কাশ্মির পরিস্থিতি ‘আড়াল’ করছে ভারত, নজিরবিহীন বাধার মুখে সাংবাদিকরা

Send
ফাহমিদা উর্ণি ও হুমায়ূন কবির
প্রকাশিত : ১৬:২৩, আগস্ট ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪১, আগস্ট ০৯, ২০১৯

কাশ্মিরে সবশেষ বড় ধরনের ধরপাকড় অভিযান চালানো হয়েছিল ২০১৬ সালে; ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে জনপ্রিয় বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর। সে সময় কয়েক মাস ধরে কাশ্মিরে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, ধরপাকড় তখনও হয়েছে। তবে এবার ভারতীয় বাহিনী কেবল বিদ্রোহীদেরকে গ্রেফতার করেই থামছে না; স্বায়ত্তশাসনপন্থী অবস্থানে থাকা ভারতপন্থী রাজনীতিকদেরও সমর্থকসহ গ্রেফতার করছে। মোদি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে কারফিউয়ের ভেতরেই ফুঁসছে সেখানকার জনসাধারণ। ভারতের সরাসরি শাসন মানতে নারাজ ‘বিশেষ মর্যাদা’ হারানো এই উপত্যকা। তবে পরিস্থিতিকে আড়াল করতে প্রবলভাবে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে গত সোমবার থেকে কাশ্মিরের প্রধান শহর শ্রীনগরভিত্তিক অধিকাংশ ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে না। এ ঘটনায় হতাশ সাংবাদিকরা পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ আখ্যা দিয়েছেন।

সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এদিকে জম্মু-কাশ্মিরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে একটি বিলও পাস করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটির চেহারা এখন বদলে যাবে। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হওয়ায় ভারতীয়রা এখন অঞ্চলটিতে জায়গা কিনতে পারবে ও সরকারি চাকরি করতে পারবে। যা আগে সম্ভব ছিল না।

কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় পুত্রবধূকে একটি মাতৃ সদনে নিয়ে যাচ্ছিলেন ৬৫ বছর বয়সী নবী খান। বিশেষ মর্যাদা বাতিল প্রসঙ্গে আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় উদ্বেগের কারণ হলো এখন রাজ্য বহির্ভূত বিষযগুলো আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে এবং আমাদেরকে শিগগিরই সংখ্যালঘুতে পরিণত করবে।’ শ্রীনগরের পার্শ্ববর্তী এলাকা আবি গুজারের বাসিন্দা সাফিয়া নবী। ৬৬ বছর বয়সী এ নারী আল জাজিরাকে বলেন, ছেলের মুখ থেকে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের কথা জানার পর থেকে তিনি অস্থির হয়ে আছেন। সাফিয়া বলেন, ‘পরিবারের জন্য রান্না করতে এবং তাদেরকে সহযোগিতা করতে আমি আমার চেহারা স্বাভাবিক রেখেছি। কিন্তু আমার হৃদয়ে কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছে। আমরা রাস্তায় লড়াই করব, তারপরও আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী ভারতের শাসন মানব না।’

ব্যবসায়ী আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এবারের ঈদ উদযাপন করছি না। এ ঈদ শোকের। সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের আওতায় এ অঞ্চলের মুসলিমদেরকে সাজা দেওয়া হচ্ছে।’ ওয়াসিম ওয়ানি নামের আরেক ব্যবসায়ী মনে করেন, পশ্চিম তীরের মতো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কাশ্মির। তিনি বলেন, ‘গত চার দশক ধরে আমরা নৃশংসতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু এখন আমরা আমাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যত নিয়ে সত্যিকার অর্থে উদ্বিগ্ন। তাদের নপা জানি কিসের মুখোমুখি হতে হয়? যখনই আমি এসব নিয়ে ভাবি, তখন ফিলিস্তিনের শিশুদের ছবি আমার চোখে ভাসে এবং আমি কেঁদে ফেলি। ৭০ বছর পর ভারত আমাদের ধোঁকা দিয়েছে। তবে আমরা কাশ্মিরকে আরেক ফিলিস্তিন হতে দেব না।’

মিডিয়ার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। জারি করা হয়েছে কারফিউ। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট-মোবাইল পরিষেবা। বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিতে গত সোমবার থেকে কাশ্মিরের প্রধান শহর শ্রীনগরভিত্তিক অধিকাংশ ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে না। প্রতিবেদক মাতিন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমি সেখানকার ঐতিহাসিক ক্লোক টাওয়ারের একটি ভিডিও ধারণ করতে বিখ্যাত লালচোক থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে যেতে সক্ষম হই। তবে কনসার্টিনা তার (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল সেনারা।

গতকাল (৮ আগস্ট, বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা কার্যত বন্ধ থাকায় সোমবার (৫ আগস্ট) থেকে সাংবাদিকরা তাদের সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলোতে সংবাদ প্রকাশ করতে পারেননি। কাশ্মিরের বাইরের সংবাদমাধ্যমে কাজ করা স্থানীয় প্রতিনিধিরা ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে তাদের প্রতিবেদন ও ছবি পাঠিয়েছেন। অন্য সাংবাদিকরা নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ির বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তাদের কাজ বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে।

মাতিন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কিছু ছবি ও ভিডিও নিতে চেষ্টা করেছিলাম। তবে দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী আমাকে থামিয়ে দিয়েছিলো। তারা আমাকে আমার ক্যামেরা বন্ধ করতে অনুরোধ করেছিলো।’ তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরকে বলেছিলাম, আমি রিপোর্টার, জবাবে তারা বলেছিলো, সবকিছু এখন শেষ, ফিরে যান।’ ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার লেখক ও কনসাল্টিং এডিটর সাগরিকা ঘোষ বলেছেন, ‘সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করা ছাড়াও সমগ্র রাজ্য বন্ধ করে কাশ্মিরের জনগণকে অপমান করেছে সরকার।’

মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) শ্রীনগর থেকে নয়া দিল্লি এসে সাংবাদিক মুজামিল জলিল ফেসবুকে লিখেছেন, গত দুই দিনের জন্য, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টাররা তাদের নিজেদের অফিসে লুকিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে আবাসস্থলে হেঁটে গেছেন এবং ফিরে এসেছেন। অফিসের নিজস্ব ভবনে বেশকিছু পুলিশ সদস্য আসে, করিডোরগুলিতে অস্থায়ীভাবে থাকে।’ তিনি লিখেছেন, ‘কাশ্মিরের ভিতরেই কাশ্মির অদৃশ্য হচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এক চিত্রসাংবাদিক বলেন, তিনি নগররীর অবরোধের চিত্র তুলে ধরতে সংবাদ সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার ক্যামেরা ভেঙে ফেলে এবং ওই এলাকা ত্যাগ করতে বলে। তিনি বলেন, সেখানে সংবাদমাধ্যমের জন্য পরিবেশ অনেক প্রতিকূল। এটা সংবাদমাধ্যমকে হত্যার সামিল। আমাদেরকে মানুষের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সর্বার্থে বাধা দেওয়া হয়েছে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে এক সপ্তাহ আগে কাশ্মির পৌঁছেছেন এক বিদেশী সাংবাদিক। পুলিশ শনিবার (৪ আগস্ট) শ্রীনগর তার হোটেলে গিয়ে সেই মুহূর্তেই এলাকা ত্যাগ করতে বলেছে। তিনি বলেন, আমার এখানে অবস্থানের বিষয় পূর্বনির্ধারিত ছিলো। তবে জোরপূর্বক টিকিট কেটে বরিবার সকালে আমাকে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে তারা’। স্থানীয় সংবাদ সংস্থায় কাজ করা সাংবাদিক সান্না এরশাদ মাত্তো বলেন, পরিস্থিতি দেখতে ও সংবাদ করতে গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে বের হয়েছি। বিভিন্ন চেকপোস্টে আমাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী স্পষ্ট করে বলেছিলো, কোনও সাংবাদিককে প্রবেশের অনুমতির আদেশ নেই। বাধা ও চেকপোস্টের কারণে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়ে পাঁচ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছিলাম।’

মাত্তো বলেন, এটা ঠিক ২০০৬ সালের আন্দোলনের মতো নয়, তরুণ বিদ্রোহী বুরহান ওয়ানিকে হত্যার পর কাশ্মিরে শেষবারের মতো গণআন্দোলন দেখা গিয়েছিলো। যে আন্দোলনে ১০০ এর অধিক মারা যায়। তিনি বলেন, ‘এই সময়ে মানুষদের থামাতে, বিশেষত সাংবাদিকদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সরকার। আমরা অসহায়, এমনকি আমরা জানি না সেখানে কী ঘটছে। স্থানীয়দের জন্য এটা আরও খারাপ পরিস্থিতি। আমরা জানি না সেখানকার মানুষদেরকে হত্যা করা বা বন্দি করা হচ্ছে কিনা।

/বিএ/

লাইভ

টপ