আঞ্চলিক উদ্বেগ বাড়াবে আসামের এনআরসি

Send
আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ২৩:০০, আগস্ট ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৭, আগস্ট ০৫, ২০১৯

ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক কর্তৃপক্ষের ঘোষিত অ-ভারতীয়দের আপিল নিষ্পত্তির জন্য ১ হাজার ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল ৩১ আগস্ট প্রকাশিত নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া কয়েক লাখ বাসিন্দার আবেদন যাচাই করবে। ধারণা করা হচ্ছে, তালিকা থেকে বাদ পড়াদের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ লাখের মতো হতে পারে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে তালিকার বাইরে থাকা বেশির ভাগই বাংলাভাষাভাষী হিন্দু ও মুসলমান, যাদের পূর্বসুরী বাংলাদেশে বাস করতেন।

কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করা এতো বিপুল সংখ্যক রাষ্ট্রহীন মানুষদের নিয়ে কী করা হবে তা নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। এমনিতেই উত্তর-পূর্ব ভারতে বিভিন্ন সংকট বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের চেয়েও ভারতে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা বেশি দাঁড়াবে। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। যদিও প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে।
আসাম থেকে বিশ্লেষকদের বিবরণ অনুসারে, রাজ্যটির নাগরিক তালিকায় বড় ধরনের অসংখ্য ভুল ও অযথাযথ তথ্যের উপস্থিতি রয়েছে। অনিয়ম এতোই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় যে কেন্দ্রীয় সরকারকে এনআরসি তালিকা প্রকাশের নির্দিষ্ট ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে আসতে হয়। ভারতীয় নাগরিক, এমনকি দাদা-নানাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে বলা হয়। পরিবারের সব সদস্য তালিকাভুক্ত হলেও দেখা গেছে মা নেই। সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে যেতে হয়েছে কারাগারে। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছেন, অনেক অভারতীয় নিম্নসারির কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। বেশ কয়েকটি স্থানে সত্যিকার ভারতীয়রা স্থান পাননি তালিকায়। ফলে নতুন এনআরসি নিয়ে সংশয় আরও বাড়ে। অভারতীয়দের নাগরিক তালিকায় স্থান পাওয়ার ফলে অল আসাম স্টুডেন্টস’ ইউনিয়নের মতো কট্টরপন্থীদের আসামীয়দের আশঙ্কা সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তাদের দাবি, অবৈধ বাসিন্দাদের রাজ্য থেকে অবিলম্বে তাড়িয়ে দিতে হবে। রাজ্যে ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলোও দৃঢ়ভাবে এনআরসিতে অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে।

সুপ্রিম কোর্ট বারাক উপত্যকার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলায় ২০ শতাংশ নাম পুনরায় যাচাইয়ের জন্য কর্মকর্তাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এনআরসি কর্মকর্তাদের দাবি, ইতোমধ্যে ৭০ লাখের বেশি নাম অভিযোগের প্রেক্ষিতে যাচাই করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

আসামের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪১ লাখ এনআরসিতে স্থান পাননি। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুসারে, প্রায় ৩৬ লাখ নাগরিকত্বের জন্য পুনরায় আবেদন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের কয়েক হাজার কর্মী এতে অংশগ্রহণ করে।

প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার পর থেকেই জাতিগত উত্তেজনা ও বাংলা ভাষাভাষী বরাক উপত্যকার জেলাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরে আন্তঃসম্প্রদায়গত সম্প্রীতির উন্নতি হয়েছে।  কিন্তু আশির দশকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’দের বিরুদ্ধে জাতিগত দাঙ্গার কথা মানুষ এখনও ভুলে যায়নি।

যেমন আশঙ্কা করা হয়েছিল দেশভাগের সময় ভারতে আসা বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর ভারতীয় নাগরিকত্বের যথাযথ প্রমাণ ছাড়া আসামে কাউকে পাওয়া গেলে তাকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাড়িয়ে দেওয়ার আগে তাদের কারাগারে রাখা হচ্ছে।

নতুন করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল স্থাপন নিয়ে ৩১ আগস্ট তালিকা থেকে বাদ পড়ে শিগগিরই রাষ্ট্রহীন হতে যাওয়া মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে তেমন উচ্ছ্বাস নেই। কারণ কয়েক বছর ধরে প্রায় শতাধিক ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল আসামে সক্রিয় রয়েছে। এক্ষেত্রে আসামের এই ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী রোহিনি মোহনের গবেষণার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরতে হয়। সম্প্রতি তিনি তার অভিজ্ঞতা একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে তুলে ধরেছেন।

রোহিনি লিখেছেন, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০০টি ট্রাইব্যুনালের তথ্য চেয়েছেন তিনি। কিন্তু মাত্র ৫টি আদালত তথ্য দিয়েছে, ৯৫টি দেয়নি। যে তথ্য পেয়েছেন সেগুলোও ছিল ভয়ানক। ৮২ শতাংশ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছে। এদের সবাই বাংলা ভাষাভাষী। ১০ জন মুসলমানের ৯ জন এবং ১০ জন হিন্দুর মধ্যে ৪ জনকে বিদেশি ঘোষণা করা হয়। ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতেই রায় দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের অনেকে রায় শোনেননি পর্যন্ত। অথচ যাদের অনুপস্থিতিতে রায় দেওয়া হয়েছে তাদের অনেককেই গ্রামে বসবাস করতে পাওয়া গেছে। এসব মানুষ চরম দরিদ্র, তাদের ভাগ্য যে নির্ধারিত হয়ে গেছে তাও জানেন না তারা।

রোহিনি মোহন শুধু নন, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী কোলিন গনসালভেজ দাবি করেছেন, আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অনেকগুলোই বিচারক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এতো বছর ধরে ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ১ লাখ ১৭ হাজারকে বিদেশি ঘোষণা করেছে।
আসামের নাগরিক তালিকার সূত্র ধরে গনসালভেস প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতে কোনও কর্তৃপক্ষ কেন স্পষ্ট করে ঘোষণা করছে না যে যেসব মানুষকে রাষ্ট্রহীন করা হবে তাদের নিয়ে কী করা হবে? তাদের বাংলাদেশে পাঠানো যাবে না কারণ তাদেরকে এটা ভারতে প্রমাণ করতে হবে। তাহলে কি কয়েক লাখ মানুষকে বড় ধরনের বন্দি শিবিরে রাখা হবে? তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে খরচ হবে তা কি রাজ্যের কোষাগারের জন্য বোঝা হবে? এ পর্যন্ত এই বিষয়ে সরকারি কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।

/এএ/

লাইভ

টপ