরতা। থাকতেন সিআইএ সদর দফতরের খুব কাছে। তার সঙ্গে সিআইএ-র বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। গাদ্দাফিকে হত্যার বেশ কয়েকটি চেষ্টায় সিআইএ তাকে সমর্থন দেয়। ২০১১ সালে লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর খলিফা হাফতার দেশে ফিরে আসেন। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তবে গাদ্দাফির পতনের পর ২০১৪ সালের মে মাসে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। এক পর্যায়ে ত্রিপোলি দখলের মাধ্যমে পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন তিনি। এ প্রচেষ্টায় তিনি সমর্থন পান যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর। সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, বিবিসি।

/এমপি/

লাইভ

টপ