কাশ্মিরে গণহত্যা থেকে বিরত থাকতে ভারতকে সতর্ক করার আহ্বান

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৩৬, আগস্ট ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৭, আগস্ট ২৩, ২০১৯

কাশ্মিরে গণহত্যা থেকে বিরত থাকতে ভারতকে সতর্ক করার আহ্বান জানিয়েছে ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ নামের একটি সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওই গণহত্যা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ ও এর সদস্য দেশগুলোকে এই আহ্বান জানানো হয়েছে। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট গ্রেগরি এইচ স্ট্যান্টন ইতোমধ্যেই সংঘটিত ৭টি ঘটনার পাশাপাশি আরও ১০টি সম্ভাব্যতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এই সতর্কতা জারির আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন জেনোসাইড ওয়াচ বিশ্বে গণহত্যা প্রতিরোধ, নিরসন ও এ সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির লক্ষ্যে কাজ করে। পাশাপাশি সম্ভাব্য গণহত্যা এবং সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টাও করে সংস্থাটি। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যে বিশ্বে গণহত্যা বন্ধ করা।

কাশ্মিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কাশ্মিরের হিন্দু মহারাজা স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। তবে যখন পাকিস্তানের পশতুন মিলিশিয়ারা আক্রমণ করে, তখন মহারাজা ভারত ইউনিয়নে কাশ্মিরকে যুক্ত করেন। তখন সেখানে সেনা পাঠায় ভারত। পাকিস্তানি ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে ওই সময় যুদ্ধ সংগঠিত হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে এই বিরোধ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলে ভারত। ১৯৪৮ সালে পাস হওয়া এ সংক্রান্ত এক সনদে জম্মু-কাশ্মির থেকে ভারতীয় সেনা হ্রাস ও পাকিস্তানি সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। এতে জম্মু-কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে গণভোটেরও কথা ছিল। তবে কখনও সেখানে আর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। ভারত ও পাকিস্তান দু’পক্ষই কাশ্মিরের সার্বভৌমত্বের পুরোটাই দাবি করে। ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ বরাবর ভূখণ্ডকে দুই ভাগ করেছে তারা। স্বাধীনতার পর থেকে এই পর্যন্ত তিনবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে পরমাণু অস্ত্রধারী এই দুই দেশ।

জেনোসাইড ওয়াচের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সালে কাশ্মিরি মুসলিম যুবকরা সেখানকার ‘আদিবাসী আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের’ জন্য বিক্ষোভ শুরু করেছিল। তখন ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী এ বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করে। ১৯৮৬ সালে দাঙ্গায় হিন্দুদের সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছিল, পরে ১৯৮৯ সালে হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে মুসলিম বিদ্রোহীরা। ১৯৯০ সালে সেখান থেকে এক লাখ হিন্দু পুরোহিত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কাশ্মিরে ১৯৮৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ৪০টি গণকবরে ২ হাজার ৭৩০টি মৃতদেহ সমাহিত করার প্রমাণ রয়েছে কাশ্মির রাজ্যের মানবাধিকার কমিশনের কাছে। ৮ হাজারের অধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে সেখানে।

জম্মু-কাশ্মিরের সিভিল সোসাইটির জোট বলছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনীর হাতে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা কাশ্মিরি মুসলিমদেরকে গুম, নির্যাতন ও ধর্ষণ সাধারণ ব্যাপার।

অধ্যাপক বারবারা হার্ফের গণহত্যার জন্য ঝুঁকির কারণগুলো প্রয়োগ করে কাশ্মিরে গণহত্যার প্রাথমিক সতর্কতা তুলে ধরেছে সংগঠনটি। এই ঝুঁকিগুলো হলো:

১. গণহত্যার আগে হত্যাযজ্ঞ এবং এমন হত্যার দায়মুক্তি অব্যাহত রাখা।

২. কাশ্মির সীমান্ত এলাকায় ভারত ও পাকিস্তানের সশস্ত্র সংঘর্ষ চলমান।

৩. ক্ষমতাসীন মোদির বিজেপি ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে হিন্দুত্ববাদের একটি বর্জনীয় আদর্শ তুলে ধরছে।

৪. বেসামরিক ভারতীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা আরোপিত আইনি বাধা ছাড়াই কর্তৃত্ববাদী সামরিক শাসন।

৫. মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের এলাকায় সংখ্যালঘু সেনাবাহিনী (হিন্দু ও শিখ) দ্বারা শাসন।

৬. যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট, মিডিয়া ও বাণিজ্য বন্ধ।

৭. মুসলিম রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মী বিতাড়ন, নির্বিচারে গ্রেফতার, অভিযোগ ছাড়াই দুই বছরের কারাবাস, ধর্ষণ ও নির্যাতন; মৌলিক মানবাধিকার ব্যাপক লঙ্ঘন।

কাশ্মিরে গণহত্যার বিষয়ে সতর্কতার জন্য জেনোসাইড ওয়াচ'র গণহত্যা প্রক্রিয়ার দশটি পর্যায় আরও অনেক অগ্রসরমূলক। এগুলো হলো:

১. শ্রেণিবিন্যাস: হিন্দু ও শিখ ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘আমাদের’ বনাম কাশ্মিরি মুসলিম বেসামরিক ‘তাদের’।

২. প্রতীকীকরণ: মুসলমানদের মুসলিম নাম (আইডি কার্ডে), কাশ্মিরি ভাষা, পোশাক, মসজিদ রয়েছে।

৩. বৈষম্য: হিন্দু পুরোহিতরা ১৯৯০ সাল অবধি অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন; বিজেপি হিন্দু শক্তি পুনরুদ্ধার করেছে।

৪. অমানবিকরণ: মুসলমানদের বলা হয় ‘সন্ত্রাসী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘অপরাধী’, ‘বিদ্রোহী’।

৫. সংগঠন: ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ৬ লাখ ভারতীয় সেনা ও পুলিশ কাশ্মিরকে শাসন করছে।

৬.মেরুকরণ: মোদি ও বিজেপি মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষকে উস্কে দিচ্ছে; সামাজিকমাধ্যমে মিথ্যাচার ছড়িয়ে দিচ্ছে।

৭. প্রস্তুতি: ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মির দখল করেছে। কাশ্মিরের জন্য এটা ‘চূড়ান্ত সমাধান’ বলছেন বিজেপি নেতারা ।

৮. নির্যাতন: কাশ্মিরি মুসলিমরা অবরুদ্ধ; গ্রেফতার, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার।

৯. গণহত্যা: দেশভাগের সময় গণহত্যাজনিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। ১৯৯০ সালে সেখানে কমপক্ষে ২৫টি ঘটনায় ২৫ জনের অধিক মানুষ নিহত হয়েছে;  ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারা ১০ মুসলিম; মুসলিম জঙ্গিদের দ্বারা ১৫ হিন্দু।

১০. অস্বীকৃতি: মোদি ও বিজেপি বলছে, তাদের উদ্দেশ্য হলো সেখানে ‘সমৃদ্ধি আনা/ উন্নয়ন করা’ ও ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা’। তারা কোনও ধরনের হত্যাযজ্ঞের কথা অস্বীকার করছে। সেখানে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা পর্যন্তও করেনি ভারতীয় সেনা অথবা পুলিশ। মোদির কর্তৃত্বগ্রহণ ভারতে জনপ্রিয়।

 

উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ঘোষণার মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। জম্মু-কাশ্মিরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে পাস হয় একটি বিলও। আর গত ৯ আগস্ট রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আইনে পরিণত হয় তা। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরজুড়ে মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত সেনা। ইন্টারনেট-মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। গ্রেফতার করা হয় সেখানকার বিপুলসংখ্যক স্বাধীনতাপন্থী ও ভারতপন্থী রাজনৈতিক নেতাকে। তবে গত কয়েকদিন ধরে কাশ্মির উপত্যকায় কড়াকড়ি শিথিল করতে দেখা যায়। রাস্তাঘাটে বেড়েছিল যানবাহনের উপস্থিতি। সন্ধ্যার দিকে দোকানগুলোও খোলা হচ্ছিলো।

 

/এইচকে/এএ/

লাইভ

টপ